Trial Run

ব্যাপক লুটপাটে নাকাল স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি

সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিডেট পরিচালকের ব্যাপক লুটপাটে এখন নাকাল হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা তছরুপ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের সহযোগিতায় কোম্পানিটির বেসরকারি পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদ ৮১ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন। আর মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের ভাণ্ডারে গেছে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করে এই অর্থ লোপাটের প্রমাণ পেয়েছে। সংস্থাটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে। দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান ও সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী চলতি মাসে তাদের প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেন। এতে মঈন উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে মোহাম্মদ শাহেদ গত ১৮ আগস্ট মারা গেছেন। তাই তার ক্ষেত্রে মামলার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু এই ৮১ কোটি টাকা আত্মসাৎ নয়, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলে আরও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা বিপিসির চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কোম্পানির হিসাবে তারা অনেক গরমিল পাচ্ছেন। টাকা যে আত্মসাৎ হয়েছে, বিষয়টি নিশ্চিত। এর বাইরেও তাদের (মঈন উদ্দিন) কাছে কোম্পানির অনেক পাওনা রয়েছে, যেগুলো আদায় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দুদক অনুসন্ধান করে যে ব্যবস্থা নেবে, সে অনুযায়ীই তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।

স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানিকে লোকসান দেখিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তদন্ত শুরু করে বিপিসি। একই বছরের মার্চে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দুদকের উপ-পরিচালক তালেবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন টিমকে দায়িত্ব দেয় কমিশন। বিপিসি অনুসন্ধানে দুই অর্থবছরে হিসেবে ১৩৮ কোটি টাকা তছরুপের গরমিলের নথিপত্র নিয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে রীতিমতো বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়।

দুদক সূত্র জানায়, মহাব্যবস্থাপক শাহেদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদের লোভে রীতিমতো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠাটিতে লোকসান দেখিয়ে রীতিমতো বড় অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এ চক্র। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ১৩৮ কোটি টাকা লুটের তথ্য প্রমাণ দুদক পেলেও দুদকের সন্দেহ আরও বেশি পরিমাণ অর্থ এ প্রতিষ্ঠান থেকে তছরুপ করেছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, মঈন উদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন সময়ে ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ৪২ কোটি টাকা তুলে নিজের প্রতিষ্ঠান পিরামিড এক্সিম লিমিটেডের চারটি ব্যাংক হিসাবে জমা করেন। ট্যাংকার ও কনটেইনার ওঠানো-নামানোসহ (হ্যান্ডলিং) বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের বিপরীতে তিনি মনগড়া চাহিদাপত্র বা রিকুইজিশন দিতেন। যে নগদ চেকের মাধ্যমে তিনি এই টাকা হাতিয়েছেন, সেগুলোর অধিকাংশেই কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের সই ছিল।

দুদক বলছে, স্থানান্তরিত এই অর্থের প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা দিয়ে মঈন উদ্দিন আহমেদ তিনটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকার লালমাটিয়ায় বাড়ি নির্মাণের জন্য ভূমি ডেভেলপমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ছয় কোটি টাকা, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি টাকা ও ব্র্যান্ডস অনলি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেড় কোটি টাকার মতো দিয়েছেন।

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, মঈন উদ্দিন আহমেদ আরেকটি উপায়ে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সেটি হলো খরচের নাম করে নিজের নামে বা অন্য কর্মচারীদের নামে চেকে অগ্রিম টাকা নেওয়া।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ গুডউইন পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির অংশীদার। এটি চাকরির শৃঙ্খলার পরিপন্থী। শাহেদ বিভিন্ন সময়ে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলের তিনটি ব্যাংক হিসাব থেকে গুডউইনের একটি ব্যাংক হিসাবে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে জমা করেন।

স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেড সরকারি কোম্পানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। বিপিসি এর ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিক। বাকি ৫০ শতাংশ শেয়ার মঈন উদ্দিন ও তার ভাই মিশু মিনহাজের। কোম্পানিটি ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে এটির যৌথ মালিকানা ছিল এশিয়াটিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও যুক্তরাষ্ট্রের ইসো ইস্টার্ন ইনকরপোরেশনের হাতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ইসো ইস্টার্ন এ দেশ ছেড়ে গেলে তাদের হাতে থাকা মালিকানার ৫০ শতাংশ বিপিসির অধীনে দেয় সরকার। এখান থেকে তেল, লুব্রিকেন্ট বিক্রি ছাড়াও গাড়ির ইঞ্জিনের কাজ হয়। প্রতিষ্ঠানটি চলে একটি পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে। সরকার ও কোম্পানির পক্ষ থেকে যৌথভাবে শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেয়া হয়। এরমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে দেখবালের জন্য একজন মহাব্যবস্থাপক নিয়োগ দেয়া হয় মোহাম্মদ শাহেদকে। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতে মঈন উদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব পান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে সরকারের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ সাহেদ মহাব্যবস্থাপক আর কোম্পানির পক্ষ থেকে মঈনউদ্দিন আহমেদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেয়ার পর থেকে তারা দুইজন মিলে কোস্পানির অর্থ তছরুপ শুরু করেন। দুইজন মিলে মাসতুত ভাই হয়ে রীতিমতো বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়ে কোম্পানির অর্থ সরাতে শুরু করেন। তাদের যৌথ দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ডুবতে বসেছে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানি তেল, লুব্রিকেন্ট বিক্রি এবং গাড়ির ইঞ্জিন মেরামত করে যে টাকা পাচ্ছে তার সিংহভাগই চলে গেছে এই দু’জন কর্মকর্তার নিজস্ব একাউন্টে।

এসডব্লিউ/পিএ/কেএইচ/২০৪৫০ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ