সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়কে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে একটি প্রশ্ন—এগুলো কি কেবল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা, নাকি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা “আমেরিকার দাসত্ব” তত্ত্বের বাস্তব প্রমাণ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আবেগ বা স্লোগানের বাইরে গিয়ে বাস্তব রাজনীতি, ভূরাজনৈতিক চাপ এবং বাংলাদেশের সামরিক–কূটনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকানো জরুরি।
বাংলাদেশের মতো একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য প্রতিরক্ষা খাত কখনোই পুরোপুরি আলাদা কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি একদিকে যেমন নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে চেয়েছে, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলার চেষ্টা করেছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া—সব পক্ষের সঙ্গেই বাংলাদেশ কোনো না কোনো সময়ে সামরিক বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্ত হয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কিছু চুক্তি হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, আলোচনার ধারাবাহিকতাই অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে বাস্তব রূপ দিয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান–এর বক্তব্যেও এই ধারাবাহিকতার কথাই জোর দিয়ে বলা হয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মেয়াদের শেষ মুহূর্তে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বা চুক্তি কোনো নতুন বা ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নয়; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের চলমান প্রক্রিয়ারই অংশ। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই “চলমান প্রক্রিয়া” আসলে কার দ্বারা শুরু হয়েছিল এবং কেন? যদি দেখা যায়, এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই আগের সরকারের আমলে পরিকল্পিত ছিল, তাহলে বর্তমান সরকারকে এককভাবে দায়ী করা বা তাকে কোনো পরাশক্তির দাস হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব আসে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে। এই সরকার শুরু থেকেই ঘোষণা দিয়েছিল—রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্র থেমে থাকে না। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থনীতি—সব খাতেই কিছু না কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। এখানেই সমালোচকদের প্রশ্ন, অগ্রাধিকারের বাইরে গিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে এত মনোযোগ দেওয়া কি যুক্তিসংগত ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। একদিকে বলা যায়, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চুক্তি থেকে বিরত থাকা। কারণ এগুলোর দায়ভার বহন করতে হয় পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, অনেক প্রতিরক্ষা প্রকল্প বহু বছরের পরিকল্পনা ও আলোচনার ফল। এগুলো মাঝপথে থামালে আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সামরিক প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তি এখানেই—পরবর্তী সরকার চাইলে এগুলো চালিয়ে যাবে, না চাইলে বন্ধ করবে; সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের হাতেই থাকবে।
তবে বিতর্কের আরেকটি বড় দিক হলো, চুক্তিগুলোর বৈচিত্র্য। চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম এবং যুক্তরাষ্ট্র—এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কি সত্যিই কোনো একক শক্তির প্রতি আনুগত্যের ইঙ্গিত দেয়? বাস্তবতা বলছে, যদি এটি “আমেরিকার দাসত্ব” হতো, তাহলে চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে এত গভীর সামরিক সম্পৃক্ততা থাকার কথা নয়। একইভাবে, কেবল চীনের সঙ্গে চুক্তি হলেই কেউ “চীনের দাস” হয়ে যায় না। বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন—সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়।
তবুও “আমেরিকার দাসত্ব” কথাটি পুরোপুরি হাওয়ায় ভেসে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সম্পর্ক নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। মানবাধিকার, নির্বাচন, গণতন্ত্র—এসব ইস্যুতে ওয়াশিংটনের চাপ নতুন কিছু নয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক হেলিকপ্টার ক্রয় বা নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটাকে দাসত্ব বলা আর কূটনৈতিক বাস্তবতা বলা—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে।
একটি রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত হয়, তখন সেটি কেবল অস্ত্র কেনাবেচা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কৌশলগত বোঝাপড়া। বাংলাদেশ যদি এসবের মাধ্যমে নিজের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে সেটিকে স্বার্থবিরোধী বলা কঠিন। প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই চুক্তিগুলো কতটা স্বচ্ছ, কতটা প্রয়োজনীয় এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য উপকারী।
আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হওয়া। সমালোচকরা বলছেন, এটি স্বার্থের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ড. খলিলুর রহমানের জবাব—সব দেশে উড়োজাহাজ প্রতিষ্ঠান নেই, ফলে তুলনাটাও সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই ব্যাখ্যা অনেককে সন্তুষ্ট করেনি, তবে এটিও সত্য যে অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো অনেকটাই অস্থায়ী ও ব্যতিক্রমী। এখানকার সিদ্ধান্তগুলোকে স্থায়ী সরকারের মানদণ্ডে বিচার করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা ও সীমাবদ্ধতা। এই সরকার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে গঠিত। ফলে এর প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ভবিষ্যৎ সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে দেখছেন, কেউ দেখছেন বিদেশি শক্তির সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা হিসেবে। আবার অনেকে বলছেন, এটি নিছক প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা।
তাহলে প্রশ্নে ফিরে আসা যাক—এটা কি ইউনূসের “আমেরিকার দাসত্ব”? সরল উত্তর হলো, বিষয়টি এতটা সরল নয়। যদি দাসত্ব বলতে বোঝানো হয়—নিজস্ব স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এককভাবে কোনো পরাশক্তির নির্দেশে চলা—তাহলে বর্তমান প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর বৈচিত্র্য সেই অভিযোগকে দুর্বল করে। তবে যদি দাসত্ব বলতে বোঝানো হয়—আন্তর্জাতিক শক্তির চাপ ও প্রত্যাশার মধ্যে পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া—তাহলে সেটি শুধু এই সরকারের নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারেরই বাস্তবতা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আসল পরীক্ষা হবে, তারা কত দ্রুত এবং কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করতে পারে। প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বিতর্ক তখনই গৌণ হয়ে যাবে, যদি একটি নির্বাচিত সরকার এসে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এসব সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে। শেষ পর্যন্ত, কোনো সরকার দাস না স্বাধীন—এই বিচার হবে কথায় নয়, কাজে। আর সেই বিচার করবে ইতিহাস ও
আপনার মতামত জানানঃ