
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন, রাজনীতি ও অর্থনীতির এক জটিল সংযোগস্থল। শিল্পায়ন ও প্রবৃদ্ধির কথা বলে যে খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেই খাতই এখন দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় বোঝা হয়ে উঠেছে—এমনই চিত্র উঠে এসেছে সদ্য প্রকাশিত এক সরকারি পর্যালোচনায়। এই পর্যালোচনা শুধু বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তিগত সমস্যার হিসাবই তুলে ধরেনি, বরং ক্ষমতা, রাজনীতি ও কর্পোরেট স্বার্থের মধ্যে গড়ে ওঠা এক গভীর কাঠামোগত সংকটের দিকেও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে।
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করার ফলে বাংলাদেশকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। এই খরচ সরাসরি যুক্ত হচ্ছে বিদ্যুতের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের সঙ্গে, যার চূড়ান্ত চাপ গিয়ে পড়ছে শিল্পখাত ও সাধারণ ভোক্তার ওপর। বিদ্যুতের দাম এমন এক পর্যায়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্প—বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে।
সরকার নিযুক্ত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি উঠে এসেছে, তা হলো—এই অতিরিক্ত ব্যয় কোনো নীতিগত ভুল বা দুর্ঘটনাজনিত সিদ্ধান্তের ফল নয়। বরং এটি চুক্তির নকশার মধ্যেই পরিকল্পিতভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষায়, এটি রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি সিস্টেমেটিক যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বিদ্যুৎ খাতকে ব্যবহার করা হয়েছে ‘রেন্ট এক্সট্রাকশন’-এর একটি বড় মাধ্যম হিসেবে। অর্থাৎ, জনগণের অর্থ ব্যয় করে সীমিত কিছু গোষ্ঠীর জন্য নিশ্চিত ও অতিরিক্ত মুনাফার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই পর্যালোচনা এমন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে প্রকাশিত হয়েছে, যখন শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তীব্র। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্রসম্পৃক্ত চুক্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিস্তৃত তদন্ত শুরু করেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুট হয়েছে—একটি বিস্ময়কর ও ভয়াবহ অঙ্ক, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিকে ‘রেন্ট এক্সট্রাকশন’-এর সবচেয়ে প্রকট উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চুক্তিগুলো জরুরি আইন ব্যবহার করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা স্বাভাবিক নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই-বাছাইয়ের পথকে কার্যত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। পর্যালোচনার হিসাব অনুযায়ী, আদানির ভারতীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ যুক্তিসংগত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডমূল্যের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিচ্ছে। এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৪ থেকে ৫ মার্কিন সেন্ট।
শুধু দামই নয়, এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঝুঁকির বণ্টন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম ওঠানামা, মুদ্রা বিনিময় হারের পরিবর্তন এবং চাহিদাজনিত প্রায় সব ঝুঁকিই বহন করছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকপক্ষের মুনাফা কার্যত নিশ্চিত, কিন্তু ক্ষতির দায় পুরোপুরি রাষ্ট্র ও জনগণের ঘাড়ে। এ ধরনের চুক্তি কোনোভাবেই একটি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসতে পারে না—এমনটাই মত কমিটির।
আদানি পাওয়ার ছাড়াও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে দেশের প্রভাবশালী সামিট গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, ভারতের রিলায়েন্স পাওয়ার এবং জাপানের জেরা যৌথভাবে নির্মিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কথা। এসব প্রকল্পকে বলা হয়েছে ‘চরম অসঙ্গতির উদাহরণ’। কমিটির মতে, এসব চুক্তির শর্ত বিদ্যুৎ খাতে একটি গভীর শাসনব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। প্রতিবেদনের ভাষায়, “এই ভুল সিদ্ধান্তগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়। এগুলো দেখিয়ে দেয়, কীভাবে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলারা ইচ্ছাকৃতভাবে অতিমূল্য ও অপ্রয়োজনীয় চুক্তির মাধ্যমে বিপুল অতিরিক্ত মুনাফা তৈরি করেছেন এবং পরে তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন।”
তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে বা নীরব থেকেছে। আদানি পাওয়ারের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, কমিটির পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি এবং প্রতিবেদন প্রকাশের আগেও তারা এটি দেখতে পাননি। তার ভাষায়, আদানি পাওয়ার বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানের বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে এবং অনুরূপ আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর তুলনায় তাদের দাম প্রতিযোগিতামূলক। তিনি আরও বলেন, বড় অঙ্কের বকেয়া পাওনা থাকা সত্ত্বেও তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেনি, যখন অন্য অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল।
সামিট গ্রুপ অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড গত বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয়ের দিক থেকে তৃতীয় সর্বনিম্ন হিসেবে র্যাংক করেছিল। তারা আরও উল্লেখ করেছে, এই প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অংশীদার ও ঋণদাতারা যুক্ত, যাদের কঠোর যাচাই ও শাসন কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে এস আলম গ্রুপ, রিলায়েন্স পাওয়ার ও জেরা তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
এই বিতর্কের মাঝেই উঠে এসেছে বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সংকট—অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭.৭ থেকে ৯.৫ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এর বড় অংশই ‘টেক-অর-পে’ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত, যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও সরকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ২০০৯ সালের পর থেকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত ব্যবহার রয়ে গেছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, যে বিদ্যুতের জন্য টাকা দেওয়া হচ্ছে, তার বড় অংশই ব্যবহার হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রীয় একমাত্র বিদ্যুৎ ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর। বিপিডিবির বার্ষিক ক্ষতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, আর সরকারি ভর্তুকি প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই ভর্তুকির অর্থ আসছে সাধারণ মানুষের কর ও রাষ্ট্রীয় ঋণ থেকে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যদি চুক্তিভিত্তিক দাম কমানো না হয়, তাহলে শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের শিল্পখাতকে শিল্পহীনতার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীরভাবে রাজনৈতিকও। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যেখানে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। বিদ্যুতের দাম ও সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও এই খাতকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। ফলে নতুন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের ওপর দুর্নীতিপূর্ণ ও অতিমূল্য বিদ্যুৎ চুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ থাকবে। ইতোমধ্যে নির্বাচনে এগিয়ে থাকা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি ও শাসনব্যর্থতা নিয়ে জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক, তারা এই বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো নিয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেবে। তবে প্রতিবেদনে একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, চুক্তি পুনঃআলোচনার চেষ্টা আন্তর্জাতিক সালিশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল বা পরিবর্তন করা সহজ নয় এবং এর আইনি ও কূটনৈতিক প্রভাবও থাকতে পারে। তবুও কমিটির মত হলো, কিছু না করলে যে আর্থিক ও সামাজিক খরচ হবে, তা আইনি ঝুঁকির চেয়েও অনেক বেশি।
সব মিলিয়ে এই পর্যালোচনা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি নির্মম বাস্তবতা সামনে এনেছে। উন্নয়নের নামে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বড় অংশই আজ দেশের অর্থনীতি ও জনগণের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল অতীতের ভুলের হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশও। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে কি এই চক্র ভাঙা যাবে, নাকি বিদ্যুৎ খাত আরও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা ও লুটপাটের এক নিরাপদ ক্ষেত্র হয়েই থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ