
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আবারও বড় ধরনের আর্থিক ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রকাশ পেয়েছে যে দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া জমে আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নতুন নেতৃত্ব এই পরিস্থিতিকে কার্যত ‘দেউলিয়া অবস্থা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। সামনে রমজান, এরপর সেচ মৌসুম এবং তীব্র গ্রীষ্ম—সব মিলিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ আশঙ্কা করছে, গরম বাড়লে এ বছরের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কাগজে-কলমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতা আছে, কিন্তু বাস্তব সংকট জ্বালানি ও অর্থায়নে—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনমতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না।
নতুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল বলে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, বিদ্যুৎ খাত আর্থিকভাবে প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় আছে। বিপুল বকেয়া, জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন এবং সীমিত অর্থ—সব মিলিয়ে এখন সরকারকে অনেকটা ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ করতে হচ্ছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়েই আপাতত চাহিদা পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছেই প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান গত সাত থেকে আট মাস ধরে কোনো বিল পায়নি বলে অভিযোগ করেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি ও আয়ের ঘাটতির কারণে ধাপে ধাপে এই বকেয়া জমেছে।
বেসরকারি উৎপাদনকারীরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে গরমের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো নিজেরাই জ্বালানি আমদানি করে, যার জন্য এলসি খোলার পর তেল দেশে পৌঁছাতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। ইতোমধ্যে তেলের নিট মজুদ কমে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠন। জানুয়ারিতে যেখানে মজুদ ছিল এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তা নেমে এসেছে প্রায় ৮০ হাজার টনে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সরকার প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করতে পারবে কি না। কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ নির্ভর করে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর। মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশই গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে, আর কয়লা ও তেল প্রায় পুরোপুরিই বিদেশ থেকে আনতে হয়।
বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি সব জ্বালানি আমদানি করতে হয়, তাহলে বছরে ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ পুরো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাস্তবতা বিবেচনায় এই পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা কঠিন বলেই তিনি মনে করেন। ফলে সরকারকে কঠিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে—বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াবে, নাকি ডলার সাশ্রয় করবে।
বাংলাদেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৩ শতাংশ এই খাত থেকে আসে, যার মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় ৫৬৩৭ মেগাওয়াট। বেসরকারি খাতে এর বড় অংশ। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্র কমালে বিপুল ভর্তুকি সাশ্রয় সম্ভব। তাদের মতে, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালালে অনেক ঘাটতি পূরণ করা যেত।
তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি এত সহজ নয়। ড. ইজাজ হোসেনের মতে, তেলভিত্তিক কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ করা এখনই সম্ভব নয়। কারণ বিদ্যুতের চাহিদা যখন হঠাৎ বেড়ে যায়—বিশেষ করে পিক আওয়ারে—তখন দ্রুত চালু করা যায় এমন কেন্দ্র হিসেবে তেলভিত্তিক প্ল্যান্ট প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানি দরকার হয়।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির বোঝাও ক্রমেই বড় হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পেছনে সরকারকে গড়ে সাড়ে চার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। ফলে এই খাত দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে হলে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া উপায় নেই।
নতুন সরকার আপাতত স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাপনার দিকেই জোর দিচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী জানিয়েছেন, রমজান ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা এখন প্রধান অগ্রাধিকার। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো স্ট্যান্ডবাই রাখা হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে চালানো হবে। পাশাপাশি কয়লা, এলএনজি ও এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ধাপে ধাপে বকেয়া পরিশোধের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারভিত্তিক সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম পুরো সংকটের জন্য বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। তার মতে, সৎভাবে পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সময়মতো বিল পেলে সংকট এত তীব্র হতো না। তিনি মনে করেন, তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্রগুলো বন্ধ করলে বছরে ২৮ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে, যা দিয়ে কয়লা আমদানি করে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
তবে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন একাধিক চাপের মধ্যে রয়েছে। একদিকে বিপুল বকেয়া, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির উচ্চ খরচ, তার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধির চাপ। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া না গেলে গ্রীষ্মে লোডশেডিং বেড়ে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বহুমাত্রিক কৌশল প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করা, জ্বালানি মিশ্রণ পুনর্বিন্যাস, আমদানিনির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করার কথা বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে চুক্তি ও ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সক্ষমতা বাড়ানোর যুগ অনেকটাই পেরিয়ে গেছে; এখন মূল চ্যালেঞ্জ দক্ষ ব্যবস্থাপনা, টেকসই অর্থায়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নতুন সরকার কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে এই জটিল সমীকরণ সামাল দিতে পারে—সেটির ওপরই নির্ভর করছে সামনে গ্রীষ্মে দেশের মানুষ কতটা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবে।
আপনার মতামত জানানঃ