Trial Run

মুজিবচর্চার সেকাল একাল

জসিম মুহাম্মদ রুশনী :: হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে চর্চার একটা জোয়ার চলছে দেশে। এমনকি নবীন লিখিয়েরা প্রচারে আসার জন্যও ব্যবহার করছে এই ট্রেন্ড। ফলে একটা গড়পড়তা গড্ডালিকার পত্তন ঘটে গেছে। কোনও তত্ত্ব নেই, তথ্য নেই, উপাত্ত নেই, ইতিহাস নেই, আছে কেবল শব্দসর্বস্ব বন্দনা। এটাকে কী মুজিবচর্চা বলা যায়? আমি অন্ততঃ তা বলি না।

১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির পর থেকে আলোচনার পাদপ্রদীপ হয়ে ওঠেন তৎকালীন মুজিব ভাই। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের আদর্শানুসারীরা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্যরা, ভাসানী সাহেবের অনুগামীরা, এমনকি এককালের তুখোড় মুসলিম লীগাররাও মুজিব ভাইয়ের সৈনিক হয়ে যান। কারণ ছিলো একটাই – যে স্বপ্ন নিয়ে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হয়েছিলো এবং যেটাকে এই অঞ্চলের স্বাধীনতা মনে করা হচ্ছিলো সেই অপয়া ভাগাভাগিকে লাথি মেরে জাতীয় নিজস্বতা নিয়ে কথা বলবার মতো বাকসাহস কেবল শেখ মুজিবেরই ছিলো।

জসিম মুহাম্মদ রুশনী

শেখ মুজিব তাঁর আপোষহীন চেতনার বহ্নি জ্বেলে গোটা পূর্ব পাকিস্তানকে আলোকিত করেছিলেন। পুরো জনপদজুড়ে চলতে থাকে মুক্তির গণসঙ্গীত। কৃষক মজুর ছাত্র যুবক তথা আবালবৃদ্ধবনিতা একবাক্যে নেতা মেনে নেয় শেখ মুজিবকে। ৬৬ সালের ছয় দফা দাবি শেখ মুজিবকে নেতা থেকে নায়কে পরিণত করলো। অতঃপর ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান তাঁকে গণনায়ক বানিয়ে দিলো। বাঙালির কলমে তখন একটাই নায়ক, শেখ মুজিব আর শেখ মুজিব।

বলছিলাম মুজিবচর্চার কথা। মুজিবচর্চায় নির্মোহভাবে লেগে থাকা কলমযোদ্ধারা কোনওরূপ অনুকম্পা কিংবা দাক্ষিণ্য পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন না। তাঁরা লিখতেন গণমানুষের কথা, আর তাতেই অনিবার্যভাবে চলে আসতো শেখ মুজিবের কথা। এমনকি সব লেখককে বঙ্গবন্ধু চিনতেনও না। লেখকরাও যে তাঁর সাহচর্য কিংবা আশীর্বাদ পাওয়ার আশায় লিখতেন না, তা তো আগেই বলেছি।

স্বাধীন বাঙলাদেশে মুজিবচর্চা আরও গতিশীলতা পেলো। কিন্তু কোথায় যেন একটা বেসুরো টিউন। তাঁকে অতিমানব বানিয়ে ফেলবার এক কদর্য উন্নাসিকতার দেখা মিললো লেখকসমাজে। বেশুমার বই বেরুতে থাকে তাঁকে নিয়ে। লেখকের চাইতেও চামচাদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলো। এই সময়টাতেই ক্ষমতার অনুকম্পা প্রত্যাশী স্তাবকদের আত্মপ্রকাশ ঘটলো। স্তাবকরা এতোবেশি তেলবাজি শুরু করলো যে তিনি গণবিচ্ছিন্ন এক গণনায়কে পরিণত হয়ে গেলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু সুহৃদরা ছিঁটকে পড়লেন তাঁর নৈকট্য থেকে। সেইসব জায়গা দখল করে নিলো স্তাবকরা।

স্তাবকদের কারণে বঙ্গবন্ধু গণবিচ্ছিন্ন হচ্ছিলেন কথাটা হয়তো খটোমটো রকমের, কিন্তু বাস্তবতা ততোধিক কঠিন। স্তাবকদের কারণেই তিনি দেশের আর্থসামাজিক চিত্রটা দেখতে পাচ্ছিলেন না। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশে আসছিলো প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য কিন্তু সেগুলোর সুফল পাচ্ছিলো না জনগণ। রাষ্ট্রীয় কোষ শূন্য করে কতিপয় চাটার দল আখের গুছিয়ে নিচ্ছিলো। এমনকি সেই লুটপাটের সাথে তাঁর সন্তানকেও জড়িয়ে নিয়েছিলো চাটাবাজরা। “শেখ কামালের ব্যাঙ্ক ডাকাতি”র যে গল্পটা আওয়ামী পতনের পরে চাউর হয়েছিলো, সেটাও সেইসব স্তাবকেরাই তৈরি করেছিলো।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো। তিনি পরিবার পরিজনসহ শাহাদাৎ বরণ করলেন। দেশের শাসনক্ষমতা চলে গেলো প্রতিবিপ্লবীদের হাতে। সেই সময়ে এতোদিনকার স্তাবকেরা ভিন্নরূপে আবির্ভুত হলো। তারা বঙ্গবন্ধুকে একজন অপরিপক্ক শাসক হিসেবে তুলে ধরতে প্রয়াসী হলো। এই ভিন্নমাত্রার মুজিবচর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা করলো স্বয়ং রাষ্ট্র। নিহত বঙ্গবন্ধুর চরিত্রহননের মিশনে নামলো সেই স্তাবকরা। মুজিববিদ্বেষী শাসকরা সেই মিশনারী ভাড়াটে লেখকদের নানান পদে পদায়িত করে ভ্রান্ত মুজিবচর্চায় উৎসাহিত করলো। দীর্ঘ একুশ বছর চললো সেই অপচর্চা।

একুশ বছরের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনতার মহানায়কের চরিত্রহননের যে কালো অধ্যায় চলছিলো সেই সময়েও কিছু মানুষ সঠিকচর্চার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। তাঁরা গানে গল্পে কবিতায় উপন্যাসে চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত চরিত্র ফুটিয়ে তুলবার দুর্বার প্রয়াস চালাতে থাকে। এই ধারার শিল্পী সাহিত্যিকরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নেরও শিকার হয়। শত নিপীড়নও তাঁদেরকে মুজিবচর্চা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধুর দল ক্ষমতায় এলো। যথারীতি আবির্ভূত হলো একদল স্তাবক। তারা মুজিবকন্যার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পদায়িত হবার পুরনো ফন্দিতে ফিরে গেলো। মুজিবকন্যাও যথারীতি বিমুগ্ধ হলেন স্তাবকদের প্রতি। যা হওয়ার তা -ই হলো। অতিমাত্রায় বঙ্গবন্ধু বন্দনা অতিষ্ঠ করলো মানুষকে। কিন্তু স্তাবকরা সেটা বুঝতেই দিলো না মুজিবকন্যাকে। তিনিও বুঝলেন তখন, যখন বুঝেও কিছু করবার ছিলো না। তারপর আরও পাঁচ বছর। মুজিবচর্চার ক্ষেত্রে সমানে সমানে চললো স্তাবক আর প্রকৃত লিখিয়দের দ্বৈরথ। সেই দ্বৈরথে অনেক অমূল্য স্মারকের সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই অমূল্য স্মারকগুলোর কল্যাণেই ২০০৬ সালে ধুমকেতুর মতো আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বঙ্গবন্ধুর সাংবিধানিক সম্মান বহাল করলো।

এরপরের ইতিহাস সবার জানা। টানা একযুগ ধরে ধরে ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধুর দল। কিন্তু তাত্বিক বিপর্যয় রোধ হলো না। প্রকৃত মুজিববাদীরা যথারীতি ছিঁটকে পড়লেন তেলবাজি করতে পারেন না বলে। সেই স্তাবকরাই সবকিছু দখল করে নিলো। এখন চলছে মুজিবচর্চার নামে স্তাবকলীলা। এ লীলার শেষ কখন জানা নেই।

জসিম মুহাম্মদ রুশনী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী


মতামত ও বিশ্লেষন বিভাগে প্রকাশিত সকল মতামত লেখকের নিজস্ব এবং এটি State Watch এর সম্পাদকীয় নীতির আদর্শগত অবস্থান ধরে নেওয়া  ঠিক হবে না।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ