কাশ্মীরের শ্রীনগরের একটি মসজিদের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মোহাম্মদ নওয়াজ খানের জীবনে অস্বস্তি নেমে আসে। আগে বিষয়টি তিনি কখনো এভাবে ভাবেননি। মসজিদ তো ইবাদতের জায়গা, ধর্মীয় সেবার একটি দায়িত্ব—এর সঙ্গে ভয় বা ঝুঁকি জড়িত থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা তাঁকে ভিন্ন কিছু শেখাচ্ছে। তাঁর বাবা সানাউল্লাহ খান অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন। অবসরের পর তিনিও একসময় একটি মসজিদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই পরিবারে উদ্বেগ ঢুকে পড়ে। এখন নওয়াজ একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে পুলিশি নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ আর অজানা আশঙ্কা।
চলতি মাসের শুরুতে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের পক্ষ থেকে মসজিদসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে চার পাতার একটি ফরম পৌঁছে দেওয়া হয়। ফরমটির শিরোনাম—‘মসজিদের প্রোফাইলিং’। নামটি যতটা নিরপেক্ষ শোনায়, বিষয়বস্তু ততটাই আতঙ্কের। প্রথম পাতায় চাওয়া হয়েছে মসজিদের যাবতীয় তথ্য—মসজিদের মতাদর্শিক ধারা, কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অর্থায়নের উৎস কোথা থেকে আসে, মাসিক ব্যয় কত, একসঙ্গে কতজন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, এমনকি যে জমির ওপর মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে, তার মালিকানার বিস্তারিত তথ্যও। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। বাকি তিন পাতাজুড়ে রয়েছে মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি।
ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর, ব্যাংক হিসাব, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য—সবই চাওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁদের কোনো আত্মীয় বিদেশে থাকেন কি না, তাঁরা কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, কী ধরনের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের আইডি কী—সেটাও ফরমে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। একই ধরনের ফরম পাঠানো হয়েছে মাদ্রাসা পরিচালকদের কাছেও। অনেকের কাছে এটি নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং গভীরভাবে ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রীয় অনুপ্রবেশ।
শ্রীনগরের জওহরনগর এলাকায় একটি মুদিদোকানে বসে নওয়াজ খান বলেন, কাশ্মীরে এখন শান্তিতে থাকার সুযোগ খুব কম। প্রায়ই কোনো না কোনো ফরম পূরণ করতে বলা হয়। কিন্তু এবার যে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তা স্বাভাবিক নয়। তাঁর ভাষায়, পুলিশের এত ব্যক্তিগত তথ্য কেন দরকার—তা তিনি বুঝতে পারছেন না। কাশ্মীরের মতো একটি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের তথ্য সংরক্ষণ তাঁদের পরিবারের জন্য ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে—এই আশঙ্কা তাঁকে তাড়া করছে।
নওয়াজ একা নন। শ্রীনগরের লাল বাজার এলাকার এক মসজিদের ইমাম হাফিজ নাসির মীরও একই রকম দুশ্চিন্তার কথা জানান। তিনি ফরমটি হাতে পেলেও এখনো পূরণ করেননি। তাঁর মতে, যদি এটি কেবল নিয়মিত কাগজপত্রের বিষয় হতো, তাহলে এত গভীর ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হতো না। বিদেশে থাকা আত্মীয়দের তথ্য বা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মতো বিষয়গুলো ধর্মীয় দায়িত্বের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত—তা তাঁর বোধগম্য নয়। সবচেয়ে বড় ভয়, এই তথ্য ভবিষ্যতে কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কাশ্মীরের মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর অনেক বাসিন্দার কাছেই এই উদ্যোগ একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। তাঁদের মতে, এটি কোনো সাধারণ জরিপ নয়; বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল। মসজিদকে কেবল ইবাদতের জায়গা হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য ‘ঝুঁকির কেন্দ্র’ হিসেবে দেখার প্রবণতা এতে ফুটে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে—তাহলে কি কাশ্মীরের মুসল্লিরা অপরাধী? কেন তাঁদের ধর্মীয় চর্চার ওপর এভাবে নজরদারি করা হবে?
কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জোট মুতাহিদা মজলিশ-ই-উলেমা এই প্রোফাইলিং উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মসজিদ হলো পবিত্র স্থান। এখানে ইবাদত ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এর অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিষয়গুলো খুঁটিয়ে দেখার কোনো অধিকার রাষ্ট্রের নেই। তাঁদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নয়; এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
এই ঘটনাগুলোর পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। কাশ্মীর অঞ্চলটি ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগের পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। দুই দেশ এই অঞ্চল নিয়ে একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছে। চীনও কাশ্মীরের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ কাশ্মীরকে দীর্ঘদিন আংশিক স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে সেই অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। অঞ্চলটিকে ভাগ করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করা হয়—জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ।
এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই কাশ্মীরে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শ্রীনগরের ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদ প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। এখনো ঈদের জামাতে বড় জনসমাগমের অনুমতি দেওয়া হয় না। ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ, গণগ্রেপ্তার—এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি। অনেক কাশ্মীরির চোখে এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
ভারত সরকার অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দিচ্ছে। তাদের দাবি, এসব ব্যবস্থা সাময়িক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সীমান্তপাড়ের সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয়। বিজেপির কাশ্মীর শাখার মুখপাত্র আলতাফ ঠাকুর বলেন, অতীতে কিছু মসজিদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য নজরদারি দরকার। তাঁর মতে, এতে সাধারণ মুসল্লিদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন অনেক কাশ্মীরি নেতা ও সাধারণ মানুষ। কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এই উদ্যোগকে বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—সরকার কি মন্দির, গির্জা বা গুরুদুয়ারার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রোফাইলিং করবে? নাকি এটি শুধু মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যই প্রযোজ্য? তাঁর মতে, এভাবে মসজিদগুলোকে অপরাধের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা সামাজিক বিভাজন আরও গভীর করবে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মুসল্লিদের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করছেন না, কারণ কাশ্মীরে প্রতিবাদের পরিণতি কী হতে পারে, তা সবাই জানে। তবু নীরব অসন্তোষ জমছে। অনেক ইমাম ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য মনে করছেন, আজ ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া হচ্ছে, কাল হয়তো খুতবা দেওয়ার আগেও পুলিশের অনুমোদন নিতে বলা হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ধীরে ধীরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তাঁদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
কাশ্মীরে মসজিদের ওপর এই কড়া নজরদারি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিশ্বাস, পরিচয় ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। একটি অঞ্চলের মানুষের কাছে মসজিদ শুধু উপাসনালয় নয়, বরং সামাজিক বন্ধন, আশ্রয় ও আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র। সেখানে রাষ্ট্র যখন তালিকা, ফরম আর নজরদারির মাধ্যমে ঢুকে পড়ে, তখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যেতে সময় লাগে না।
আজ শ্রীনগরের অনেক মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া মানুষ শুধু ইবাদত করেন না, তাঁরা চারপাশে তাকিয়ে দেখেন—কে দেখছে, কে নোট নিচ্ছে, কে প্রশ্ন করতে পারে। এই ভয়ের সংস্কৃতি কোনো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বাড়ায় না; বরং আস্থার জায়গাগুলো আরও ভেঙে দেয়। কাশ্মীরের মানুষ এখন সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই দিন কাটাচ্ছে—যেখানে মসজিদের দরজার ভেতরেও আর পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে
আপনার মতামত জানানঃ