Trial Run

এক বছরে নতুন নদী দখলদার বেড়েছে ৫ হাজার ৮৫৯ জন

ছবি: নয়াদিগন্ত

সারাদেশে উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকা সত্বেও গত এক বছরে নতুন নদী দখলদার বেড়েছে ৫ হাজার ৮৫৯ জন।  ২০১৯ সালে নদী দখলদারের মোট সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৩৯০ জন। ২০২০ সালে বেড়ে এ সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৪৯ জন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার(১২জানু) বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানিয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। রাজধানীর পল্টন এলাকায় অবস্থিত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অস্থায়ী কার্যালয়ে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার।

সভায় মুজিবুর রহমান বলেন, ২০১৯ সালের নদী দখলদার ও উচ্ছেদের প্রতিবেদন প্রকাশ করছি। ওই বছর নদীর দখলদার ৫৭ হাজার ৩৯০ নন। এর মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৭৯ জনকে, যা নদী দখলকারীর ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ২০২০ সালের তথ্য এখনো পুরোপুরি সংগ্রহ করা হয়নি। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছি, তাতে সারাদেশের নদী দখলদারের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৪৯ জন। তিনি বলেন, নদী দখলদার চিহ্নিত করার কাজ অব্যাহত থাকবে।

বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোয় নদীর অবৈধ দখলদারের সংখ্যা আট হাজার ৮৯০ জন। এর মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে এক হাজার ৪৫২ জন। এসব জেলায় দখলদারের ৫০ শতাংশ উচ্ছেদ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোয় নদী দখলদার ৪ হাজার ৭০৪ জন। এর মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ২৩০ জন। খুলনা বিভাগে ১১ হাজার ২৪৫জন নদী দখলদার রয়েছেন। এর মধ্যে চার হাজার ৮৯০জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। বরিশাল বিভাগের পাঁচ হাজার ৬১১ জন দখলদারের মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৭৯৩ জনকে। সিলেট বিভাগের দুই হাজার ৪৪ জন নদী দখলদার রয়েছেন। তাদের মধ্যে উচ্ছেদ হয়েছে ৫৭৬ জন। ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোয় চার হাজার ৮৪৮ জন দখলদারের মধ্যে এক হাজার ৭০৭ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রংপুর বিভাগের নদীগুলোতে দুই হাজার ৭৬০ জন দখলদার রয়েছে। এর মধ্যে ৮১৩ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের দুই হাজার ৬৯৩ জন দখলদারের উচ্ছেদ করা হয়েছে ৪১ জনকে।

নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীগুলোর অনেক জায়গায় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলের চিত্র দেখা গেছে। সরকারের নদী রক্ষার চার হাজার কোটি টাকার যে প্রকল্প শুরু হয়েছে, তা বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ সেখানে বিদ্যুৎ ও সোলার প্লান্ট, সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ অনেক শিল্প কারখানা রয়েছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেছে। তবুও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে উচ্ছেদ কার্যক্রমে সরকারি সংস্থাগুলোর কাঙ্খিত সহযোগিতা না করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, প্রতিটি বিভাগেই পেশিশক্তি ও প্রভাব বিস্তার করে নদীর পাড়ে বা মধ্যে বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করেছে। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও ওইসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা যায়নি। এমনকি সরকারি স্থাপনাও সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ এবং লজিস্টিক ও অর্থ সংকটের কারণে নদী দখলদারদের উচ্ছেদ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ২০১৯ সালে উচ্ছেদ অভিযানে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রত্যাশা বা আশানুরূপ ছিল না। তবে আগের তুলনায় অগ্রগতি হয়েছে। উচ্ছেদ কার্যক্রমে অপ্রতুল অর্থায়ন করা হয়েছে। উচ্ছেদের ক্ষেত্রে অর্থায়নে চরম গুরুত্বহীনতা ও অবহেলা লক্ষণীয়।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে শিল্পায়ন হচ্ছে, রপ্তানি বাড়ছে, উন্নয়ন হচ্ছে, বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। তবে নদী না বাঁচলে এইসব উন্নয়ন কাজে আসবে না। তারা মনে করেন, দখলদাররা যা প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি দখল করে নিচ্ছে। নদী রক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা করলে টেকসই হবে। নদী দখলের সাথে প্রভাবশালীরা বেশি জড়িত বলে মনে করেন তারা। তারা বলেন, নদী দখলের সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করলেও বাস্তবে দেখা গেছে নদী দখলের সাথে বড় অংশে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই জড়িত। নদী দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা কমিটির স্বচ্ছতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন। তারা মনে করেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সাথে উচ্ছেদ অভিযানকারীদের আতাতের কারণে উচ্ছেদ অভিযান সুষ্ঠুভাবে সম্ভব হচ্ছে না। দিনদিন নদী দখল বাড়তে থাকায় আশঙ্কা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশ থেকে নদী বিলীন হয়ে যেতে আর বেশিদিন নেই। ইতোমধ্যে ঢাকার নালা খাল বিলের অস্তিত্ব শূন্যে মিলিয়ে গেছে। এবার গলা টিপে ধরেছে নদীর। নদী বিলুপ্ত হয়ে গেলে দেশের অন্যান্য উন্নোয়ন কোনো কাজে আসবে না বলে হতাশা প্রকাশ করেন তারা। তারা মনে করেন, নদী দখলদার উচ্ছেদে কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নদী রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই জীবন রক্ষা পাবে।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৭২২

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares