Trial Run

রংপুরে গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন যারা

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ২০২১

চলতি বছর বাংলাদেশ উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। এ উপলক্ষে আমরা ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করতে চাই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনের কারিগরদের। এ সপ্তাহের আয়োজন উত্তরবঙ্গের শান্তিপ্রিয় জেলা রংপুরের গণহত্যা ও বধ্যভূমি নিয়ে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্বিচারে হত্যা করেছে রংপুরের নিরীহ সাধারণ মানুষকে। তাদের হাত থেকে নারী-শিশু আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কেউই রক্ষা পায়নি। জেলার চিহ্নিত গণহত্যার স্থানগুলোতে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হতো। রংপুর টাউন হলে গড়ে তোলা হয়েছিল অস্থায়ী নির্যাতন কেন্দ্র। এই লেখায় পাক বাহিনীর ভয়াবহ নিপীড়নের কিছু চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে।

দখিগঞ্জ হত্যাকাণ্ড
১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল ছিল শনিবার। রংপুর শহরে তথা জেলায়  ঘটেছিল এক অকল্পনীয় হত্যাযজ্ঞ। ২৫ মার্চের রাতের গোলাগুলির মতোই ৩ এপ্রিল মধ্যরাতে দখিগঞ্জ শ্মশানের কাছে গুলির  শব্দে ঘুম ভাঙে আশপাশের মানুষের। সে সময় পর্যন্ত রংপুরের কেউই কল্পনা করতে পারেনি  পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী  হাত-পা বেঁধে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে নিরীহ বাঙালিদের। হানাদার বাহিনী রংপুরের সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় মানুষ ‘ মাহফুজ হোসেন জররেজ ’সহ  ১১ জন বন্দি নিরীহ বাঙালিকে রংপুর-মাহিগঞ্জ রোডের দখিগঞ্জ শ্মশান এলাকায় চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। গুলিবিদ্ধ মানুষগুলো একজনের ওপর আরেকজন ঢলে পড়ে। নিমিষেই ঝরে যায় তরতাজা প্রাণ।

সেই ধ্বংসযজ্ঞের সময় ভাগ্যক্রমে গুলিবিদ্ধ মানুষের স্তূপ থেকে একজন প্রাণে বেঁচে যান। তিনি তাজহাটের চিকিৎসক দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক। এলাকায় পরিচিতি মন্টু ডাক্তার নামে। তিনি গুলিবর্ষণের সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে পড়ে যান এবং তার শরীরের ওপর অন্যরা পড়েছিল বলে তার পায়ে কেবল গুলি লাগে। পাকিস্তানী সৈন্যরা চলে যাবার পর তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার পর শ্মশান থেকে বেরিয়ে এসে অন্যদের সহযোগিতায় ভারতে চলে যান।

পরদিনই রংপুরের প্রথম দখিগঞ্জ শ্মশানের হত্যাযজ্ঞের ঘটনা রংপুরের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এ খবর মুহূর্তের মধ্যে সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। শত শত মানুষ ছুটে আসে শ্মশানের দিকে নিহতদের এক নজর দেখতে। ঐদিন থেকেই রংপুরের পাকিস্তানিদের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ পালাতে শুরু করে শহর ছেড়ে গ্রামে। গ্রাম ছেড়ে আরো নিরাপদ দূরত্বে সীমান্তের ওপারের দেশ ভারতে।

সে রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে সৈন্যদের হাতে যাঁরা শহীদ হন তাঁরা হলেন এওয়াই এম মাহফুজ আলী (জররেজ)। জররেজ ভাই নামে যাকে সবাই চিনতেন, মোহাম্মদ মহরম, গোপাল চন্দ্র, দুর্গাদাস অধিকারী, উত্তম কুমার অধিকারী, দুলাল মিয়া, রফিক আলী সতীশ হাওলাদার ও আরো দু’জন যাদের নাম পাওয়া যায়নি। আজো কালের সাক্ষী হয়ে আছে রংপুরের দখিগঞ্জ শ্মশান বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা করে ১০ জন নিরীহ বাঙালিকে। আটত্রিশ বছর পরও অবহেলায় পড়ে আছে এটি। এ বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ডিসেম্বর  এলেই ফুল পড়ে শহীদদের স্মরণে। স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না আজো।

বালার খাইল হত্যাযজ্ঞ
উই উইল মেক দিস কান্ট্রি এ ল্যান্ড অব প্রস্টিটিউটস, এ ল্যান্ড অব স্লেভস, এ ল্যান্ড অব বেগারস্।’ এাঁই ছিল তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কর্মকর্তাদের ঘোষণা এবং একমাত্র প্রতিজ্ঞা । এর মধ্যেই আসে ১২ এপ্রিল ১৯৭১। সেদিন ছিল সোমবার। সময় তখন মধ্যরাত। ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণ-পশ্চিমে ‘বালার খাইল’ প্রায় আট কিলোমিটার দূরে। সেখানে মধ্যরাতে এসে দাঁড়াল হানাদার বাহিনীর ৩টি ট্রাক। ট্রাকভর্তি মানুষ। সবারই চোখ আর হাত বাঁধা। জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সব হতভাগ্য মানুষের পরিচয় এক। তাদের একমাত্র পরিচয় তারা বাঙালি।

নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে সেখানকার বেশ কিছু জনপ্রিয় মানুষকে ধরে ট্রাক তিনটিতে করে এনেছিল ঘাতকরা। আশপাশের আতঙ্কিত মানুষের ঘুম ভেঙে গেল সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর বুটের শব্দ আর অশ্লীল গালিগালাজের শব্দে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘটনা অবলোকন করবে সে সাহস ছিল না তাদের। মৃত্যুভয়ে সকলের দেহ যেন প্রাণহীন। পাকিস্তানিরা তাদের যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র কার্যকর করার জন্য অসহায় বন্দি ৩ ট্রাক মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করল। বালার খাইল বধ্যভূমি এলাকায় নৃশংস এ গণহত্যা থেকে প্রাণে বেঁচে যান ২ সহোদর। একজন কমলা প্রসাদ। অন্যজন তার ছোট ভাই। কমলা প্রসাদ বর্তমানে সৈয়দপুরে আছেন। 

 ১২ এপ্রিল যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দপুর থেকে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সেখানকার বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং আওয়ামী লীগ নেতা সর্বজনপ্রিয় ডা. জিকরুল হক। ২৫ মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. জিকরুল হক, ডা. ইয়াকুব আলী, ডা. শামসুল হক, ডা. বদিউজ্জামান, আবেদ আলী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তুলশীরাম আগরওয়ালা, যমুনা প্রসাদ কেডিয়া, হরিহর প্রসাদ, রামেশ্বর পালসহ প্রথম অবস্থায় ২৫ জনকে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখে। পরবর্তীকালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় ৬০ জন সদস্যকে বন্দি করে হানাদার বাহিনী। ২৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল ১৮ দিন অমানুষিক নির্যাতনের পর রংপুর ক্যান্টনমেন্টের বালার খাইল এলাকায় তাঁদের হত্যা করা হয়। 

বালার খাইল বধ্যভূমি আজো অযত্ন-অবহেলায় রয়েছে। সেখানে শহীদদের স্মরণে আজো গড়ে ওঠেনি স্মৃতিস্তম্ভ। ভুলতে বসেছে নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের কথা। স্থানীয়দের দাবি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের মানুষের ওপর যে গণহত্যা হয়েছে তার স্মারক বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম সেই সময়কে মনে রাখবে, শ্রদ্ধা জানাতে পারবে।

লাহিড়ীরহাট গণহত্যা
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মে মাস। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সদস্যরা তখন বাঙালি হত্যায় মরিয়া হয়ে নেমে পড়েছে। সেদিন ছিল ৭ মে শুক্রবার। জুমার নামাজ শেষ হয়েছে লাহিড়ীরহাট মসজিদে। ঠিক সেই সময়ে হানাদার বাহিনীর ৪টি ট্রাক এসে দাঁড়াল মসজিদের সামনে প্রাণভয়ে মুসল্লিরা ছুটতে থাকলেন। পালানোর সময় ৩২ জন নিরীহ মুসল্লিকে ধরে ফেলল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। পিঠমোড়া করে বেঁধে নিয়ে গেল লাহিড়ীহাট পুকুরপাড়ে। সেখানে সারিবদ্ধভাবে গুলি করে হত্যা  করে তাঁদের। প্রাণদানকারী এসব মানুষের সবার পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

নিজেদের মুসলমান হিসেবে দাবি করা  পাকিস্তানি হানাদারদের এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকা জনমানব শূন্য হয়ে যায়। প্রাণভয়ে পালিয়ে যায় এলাকাবাসী। ৩২ জন মুসল্লির লাশ পড়ে থাকে লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমিতে। সেদিন লাশ দাফন করার মতো এলাকায় ছিল না কোনো মানুষ। মুসল্লিদের লাশের পাশে বসে কোরান তেলাওয়াত করেনি কেউ । কাফন পরানো হয়নি সেই শহীদদের। স্থানীয়রা আজো হা-হুতাশ করে বলে, কেউ জানে না কী অপরাধ ছিল গ্রামের সহজ-সরল এসব  সাধারণ মানুষের? 

ঘাঘটপাড়ের বধ্যভূমি
১৯৭১-এর ১৪ মে শুক্রবার। মধ্যরাতে রংপুর শহরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকা সংলগ্ন নিসবেতগঞ্জের আশপাশ ছিল প্রায় জনমানব শূন্য। দু’একটি  বাড়িতে যাঁরা অবস্থান করছিলেন তাঁরাও প্রাণভয়ে কোনো রকম শব্দ করার সাহস পায়নি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বহনকারী কনভয়ের গোঁ গোঁ শব্দে সচেতন হয়েছিল তাদের অনেকেই। মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর শুরু হলো একটানা গুলিবর্ষণ। প্রায় আধঘণ্টা পর পর থেকে থেকে আবার বিকট শব্দ।  রাতেই একসময়  চলে গেল হায়েনাদের কনভয়।

পরদিন ভোর বেলা সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে এলো আশপাশের গ্রাম থেকে কিছু মানুষ। তারা এসে দেখেছে অত্যন্ত ভয়াবহ চিত্র। একগাদা লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল ঘাঘট নদীরপাড়ে। সেদিন শহীদদের সবার পরনে ছিল খাকি পোশাক। হাত পেছনের দিকে বাঁধা। হতভাগ্যরা সংখ্যায় প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট জন। নিসবেতগঞ্জ এলাকাবাসীর ধারণা, শহীদেরা সবাই ছিল ইপিআর বাহিনীর সদস্য। লাশের তাজা রক্তে লাল হয়েছিল ঘাঘট নদীর পানি। লাশ থেকে নিঃসৃত রক্ত ঘাঘটের পানি তখন লালে লাল হয়ে  যেন রক্তের ঢেউ বয়ে গেছে সেসময় ঘাঘট দিয়ে।

প্রাণভয়ের মাঝেও স্থানীয় দু’চারজন সিদ্ধান্ত নেয় লাশগুলো দাফন করার। পরদিন সকালেই হঠাৎ করে আটটার দিকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেপরোয়াভাবে ছুটে এলো চার-পাঁচটি আর্মি ট্রাক। উদ্ধত সঙ্গিন হাতে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ট্রাকে দাঁড়িয়ে ছিল। আশপাশের মানুষ প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। যে দু’চারজন আশপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাতক সেনারা তাদের  ধমক দেয়।

ভয়ার্ত মানুষের উদ্দেশ্যে সেনারা বলেছিল ‘লাশগুলো যেন সেখানেই পড়ে থাকে। বাঙালিরা মুসলমান নয়। তাদের লাশের দাফন-কাফনের দরকার নেই। শেষ পর্যন্ত কেউ এ লাশগুলো দাফনের ব্যবস্থা করেনি, লাশগুলো পড়েই ছিল ঘাঘটের পাড়ে। আজো এদের পরিচয় জানতে পারেনি এলাকার লোকজন। তবে তাদের ধারণা এরা সবাই ছিল বন্দি ইপিআর বাহিনীর সদস্য। ঠিকঠাক গবেষণা না হওয়ায় অনেকেই জানে না এখানে ১৯৭১ সালে জীবন দিয়েছে ইপিআর বাহিনীর নাম পরিচয় না জানা সদস্যরা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাদের একটাই পরিচয় ছিল তখন,তারা বাঙালি। এটাই ছিল তাদের অপরাধ। 

ঝাড়ুয়ার বিল ও পদ্মপুকুর গণহত্যা
১৭ এপ্রিল ’৭১। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে। স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ শেষে সে স্থানের নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। মুজিবনগরকে অস্থায়ী সরকারের রাজধানী ঘোষণা করা হয়। দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক আগ্রহভরে দেখছেন বাংলাদেশের পত্ পত্ করে ওড়ানো পতাকা। সবুজের ওপর বাংলাদেশের মানচিত্র সংবলিত পতাকা যখন মুজিবনগরে উড়ছে ঠিক সে দিনই রংপুর জেলার বদরগঞ্জ থানার ৮ নং রামনাথপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ সবুজভূমি হাজারো বাঙালির রক্তে লাল লাল হয়ে যায়।

পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সেদিন বদরগঞ্জ রেলস্টেশনের পশ্চিমে ১ কিলোমিটার দূরে বৈরাগীর ঘুমটির কাছ থেকে দক্ষিণ বুজরুক হাজীপুর পর্যন্ত এলাকা ঘিরে ফেলে। অপরদিকে খোলাহাটি স্টেশনের পূর্বদিকে ট্যাক্সের হাটের ঘুমটির কাছে দক্ষিণে করতোয়া নদীর গা ঘেঁষে বকশীগঞ্জ স্কুল পর্যন্ত অর্ধবৃত্তাকারে ঘেরাও করে বুজরুক হাজীপুর, খালিশা হাজীপুর, ঘাটাবিল, রামকৃষ্ণপুর, বাঁশবাড়ি, বানিয়াপাড়া, খোর্দ্দবাগবাড়, মাসানডোবাসহ আরো অন্যান্য এলাকার গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়।

পাকিস্তানিরা সেদিন একইসঙ্গে চালায় গণহত্যা। ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে নবতিপর মানুষ রেহাই পায়নি পাকিস্তানিদের হাত থেকে। সেদিনের গণহত্যায় নেতৃত্ব দেয় পার্বতীপুরের বাচ্চু খান এবং কামরুজ্জামান। স্বাধীনতার পর এরা দু’জনই পালিয়ে যায় পাকিস্তানে। বেলা ২টা থেকে রামনাথপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে ধরে নিয়ে আসে ঝাড়ুয়ার বিল এবং পদ্মপুকুর এলাকায়। সেখানে গুলি করে হত্যা করে প্রায় দেড় সহস্রাধিক মানুষকে। বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত চলে এ হত্যাকাণ্ড।

দমদমা ব্রিজ গণহত্যা
১৯৭১ সালের ৩০ মে মধ্যরাত। কারমাইকেল কলেজ চত্বরে আকস্মিকভাবে ঢুকে পড়েছিল হায়েনাদের বাহিনীর সাঁজোয়া যান। তারা আলবদর বাহিনীর সহায়তায় সেখানে খুঁজতে থাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকদের। সেনারা ছুটতে থাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকদের বাসায়। যেখানে পরিবার পরিজন নিয়ে শিক্ষকরা থাকেন। গাড়ির শব্দে সবাই ভয়ে জড়োসড়ো ভীতসন্ত্রস্ত। আশপাশে কোথাও টু শব্দটি পর্যন্ত নেই।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গাড়ি থেকে নেমে ক’জন মুখোশধারী অবাঙালি দখলদার বাহিনীকে চিনিয়ে দিয়েছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যাপকরা কে কোন বাড়িতে থাকেন। পাকিস্তানি হানাদাররা এক এক করে গাড়ির কাছে ধরে নিয়ে এলো কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক সুনীল বরণ চক্রবর্তী, অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী, অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন রায় এবং অধ্যাপক কালাচাঁদ রায়কে। শুরু করল রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেধড়ক মারপিট।

অধ্যাপক কালাচাঁদ রায়ের পত্নী মঞ্জুশ্রী রায় সে সময় তার স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে এলে ঘাতকের দল তাকেও রেহাই দেয়নি। পাকিস্তানিরা মারপিট করতে করতে গাড়িতে তুলে নিল সবাইকে। সবার বাড়িতে তখন মরাকান্না শুরু হয়ে গেছে। দখলদার বাহিনীর গাড়ি কারমাইকেল কলেজ থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেল দমদমা ব্রিজের কাছে। সেখানে গুলি করে হত্যা করল সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের।

পরদিন সকালবেলা আশপাশের মানুষ শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের লাশ দেখে হতবাক। দেশের শিক্ষিত স্বজন কোনো বাঙালিকে রেহাই দেবে না হানাদার বাহিনী সবাই বুঝতে পারল এ সত্যটা। ততদিনে মানুষ হত্যার নেশায় উন্মাদ হয়ে গেছে হায়েনারা। কারমাইকেল কলেজের শিক্ষকদের পর একই স্থানে ১৯৭১ সালের ৭ জুন মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৩ ট্রাক সাধারণ মানুষকে দমদমা ব্রিজের দক্ষিণ পাড়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

জয়রাম আনোয়ার মৌজায় গণহত্যা
২২ এপ্রিল ১৯৭১, বৃহস্পতিবার। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী রংপুর জেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল ২৬ জন নিরীহ মানুষকে। মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার কল্যাণে এক নামে সারাদেশের মানুষ চেনে পায়রাবন্দকে। বাংলার নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্দ ইউনিয়নের জয়রাম আনোয়ার মৌজায় দু’টি স্থানে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।

১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর  ৫টি ট্রাক এসে দাঁড়ায় রংপুর ঢাকা মহাসড়কের ওপর। আশপাশে তেমন বসতি ছিল না তখন। গভীর রাত, চারদিকে সুনসান। মহাসড়কের পূর্ব দিকে দূরে ৩ থেকে ৪টি ছোট ছোট কুঁড়েঘর ছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়ির শব্দে বাড়ির লোকজন জেগে উঠলেও কারো মুখে কোনো কথা ছিল না সেদিন। সবার যেন দেহ আছে। তবুও মন নেই। হঠাৎ একটানা গুলির শব্দ। গুলি চলছে তো চলছেই।

প্রায় আধাঘণ্টা ধরে গুলির শব্দ শুনেছিল এলাকার মানুষ। তারপর সব চুপচাপ। কোন সাড়া শব্দ নেই। পনেরো মিনিট পরে বিকট শব্দে ট্রাকগুলো চলে যায় রংপুর শহর অভিমুখে। পরদিন ভোরে আশপাশের গ্রামের লোকজন এসে দেখে মহাসড়কের পূর্বদিকে পড়ে আছে লাশের সারি। লোকজন ভয়ে ভয়ে ১১টি লাশ এখানেই কবর দেয়। রাস্তার পশ্চিম দিকে ছিল আরো এক গাদা লাশ। সেখানে গ্রামবাসী পায় ১৫টি লাশ।

সব লাশেরই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। পরনে ছিল শার্ট-প্যান্ট। গ্রামবাসীরা জানে না এরা কোথাকার মানুষ। কী তাদের পেশা, কী বা পরিচয়। সবাই ভয়ে ভয়ে থেকে কোনো ধর্মীয় নিয়মকানুন না মেনে মাটিতে গর্ত করে গণহারে মাটি চাপা দিয়ে রাখে লাশগুলো। চারদিকে পাহারা দিয়ে থাকে গ্রামবাসী কখন স্বাধীনতাবিরোধী লোকজন এসে পড়ে কিংবা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর লোকজন চলে আসে।

প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে লাশগুলোকে সামলাতে। সেদিন যারা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল তাদের সবারই একমাত্র পরিচয় ছিল তারা বাঙালি। রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বিলাসবহুল যানবাহন ছুটে চলে যাত্রী নিয়ে। চোখের পলকে হয়ত যাত্রীদের নজরে পড়ে পায়রাবন্দের নামফলক। এ পায়রাবন্দের মাটিতেই শায়িত আছেন স্বাধীনতার জন্য প্রাণদানকারী ২৬ জন বাঙালি। 

সাহেবগঞ্জের গণহত্যা
পহেলা মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস । এ দিনেও পাকিস্তান হানাদার বাহিনী তাদের নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে পিছপা হয়নি। রংপুর জেলার সদরের সাহেবগঞ্জে মধ্যরাতে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ স্বাধীনতাকামী ১৯ জন বাঙালি সৈনিককে। রংপুর শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে তপোধন ইউনিয়নের মধ্যে সাহেবগঞ্জ এলাকাটি। মৌজার নাম বীরচরণ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ১৯৭১ সালের পহেলা মে শনিবার ঠিক দুপুর বেলা ৩টা আর্মি ট্রাক সাহেবগঞ্জ এলাকায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর রংপুর শহরের দিকে চলে যায়। মধ্যরাতে হঠাৎ করে একটানা গুলির শব্দে জেগে ওঠে আশপাশের মানুষ। প্রাণভয়ে ঝাড় জঙ্গলে যে যেখানে পায় লুকিয়ে থাকে সেই রাতে। সবার মনে এক ধারণা আজ বুঝি আর রক্ষা নেই।

গুলি শেষ হবার প্রায় ১ ঘণ্টা পর চার পাঁচটি আর্মির গাড়ি চারদিকে সার্চ লাইটের আলো জ্বেলে নিরীক্ষণ করে চলে যায় শহরের দিকে। আশপাশের মানুষের দুঃখের রাত যেন শেষ হতে চায় না। ফজরের আজান সেদিন হয়েছিল কিনা সঠিকভাবে এলাকাবাসী কেউ স্মরণ করতে পারে না। বেলা ওঠার আগেই ক’জন সাহসী মানুষ একপা-দু’পা করে এগুতে থাকে সাহেবগঞ্জ হাটের দিকে। খুঁজে পায় না কিছুই। অবশেষে আরো এগুতে থাকে উত্তর দিকে। হঠাৎ নজরে আসে পাকা সড়কের দক্ষিণ দিকে মাটি কাটা ফুটে (গর্তে) পড়ে আছে একগাদা রক্তে ভেজা লাশ। লাশগুলো সামান্য মাটি চাপা দেয়া।

একজন দু’জন করে একত্রিত হলেন অনেকেই সাহস করে লাশের ওপর দেয়া মাটি সরালেন তারা। আঁতকে উঠলেন সবাই লাশগুলো দেখে। সব লাশই ছিল পিছনের দিকে হাত বাঁধা এবং একই রশি দিয়ে পেঁচানো ছিল লাশগুলো। সবার পরনেই সেনাবাহিনীর পোশাক। জমাটবাঁধা রক্তে পড়ে থাকা লাশগুলো যতদূর সম্ভব পরিষ্কার করলেন এলাকাবাসী। কিন্তু কাফন পরানো সম্ভব হলো না। আশপাশের সবাই মিলে জানাজা পড়লেন। সেদিন জানাজায় ইমামতি করলেন তকেয়ারপাড় এলাকার ছবিল উদ্দিন মুন্সী (প্রয়াত)।

মুন্সী সাহেব ছিলেন ভয়হীন। তাঁর ছেলে আব্দুর রাজ্জাক যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। এ ছাড়াও গ্রামবাসীদের নির্ভয় হবার কারণ হলো রংপুর জেলায় একমাত্র পুরো তপোধন ইউনিয়ন ছিল তখন রাজাকারমুক্ত। এলাকার বহু ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এমনকি সে এলাকার একজন ভিক্ষুকের ছেলেও যোগ  দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। জীবনের ঝুঁকি নিতে ভয় পেল না গ্রামবাসী। জানাজা শেষে ১৯ জন বীর বাঙালি সৈনিককে কবর দিলেন একই সঙ্গে। এসব আত্মদানকারী বাঙালি সৈনিকদের সবার পরিচয় জানা যায়নি।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে রংপুরবাসীর আহবান, ইতিহাস-ঐতিহ্যের এসব ধারককে সুরক্ষিত রাখা ও গণহত্যার শিকার এসব মানুষের পরিচয় উদঘাটন করা উচিত। শহীদ পরিবারের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়াও রাষ্ট্রের একান্ত কর্তব্য।

এসডাব্লিউ/পলাশ/আরা/২১৫০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 43
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    43
    Shares