পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসে সক্রেটিস এমন এক নাম, যিনি নিজে কোনো বই লেখেননি, কিন্তু তাঁর চিন্তা আজও বিশ্বকে আলোড়িত করে। অথচ এই মানুষটিকেই একসময় এথেন্সের আদালতে দাঁড় করানো হয়েছিল রাষ্ট্রবিরোধী, ধর্মদ্রোহী এবং তরুণদের বিপথে পরিচালিত করার অভিযোগে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি প্রশ্ন ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে—সক্রেটিস কি সত্যিই স্বৈরাচারের সমর্থক ছিলেন, নাকি তিনি কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ের এক বলির পাঁঠা?
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগ ছিল এথেন্সের জন্য এক অস্থির সময়। দীর্ঘ পেলোপনেশীয় যুদ্ধ নগররাষ্ট্রটির অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। যুদ্ধের পরাজয়ের পর গণতান্ত্রিক সরকার ভেঙে পড়ে এবং ক্ষমতায় আসে ‘থার্টি টায়রান্টস’ নামে পরিচিত এক অলিগার্কিক শাসনব্যবস্থা। মাত্র কয়েক মাসের শাসনকালেই তারা হত্যা, নির্বাসন এবং সম্পদ দখলের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে গণতন্ত্র ফিরে এলেও সমাজে রয়ে যায় ক্ষোভ, অবিশ্বাস এবং প্রতিশোধের মানসিকতা।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় সক্রেটিসের নাম সামনে আসে। কারণ, তাঁর কয়েকজন পরিচিত শিষ্যের মধ্যে ছিলেন ক্রিটিয়াস এবং আলসিবিয়াদেস—যাঁরা পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এখান থেকেই তৈরি হয় সেই ধারণা যে সক্রেটিস হয়তো এমন এক চিন্তার জন্ম দিয়েছিলেন, যা গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু ইতিহাস কি সত্যিই তা বলে?
সক্রেটিসের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রশ্ন করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্ধভাবে কোনো মতবাদ বা ক্ষমতাকে গ্রহণ করা উচিত নয়। মানুষের উচিত নিজের বিশ্বাসকে যুক্তির আলোয় যাচাই করা। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—‘অপরীক্ষিত জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’—শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার আহ্বান নয়; এটি ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান।
এই প্রশ্ন করার অভ্যাসই তাঁকে জনপ্রিয় যেমন করেছিল, তেমনি অস্বস্তিকরও করে তুলেছিল। রাজনীতিবিদ, কবি, সেনাপতি কিংবা প্রভাবশালী নাগরিক—কেউই তাঁর প্রশ্নের বাইরে ছিলেন না। তিনি ক্ষমতার সামনে নত হননি; বরং ক্ষমতাকেই জবাবদিহির মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন। আর ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, প্রশ্নকারী মানুষ ক্ষমতার কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠেন।
৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়—তিনি রাষ্ট্রীয় দেবতাদের অস্বীকার করেন এবং এথেন্সের তরুণদের বিপথে পরিচালিত করেন। এই অভিযোগে রাজনৈতিক শব্দ ব্যবহার না হলেও বিচারটি ছিল গভীরভাবে রাজনৈতিক। কারণ, সরাসরি স্বৈরশাসকদের সহযোগী হওয়ার অভিযোগ আনার সুযোগ তখন আইনি কারণে সীমিত ছিল। ফলে নৈতিক ও ধর্মীয় অভিযোগই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যম।
সক্রেটিস আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি ক্ষমা চাননি, নিজের মত বদলাননি এবং বিচারকদের সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো নাটকীয় অনুতাপও প্রকাশ করেননি। বরং তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি মানুষের মঙ্গলই করেছেন, কারণ তিনি তাদের চিন্তা করতে শিখিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত অল্প ভোটের ব্যবধানে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
বন্ধুরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রের আইন ভুল হলেও নাগরিকের দায়িত্ব আইনকে সম্মান করা। এই নৈতিক অবস্থান তাঁকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেলেও দর্শনের ইতিহাসে তাঁকে অমর করে রেখেছে।
আজও গবেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, সক্রেটিসকে স্বৈরাচারের সমর্থক বলা ইতিহাসের সরলীকরণ। তাঁর কিছু পরিচিত ব্যক্তি পরে স্বৈরশাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন—এটি সত্য। কিন্তু কোনো শিক্ষক তাঁর ছাত্রের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কতখানি দায়ী, সে প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। বরং সক্রেটিসের জীবন ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ক্ষমতার অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে সত্য অনুসন্ধানকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
সক্রেটিসের বিচার তাই শুধু একজন দার্শনিকের মৃত্যুর ইতিহাস নয়; এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে সমাজ একজন প্রতীকী অপরাধী খুঁজে নেয়। ইতিহাসের নানা সময়ে, নানা দেশে একই প্রবণতা দেখা গেছে—অস্থিরতার সময় এমন কাউকে দায়ী করা হয়, যিনি বাস্তবে ক্ষমতাবান নন, কিন্তু জনমতের কাছে পরিচিত। এই কারণেই সক্রেটিসের বিচার আজও প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার কোনো সমাজে কতটা মূল্যবান, আর সেই স্বাধীনতা হারালে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সত্যের।
আপনার মতামত জানানঃ