Trial Run

অপহরণ মামলায় ৬ পুলিশ সদস্য কারাগারে

রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বিভিন্ন মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এ ছাড়া থানায় তদন্তাধীন মামলাও থাকে। ফলে দেখা যায়, গ্রেপ্তার অভিযানে অনেক নিরীহ মানুষ যখন ধরা পড়েন তখন তাদের ওসব মামলায় ফাঁসানো হয়। তারপর টাকায় রফা হয়। এসব ছাড়াও পুলিশ রাস্তা থেকে নিরীহ ধরে মামলার ভয় দেখিয়ে যা আছে তাই ছিনতাই করে নেয়। তাই নিরীহ মানুষের নিকট পুলিশ মানেই এক আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনের ক্ষমতা দেখিয়ে টাকা লুটে নেওয়ার এসব অভিযোগ এখন পুরনো হয়ে গেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের চেয়েও যেন বেশি অভিযোগ আসে। সাম্প্রতিক সময়ে এই হারটা যেন বেড়েই চলেছে। আইনের ক্ষমতা দেখিয়ে নিরীহ ফাঁসিয়ে টাকা লুট করে নিলেও পুলিশ অপহরণ করেও কিডনাপারদের মতো মুক্তিপণ আদায় করছে। এমনি এক অভিযোগে গতকাল রোববার(০৭ ফেব্রুয়ারি) ৬ পুলিশ সদস্যকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। অভিযোগ, চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানা এলাকায় এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর তারা টাকা আদায় করেছেন। এ ঘটনায় জড়িতরা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এসএএফ শাখায় কর্মরত ছিলেন।

চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা থানা পুলিশ তদন্তে নেমে এ ছয় পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। পরে রোববার চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিপলু কুমার দে’র আদালতে তোলা হলে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করে পুলিশ। ফলে কারাগারে পাঠানোর একদিন পর ঘটনা জানাজানি হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ছয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত পুলিশ কনস্টেবলরা হলেন- আবদুল নবী, এসকান্দর হোসেন, মনিরুল ইসলাম, শাকিল খান, মাসুদ ও মোর্শেদ বিল্লাহ। তারা সবাই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্য।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলার কোর্ট ইন্সপেক্টর সুব্রত ব্যানাজী জাতীয় এক দৈনিককে বলেন, আনোয়ারা থানার একটি অপহরণ করে অর্থ আদায়ের মামলায় ছয় পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করে রোববার আদালতে পাঠানো হয়। পরে শুনানি শেষে আদালত ছয় আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সেই মোতাবেক তাদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ভিকটিম ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান বলেন, ৩ ফেব্রুয়ারি রাত ২টার দিকে আটজন পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে আনোয়ারার পূর্ব বৈরাগী গ্রামে আমার বাড়িতে গিয়ে দরজা নাড়েন। পুলিশ পরিচয় পেয়ে আমি দরজা খুলে দেই। তারা আমার ভাইকে খুঁজে না পেয়ে আমার নামে মামলা আছে বলে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। চারটি মোটরসাইকেলে করে আনোয়ারা থেকে পটিয়া থানার কৈয়গ্রাম রাস্তার মাথা নামের এলাকায় নিয়ে একটি টং চা দোকানের সামনে বসান। সেখানে বসিয়ে মামলার নানা কথাবার্তা বলে ছাড়া পেতে গেলে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে বলে জানান। আমার কাছে এত টাকা নাই জানানোর পর তারা পাঁচ লাখ টাকা দিতে বলেন। পরে তিন লাখ দিতে বলেন। এসময় আমি আমার চাচাতো ভাইদের ফোন করে ১ লাখ ৮০ হাজার ৫০০ টাকা তাদের হাতে তুলে দেই।

তিনি বলেন, তারা সেখান থেকে রাতে আমাকে ছেড়ে দিয়ে পটিয়ার দিকে মোটরসাইকেলে করে চলে যান। তার পর দিন এ ঘটনার কথা উল্লেখ করে আনোয়ারা থানায় আমি লিখিত একটি অভিযোগ দেই। এ চক্রটি আমার মতো আমাদের গ্রামের আরেক ব্যবসায়ী ফোরকান নামে একজনকে ফোন দিয়ে হুমকিধমকি দেন। তিনি তা ফোনে রেকর্ড করেন। দু’টি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে থানা পুলিশ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ছয় সদস্যের সম্পৃক্ততা পান। এ ছয়জনকে আটক করার পর আমি মহানগর পুলিশের ডিবির এক শীর্ষ কমকর্তার বডিগার্ডকে শনাক্ত করি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ মোহাম্মদ আবদুর রউফ ওই দৈনিককে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে কাজ করছে। এক্ষেত্রে কেউ অপরাধ করলে তিনি যেই হন না কেন তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আনোয়ারায় একটি অপহরণের ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাদেরও আইনের আওতায় আনা হয়। পেশাগত পরিচয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, পুলিশের মতো একটি বড় বাহিনীতে নানা ধরনের ও মানসিকতার লোক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সেখানে কেউ কেউ দুর্নীতি ও অপকর্ম করবে বা করার চেষ্টা করবে, তা-ও স্বাভাবিক। এটা মোকাবিলার পথ হচ্ছে শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে সদস্যদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, যথাযথ তদন্ত করা এবং কেউ কোনো ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়লে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বাহিনী হিসেবে পুলিশকে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, তার অপব্যবহার নাগরিকের জন্য যে চরম ভীতিকর ও হয়রানিমূলক হতে পারে, তা মাঝেমধ্যে আমরা টের পাই।

তারা বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা সাধারণভাবে খুবই হতাশার। পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুলিশ প্রশাসন যে অবস্থানটি নেয়, তা হচ্ছে অস্বীকারের নীতি। পুলিশের কেউ অপকর্ম করেছে, এটা স্বীকার করে নেওয়া হলে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে—এমন মানসিকতাই সম্ভবত এ ক্ষেত্রে কাজ করে। কিন্তু এই মানসিকতা খুবই বিপজ্জনক এবং এটা বরং পুলিশের ভাবমূর্তিকে আরও খারাপের দিকেই নিচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/২০০৮ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ