উগান্ডার গভীর অরণ্যে, কিবালে ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে বহু বছর ধরে গবেষকেরা শিম্পাঞ্জিদের জীবন পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। মানুষের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রাণী আত্মীয় হিসেবে পরিচিত এই বুদ্ধিমান প্রাণীদের আচরণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বহু পুরোনো। তারা কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে, কীভাবে সন্তান লালন করে, কীভাবে খাবার সংগ্রহ করে কিংবা কীভাবে নিজেদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন তৈরি করে—এসব নিয়ে অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা শিম্পাঞ্জিদের এমন এক দিক সামনে এনেছে, যা শুধু প্রাণিবিদদেরই না, সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী এমনকি মানবসভ্যতা নিয়ে চিন্তিত মানুষদেরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রায় আট বছর ধরে চলা এক ভয়াবহ গোষ্ঠীগত সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, সহিংসতা, বিভাজন এবং ক্ষমতার লড়াই কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর শিকড় হয়তো আরও গভীরে, আমাদের বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যেই প্রোথিত।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ। সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে একসময় ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত একটি বিশাল শিম্পাঞ্জি সমাজ ধীরে ধীরে বিভক্ত হয়ে ভয়ংকর গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল এনগোগো সম্প্রদায়—যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিচিত শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠীগুলোর একটি। প্রায় ২০০ সদস্যের এই সম্প্রদায় বহু বছর ধরে একত্রে বাস করত। তারা দলবদ্ধভাবে খাবার সংগ্রহ করত, পরস্পরের যত্ন নিত, শিশুদের রক্ষা করত এবং বহিরাগত শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকত। গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে মনে করতেন, এত বড় একটি গোষ্ঠী হয়তো সামাজিক সহযোগিতার অসাধারণ উদাহরণ হয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
২০১৯ সালের একটি ঘটনা পুরো সংঘাতের নির্মম চিত্র স্পষ্ট করে তোলে। ব্যাসি নামের ৩৬ বছর বয়সী এক পুরুষ শিম্পাঞ্জি, যে বহু বছর ধরে একই দলের অংশ ছিল, হঠাৎ করেই নিজের পরিচিত সদস্যদের আক্রমণের শিকার হয়। প্রত্যক্ষদর্শী গবেষকেরা জানান, প্রায় ১৩টি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জি সংগঠিতভাবে তাকে ঘিরে ফেলে। তারা তাকে গাছ থেকে টেনে নিচে নামায়, পালাক্রমে কামড়াতে থাকে, আঘাত করতে থাকে, যতক্ষণ না সে নিথর হয়ে পড়ে। এই দৃশ্য শুধু সহিংসই ছিল না, ছিল ভয়াবহভাবে পরিচিত। কারণ হত্যাকারীরা ছিল তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী—যাদের সঙ্গে সে বহু বছর কাটিয়েছে।
এই ঘটনাই গবেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। মানুষের ইতিহাসে আমরা প্রায়ই দেখি, একই সমাজের মানুষ রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত বিভাজনের কারণে একসময় একে অপরের শত্রু হয়ে ওঠে। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ কিংবা গণহত্যার ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য। কিন্তু শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও যখন একই ধরনের বিভাজন ও সংগঠিত সহিংসতা দেখা যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—সহিংসতার এই প্রবণতা কি কেবল সামাজিক শিক্ষা, নাকি এর গভীরে কোনো জৈবিক বা বিবর্তনগত উপাদানও রয়েছে?
গবেষকেরা বলছেন, এই সংঘাত হঠাৎ করে শুরু হয়নি। বরং বহু ছোট ছোট পরিবর্তন ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল সমাজকে ভেঙে দিয়েছে। ২০১৪ সালে শ্বাসকষ্টজনিত এক মহামারীতে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ শিম্পাঞ্জি মারা যায়। এরা ছিল দলের অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী সদস্য, যারা বিভিন্ন উপদলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখত। অনেকটা মানুষের সমাজের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা, প্রবীণ অভিভাবক বা সামাজিক মধ্যস্থতাকারীদের মতো তারা সংঘাত কমাতে ভূমিকা রাখত। তাদের মৃত্যুতে সামাজিক কাঠামোর ভেতরের অদৃশ্য ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
এরপর আসে নেতৃত্ব পরিবর্তন। ২০১৫ সালে এক নতুন আলফা মেল ক্ষমতা দখল করে। শিম্পাঞ্জি সমাজে আলফা মেল কেবল নেতা নয়, সে ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক প্রভাবের কেন্দ্র। নতুন নেতৃত্বের আগমন সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অস্থিরতা তৈরি করে। এই নতুন আলফা মেল আরও আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করতে থাকে, ফলে দলের ভেতরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ছোট ছোট দ্বন্দ্ব জমে একসময় বড় ফাটলে রূপ নেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল দলের বিশাল আকার। সাধারণত শিম্পাঞ্জিদের দল ছোট হয় এবং সদস্যরা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। কিন্তু প্রায় ২০০ সদস্যের এই বিশাল সম্প্রদায়ে সবাই সবার সঙ্গে সমান যোগাযোগ রাখতে পারছিল না। ধীরে ধীরে সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। কেউ কেউ আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করতে শুরু করে। গবেষকদের মতে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে গেলে বিভাজনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মানুষের সমাজেও বড় রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল কিংবা সামাজিক গোষ্ঠীর ভেতরে একই ধরনের প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়।
২০১৮ সালের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে পুরো দলটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে—‘পশ্চিমপাড়া’ এবং ‘মধ্যপাড়া’। একসময় যারা একসঙ্গে চলাফেরা করত, তারা এখন আলাদা এলাকা দখল করতে শুরু করে। একে অপরকে এড়িয়ে চলা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া এবং সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষের দুর্বল সদস্যদের ওপর হামলা চালানো ছিল তাদের নতুন বাস্তবতা।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই সহিংসতা ছিল পরিকল্পিত। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, হামলাগুলো হঠাৎ রাগের বশে নয়; বরং ওত পেতে, দলবদ্ধভাবে, কৌশল মেনে পরিচালিত হতো। দুর্বল বা একা থাকা সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে মায়েদের কাছ থেকে নবজাতক ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই আচরণ শুধু শারীরিক সহিংসতা নয়, প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংস করার প্রচেষ্টার দিকেও ইঙ্গিত করে।
২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত সাতটি বড় আক্রমণ এবং ১৭টি নবজাতক হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। গড়ে প্রতি বছর একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং দুটি নবজাতক এই সংঘাতের শিকার হয়েছে। প্রাণিজগতের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার সহিংসতা। গবেষকেরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু শিম্পাঞ্জিদের সামাজিক আচরণ বোঝার জন্যই নয়, মানবসভ্যতার সহিংসতার উৎস বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রখ্যাত গবেষক জেন গুডাল ১৯৭০-এর দশকে প্রথম শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এমন ভয়াবহ সংঘাত পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তখন তানজানিয়ার গোম্বে স্ট্রিম ন্যাশনাল পার্কে তিনি দেখেন, একই দলের সদস্যরা বিভক্ত হয়ে একে অপরকে হত্যা করছে। সেই অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। কারণ এর আগে মানুষ সাধারণত শিম্পাঞ্জিদের শান্তিপ্রিয় ও সহযোগিতামূলক প্রাণী হিসেবে কল্পনা করত। গুডালের পর্যবেক্ষণ প্রথমবারের মতো দেখায়, তাদের মধ্যেও সহিংসতা, ক্ষমতার লড়াই এবং গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ রয়েছে।
বর্তমান গবেষণা সেই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। তবে গবেষকেরা এটাও সতর্ক করে বলেছেন যে, এই তথ্যকে ব্যবহার করে মানব সহিংসতাকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অপরিহার্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। কারণ মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির মধ্যে মিল থাকলেও মানুষের রয়েছে নৈতিকতা, আইন, সংস্কৃতি এবং যুক্তিবোধের মতো জটিল সামাজিক কাঠামো। মানুষ চাইলে সহিংসতার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং সংঘাত এড়িয়ে যেতে পারে।
তবু এই গবেষণা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরে—কেন একই গোষ্ঠীর সদস্যরা হঠাৎ একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়? কেন গতকালের বন্ধু আজকের শত্রু হয়ে ওঠে? ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভয়, নেতৃত্বের সংকট কিংবা সামাজিক বিভাজন মানুষকে ভয়ংকর সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। শিম্পাঞ্জিদের সমাজেও একই ধরনের প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, সমাজ যত বড় হয়, ততই পারস্পরিক বিশ্বাস ও যোগাযোগ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যখন নেতৃত্ব দুর্বল হয় এবং সামাজিক সংযোগ ভেঙে যায়, তখন বিভাজন দ্রুত বাড়তে পারে। এটি শুধু প্রাণিজগত নয়, আধুনিক মানবসমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে গেলে, গুজব, প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার লড়াই সহজেই সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
এই গবেষণার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক সম্ভবত গবেষকদের ব্যক্তিগত অনুভূতি। যারা কয়েক দশক ধরে এই শিম্পাঞ্জিদের পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাদের অনেকেই এই প্রাণীদের প্রায় পরিবারের সদস্যের মতো চিনতেন। তারা দেখেছেন শিশু শিম্পাঞ্জিদের বড় হতে, বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে, আবার সেই একই প্রাণীদের পরবর্তীতে একে অপরকে নির্মমভাবে হত্যা করতে। তাই এই সংঘাত কেবল একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়; এটি সম্পর্ক ভাঙনের, বিশ্বাস হারানোর এবং সমাজ ভেঙে পড়ার এক গভীর ট্র্যাজেডির গল্প।
উগান্ডার অরণ্যে চলা এই গৃহযুদ্ধ হয়তো আমাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবিই তুলে ধরে। সভ্যতার অগ্রগতি সত্ত্বেও মানুষ এখনও বিভাজন, বিদ্বেষ এবং ক্ষমতার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। শিম্পাঞ্জিদের এই আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সহিংসতার সম্ভাবনা হয়তো আমাদের বিবর্তনেরই একটি অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সেই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা, সহমর্মিতা ও সংলাপের মাধ্যমে বিভাজন কমানো এবং সমাজকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা। কারণ শেষ পর্যন্ত, মানুষকে আলাদা করে তোলে কেবল তার শক্তি নয়, বরং নিজের প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করার ক্ষমতা।
আপনার মতামত জানানঃ