একসময় মানুষ মনে করত, পৃথিবীই মহাবিশ্বে প্রাণের একমাত্র আবাস। কিন্তু বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, ততই এই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মঙ্গল গ্রহে পানির চিহ্ন, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার বরফঢাকা মহাসাগর কিংবা শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসের বরফগিজার—সবই বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এখন সেই আলোচনায় নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে সৌরজগতের সবচেয়ে বৈরী গ্রহগুলোর একটি—শুক্র। অবাক করার বিষয় হলো, গবেষকেরা মনে করছেন, সেখানে যদি কোনো ধরনের অণুজীবের অস্তিত্ব থেকেও থাকে, তবে তার জন্ম হয়তো শুক্রে নয়, বরং পৃথিবীতেই।
শুক্রকে দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর ‘যমজ গ্রহ’ বলা হয়। আকার, ভর এবং গঠনের দিক থেকে পৃথিবীর সঙ্গে এর বিস্ময়কর মিল রয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুক্রের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৪৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সীসাও গলিয়ে দিতে পারে। ঘন কার্বন ডাই-অক্সাইডে ভরা বায়ুমণ্ডল, ভয়ংকর বায়ুচাপ এবং সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘ—সব মিলিয়ে এটি সৌরজগতের সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশগুলোর একটি। তাই বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সেখানে প্রাণ টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।
তবে বিজ্ঞানের সৌন্দর্য এখানেই যে, প্রতিটি উত্তর নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। শুক্রের বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে তাপমাত্রা ও চাপ পৃথিবীর কিছু পরিবেশের সঙ্গে তুলনীয়। এসব স্তরে ক্ষুদ্র অণুজীবের মতো জীবন টিকে থাকতে পারে কি না, তা নিয়ে কয়েক দশক ধরেই গবেষণা চলছে। সাম্প্রতিক গবেষণা সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘প্যানস্পারমিয়া’ নামে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। এই ধারণা অনুযায়ী, প্রাণের মৌলিক উপাদান বা অণুজীব এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে প্রাকৃতিক উপায়ে স্থানান্তরিত হতে পারে। বিশাল কোনো গ্রহাণুর আঘাতে কোনো গ্রহের শিলা মহাকাশে ছিটকে যেতে পারে। সেই শিলার ভেতরে যদি অণুজীব বা জৈব উপাদান থেকে থাকে, তবে দীর্ঘ মহাকাশযাত্রা শেষে তা অন্য গ্রহে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। অনুকূল পরিবেশ পেলে সেই উপাদান নতুন পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগও পেতে পারে।
শুনতে এটি যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও, গত কয়েক দশকে বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু অণুজীব অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। পৃথিবীর কিছু ব্যাকটেরিয়া, স্পোর এবং অতি ক্ষুদ্র জীব মহাকাশের বিকিরণ, চরম ঠান্ডা এবং অক্সিজেনহীন পরিবেশও সহ্য করতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনেও এমন অনেক পরীক্ষা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট অণুজীব দীর্ঘ সময় মহাকাশে টিকে থেকেছে। এসব ফলাফল প্যানস্পারমিয়া তত্ত্বকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়েছে।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কম্পিউটারভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে হিসাব করেছেন, কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবী থেকে অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবাণু বা জৈব কণা শুক্রের দিকে ছিটকে যেতে পারে। পৃথিবীতে বড় ধরনের উল্কাপাত বা মহাজাগতিক সংঘর্ষের সময় শিলাখণ্ড মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। এসব শিলার ভেতরে থাকা অণুজীব যদি যাত্রাপথে ধ্বংস না হয়, তবে তারা শুক্রের বায়ুমণ্ডলে পৌঁছাতে পারে।
অবশ্য শুক্রের পৃষ্ঠে পৌঁছালে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের আগ্রহ পৃষ্ঠে নয়, বরং মেঘস্তরে। শুক্রের মেঘের নির্দিষ্ট উচ্চতায় তাপমাত্রা ও চাপ তুলনামূলকভাবে সহনীয়। যদিও সেখানে সালফিউরিক অ্যাসিডের উপস্থিতি রয়েছে, তবু পৃথিবীতেও এমন কিছু অণুজীব পাওয়া গেছে, যারা অত্যন্ত অম্লীয় পরিবেশে বেঁচে থাকতে সক্ষম। ফলে বিজ্ঞানীরা একেবারে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
এই গবেষণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে যদি কোনো মহাকাশযান শুক্রে অণুজীবের অস্তিত্বের প্রমাণ পায়, তাহলে কি সেটিকে সত্যিকার অর্থে ‘ভিনগ্রহের প্রাণ’ বলা যাবে? গবেষকদের মতে, উত্তরটি এত সহজ নয়। কারণ সেই জীব হয়তো কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকেই সেখানে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ আমরা যাকে ভিনগ্রহের প্রাণ ভাবব, সে হয়তো আমাদেরই বহু দূরের জৈব আত্মীয়।
এই ধারণা জীববিজ্ঞানের প্রচলিত চিন্তাকেও বদলে দিতে পারে। এত দিন বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, প্রতিটি গ্রহে প্রাণের উৎপত্তি আলাদা আলাদা প্রক্রিয়ায় হয়েছে বা হতে পারে। কিন্তু যদি প্যানস্পারমিয়া সত্যি হয়, তাহলে সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহে জীবনের মধ্যে একটি জৈবিক সম্পর্ক থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে পৃথিবীর জীবন একা নয়; বরং মহাজাগতিক ভ্রমণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জীবনের অংশ হতে পারে।
অবশ্য এই গবেষণা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। এটি একটি সম্ভাবনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ মাত্র। বিজ্ঞানের নিয়মই হলো—প্রমাণ ছাড়া কোনো ধারণাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তাই ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা শুক্রে নতুন মিশনের পরিকল্পনা করছে। উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে শুক্রের মেঘস্তরের রাসায়নিক গঠন, অণুজীবের সম্ভাব্য উপস্থিতি এবং জৈব অণুর অস্তিত্ব খুঁজে দেখা হবে।
এ ধরনের গবেষণা শুধু শুক্র নয়, পৃথিবীকেও নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করছে। কারণ পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, সেটি এখনো বিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য। যদি দেখা যায় প্রাণ এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে ছড়িয়ে যেতে পারে, তাহলে পৃথিবীর প্রাণের উৎস সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন উঠবে। সম্ভব কি, পৃথিবীর জীবনও আরও দূরের কোনো মহাজাগতিক উৎস থেকে এসেছে? যদিও এখনো এর কোনো প্রমাণ নেই, তবু বিজ্ঞান এই সম্ভাবনাকেও পুরোপুরি অস্বীকার করছে না।
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস বলছে, অনেক অসম্ভব ধারণাই একসময় বাস্তবে পরিণত হয়েছে। একসময় মানুষ ভাবত, চাঁদে যাওয়া কেবল কল্পকাহিনি। পরে মানুষ চাঁদে পা রেখেছে। মঙ্গলে রোবট পাঠানোও একসময় ছিল অবিশ্বাস্য। আজ সেখানে একাধিক রোভার কাজ করছে। তাই শুক্রের মেঘে প্রাণের সম্ভাবনাও আজ কল্পনা মনে হলেও, আগামী কয়েক দশকে হয়তো এর উত্তর হাতে চলে আসবে।
এই গবেষণা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—প্রকৃতি মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়কর। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পরিবেশেও যেমন প্রাণ টিকে থাকে, তেমনি মহাবিশ্বের অজানা কোণেও জীবনের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে। গভীর সমুদ্রের আগ্নেয় ছিদ্র, বরফঢাকা অ্যান্টার্কটিকা কিংবা মরুভূমির উত্তপ্ত পাথরের নিচে যেমন অণুজীবের সন্ধান মিলেছে, তেমনি হয়তো একদিন শুক্রের মেঘেও জীবনের ক্ষীণ স্পন্দন ধরা পড়বে।
সবশেষে বলা যায়, শুক্রে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নয়, বরং একটি নতুন বৈজ্ঞানিক দিগন্তের সূচনা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাবিশ্ব এখনো অসংখ্য অজানা রহস্যে ভরা। হয়তো একদিন আমরা জানতে পারব, পৃথিবীর প্রাণ শুধু এই নীল গ্রহেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মহাকাশের দীর্ঘ যাত্রায় তার কিছু ক্ষুদ্র প্রতিনিধি অন্য কোনো গ্রহেও পৌঁছে গেছে। আর যদি সত্যিই এমনটি ঘটে থাকে, তাহলে মহাবিশ্বে জীবনের ইতিহাস নতুনভাবে লিখতে হবে—যেখানে পৃথিবী শুধু একটি গ্রহ নয়, বরং জীবন ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাব্য এক মহাজাগতিক উৎস হিসেবেও বিবেচিত হবে।
আপনার মতামত জানানঃ