Trial Run

ঘুরেফিরে সরকারি কাজ পাচ্ছে মুষ্টিমেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

ছবি: সংগৃহীত

সরকারি ক্রয়কাজে ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা শর্তের বেড়াজালে বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা অংশ নিতে পারছে না। আবার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারলেও অগ্রাধিকার তালিকায় সেই বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানরাই এগিয়ে থাকে। বিদেশিরাও কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে অনেক কাজ পাওয়ায় গুণমান ঠিক থাকছে না। নির্ধারিত সময়েও কাজ শেষ হচ্ছে না। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠান যেন সব কাজ না পায়। একই ঠিকাদারকে একই সঙ্গে অনেক প্রকল্পের কাজ দেওয়া যাবে না। একটি কাজ শেষে আরেকটি কাজ পাবে। দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কাজ পায় সে ব্যবস্থাও করতে হবে।

সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে ২০১১ সালে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় শুরু হয় ই-টেন্ডারিং। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধির দুর্বলতার কারণে সরকারের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, ই-টেন্ডারের আইনি মারপ্যাঁচে ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাই ছোট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় পক্ষ হয়ে কাজে অংশ নিচ্ছে। কয়েক হাত ঘুরে বাস্তবায়ন হওয়া উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ হচ্ছে না। ফলে একই প্রকল্পে বারবার ডিপিপি সংশোধন হচ্ছে। বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়ও।

সরকারপ্রধানের এ অনুশাসন বাস্তবায়নে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে কী কী কারণে একই প্রতিষ্ঠান অনেক প্রকল্পের ঠিকাদারি পাচ্ছে। কেন ছোট ও দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, দরপত্রের শর্তের বেড়াজালের কারণেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এসব শর্ত বদলের সুপারিশ ইতোমধ্যে সরকারি কেনাকাটার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ক্রয় ও কারিগরি ইউনিটে (সিপিটিইউ) পাঠিয়েছে সওজ।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটিতে নিবন্ধিত ঠিকাদারের সংখ্যা ৮৪৫। বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২৩২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১টি প্রকল্পে ২২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার কাজ করছে। এর অর্ধেক ১১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার কাজ করছে সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। শীর্ষ ২০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করছে ১৮ হাজার কোটি টাকার কাজ। অবশিষ্ট সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার কাজ করছে ২১২টি প্রতিষ্ঠান। বড় সাত প্রতিষ্ঠানের গড়ে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি কাজ চলমান রয়েছে। ছোট ২১২ প্রতিষ্ঠানের গড়ে ২১ কোটি টাকার কাজ রয়েছে। ৬১৩টি প্রতিষ্ঠানের হাতে কোনো কাজ নেই।

সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) এ কে এম মনির হোসাইন পাঠান বলেছেন, ‘টেন্ডার ক্যাপাসিটি ফর্মুলা’ ও ‘টেন্ডার মূল্যায়ন ম্যাট্রিক্স’-এর নিয়ম বদলের প্রস্তাব করা হয়েছে। আরও কিছু সুপারিশ করা হয়েছে সিপিটিইউর কাছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা হলে মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠান সব ঠিকাদারি পাবে না। ছোট কিংবা বড় নয়, যোগ্য প্রতিষ্ঠান ঠিকাদারি পাবে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো চিঠিতে সওজ বলেছে, এ কারণে ছোট ঠিকাদারদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। সওজের নিজস্ব সভায় প্রস্তাব করা হয়েছে, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রকল্পের কাজগুলো ই-জিপিতেই সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে (এলটিএম) আহ্বান করা প্রয়োজন। তবে এলটিএম লটারিতে অযোগ্য ঠিকাদারের কাজ পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য এ প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে সওজ কর্মকর্তাদের।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) কর্মকর্তারা বলেন, বার্ষিক লেনদেন (টার্নওভার) দেখে কাজ দেওয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি কাজ পাচ্ছে। ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রেট শিডিউল হতে ১০ শতাংশের বেশি-কম রেটে টেন্ডার জমা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বেশির ভাগ সময় একই রেটে একাধিক টেন্ডার জমা পড়ে। এক্ষেত্রে যার টার্নওভার বেশি তাকেই কাজ দেওয়া হয়। তাছাড়া কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় বহু ঠিকাদার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না।

এমন আইনি দুর্বলতায় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোই কাজ পেয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো দপ্তর-সংস্থার কেনাকাটা পুরোপুরি ই-টেন্ডারিংয়ের আওতায় এখনো আসেনি। এক্ষেত্রে ঐ সংস্থা কেনাকাটার জন্য তাদের পছন্দসই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করছে। গুটিকয়েক ঠিকাদার শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তর নয়, সরকারের প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থায় কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ), শিক্ষা প্রকৌশল (ইইডি), স্বাস্থ্য প্রকৌশল (এইচইডি), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল (এলজিইডি) অধিদপ্তর, বিদ্যুত্ উন্নয়ন ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব ঠিকাদার সবচেয়ে বেশি কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন।

সওজ সূত্র জানিয়েছে, দরপত্রে অনিয়ম ঠেকাতে নানা শর্ত যোগ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে সেগুলোই সমস্যা সৃষ্টি করছে। ইলেক্ট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) করা হয়েছিল দরপত্র প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে। কিন্তু এখন ‘সরিষায় ভূত’ দেখা দিয়েছে। সওজ সূত্র জানা গেছে, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠাগুলোর সক্ষমতা মূল্যায়নে (অ*১.৫*ঘ-ই) ফ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একজন ঠিকাদার বিগত পাঁচ বছরে যত প্রকল্পের কাজ করেছে তার মূল্যের (অ) দেড়গুণ টাকার কাজ করার সক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ কোনো ঠিকাদার বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে ১০০ কোটি টাকার কাজ করলে তার প্রতিষ্ঠান ১৫০ কোটি টাকার কাজের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে। তার কতটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে তা বিবেচিত হবে না। এছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সামর্থ্যের কারণে এই ফ্যাক্টর দ্বিগুণ বা তার বেশিও ব্যবহূত হয়। এ কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা বঞ্চিত হচ্ছে। এ সমস্যা নিরসনে ‘টেন্ডার ক্যাপাসিটি ফর্মুলায় ফ্যাক্টরটি ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ২৫ করার সুপারিশ করেছে সওজ।

এছাড়াও দরপত্র মূল্যায়নে বিগত পাঁচ বছরের কাজের মূল্যায়ন নম্বর ১০০ এবং চলমান কাজের নম্বর কমিয়ে ৬০ করার প্রস্তাব করেছে সওজ। বর্তমান নিয়মে দরপত্র মূল্যায়নে অতীতে করা কাজের (পাস্ট পারফরম্যান্স ম্যাট্রিক্স) মূল্যের ৭৫ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমা বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক কোটি টাকার কাজে একই দর (একই পরিমাণ টাকা) প্রস্তাব করলে, যে প্রতিষ্ঠান বিগত পাঁচ বছরে ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত যত কাজ করেছে তা সব বিবেচনায় আসবে। সে ঠিকাদার মূল্যায়ন নম্বর পাবে। নিম্নসীমা না থাকায় ছোট ছোট কাজও মূল্যায়নে চলে আসে। এতে যে ঠিকাদার অতীতে বেশি কাজ করেছে, সেই নতুন কাজ পাচ্ছে। এ কারণে মাইনাস ৭৫ ভাগ নিম্নসীমা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে এক কোটি টাকার দরপত্রে অতীতে করা ২৫ লাখ টাকার কমের প্রকল্প বিবেচনায় আসবে না।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, দরপত্র প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগার কারণে একই সময়ে অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন থাকা অন্য দরপত্রের বিষয়টি মূল্যায়নে আসে না। অর্থাৎ অন্য যেসব কাজ ওই প্রতিষ্ঠান পেতে যাচ্ছে, তা মূল্যায়নে আসে না। এ কারণে একটি প্রতিষ্ঠান একই সময়ে একাধিক কাজ পেয়ে যায়।

সওজ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে অনেক প্রকল্পে কাজ করছে, তারা একই যন্ত্রপাতি ও জনবল একাধিক জায়গায় ব্যবহার করে। ফলে কাজ ঠিকঠাক হয় না। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হয় না। এ কারণে যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়োগের সময়সীমা দরপত্রের শর্তে জুড়ে দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য যে প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা নিজস্ব জনবল ও যন্ত্রপাতি নিয়োগ করবে তাকে অধিক নম্বর দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সওজ। ফলে একই যন্ত্রপাতি ও লোকবল দিয়ে একাধিক কাজ বন্ধ হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অভিযোগ রয়েছে, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও মূল্যায়ন কমিটির কর্মকর্তারা দুর্বল আইনের সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন। যেসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হবে, আগে থেকেই তাদের নির্ধারণ করে রাখে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান। সুবিধাজনকভাবে ডিপিপি তৈরি করে আগে থেকে ওই প্রতিষ্ঠানকে দরও জানিয়ে দেয়া হয়। এতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা বিনষ্ট হচ্ছে। কাজেই দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় ঠিকাদারি কাজ দেয়ার দৃষ্টান্তও কম নয়। উপর্যুপরি সরকারের আমলে এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও সুশাসন নিশ্চিতে এ ধরনের মন্দ সংস্কৃতিরও অবসান জরুরি।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/১৭৫৩

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ