Trial Run

নারীর কাজী হতে না পারা বিষয়ে ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ

ছবি : সংগৃহীত

গতকাল রবিবার(১০জানু) বাংলাদেশের সামাজিক ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) হতে পারবেন না মর্মে হাইকোর্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মাসিকের কারণে একজন নারী প্রাকৃতিকভাবে প্রত্যেক মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ধর্মীয় আচারাদি পালন করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে মুসলিম বিবাহ হচ্ছে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং আমাদের দেশে বেশিরভাগ বিয়ে পড়ানো হয়ে থাকে মসজিদে। ওই সময়ে নারীরা মসজিদে প্রবেশ করতে পারেন না এবং তারা নামাজও পড়তে পারেন না। সুতরাং বিয়ে যেহেতু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সেহেতু এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নারীদের দিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। এই পর্যবেক্ষণ দিয়ে হাইকোর্ট এ সংক্রান্ত রিট মামলার ওপর জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) হতে পারবেন না।

আদালতের দেওয়া এই রায়ে মর্মাহত এবং সংক্ষুব্ধ হয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ। আজ সোমবার ২১ জন নাগরিকের পক্ষে নাসির উদ্দীন ইউসুফের পাঠানো এক বার্তায় তাদের সংক্ষুব্ধতার কথা জানানো হয়েছে। সংক্ষুব্ধ অন্যরা হলেন- আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, অনুপম সেন, শামসুজ্জামান খান, ফেরদৌসী মজুমদার, সারওয়ার আলী, আবদুস সেলিম, সেলিনা হোসেন, মামুনুর রশীদ, মফিদুল হক, মুনতাসীর মামুন, শফি আহমেদ, শাহরিয়ার কবীর, সারা যাকের, লাকী ইনাম, গোলাম কুদ্দুছ, শিমূল ইউসুফ, মোহাম্মদ সামাদ, হাসান আরিফ, আহকামউল্লাহ।

এতে বলা হয়, নারীর শরীর প্রাকৃতিক নিয়মে মাসে একবার নির্দিষ্ট সময়ে ঋতুমতি হয়, এটি প্রকৃতির নিয়মে সংঘটিত একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। নারীর ঋতুমতি হওয়া যদি বন্ধ হয়ে যায় তবে মানুষের জন্ম হবে না এবং মানব জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এই ঋতুমতির নির্দিষ্ট সময়ে নারী, গৃহ ও বাইরের সকল কাজ সম্পাদন করে থাকে। পারিবারিক, সামাজিক, দাপ্তরিক, রাষ্ট্রীয় এবং উৎপাদন পদ্ধতিতে সর্বাংশে অংশগ্রহণ ও সকল দায়িত্ব সুচারু রূপে পালন করে থাকেন।

নিকাহ বা বিয়ে নিশ্চয়ই মসজিদেই হতে হবে এটা ইসলাম ধর্মে বাধ্যতামূলক নয়। সিংহভাগ বিয়ে বাসায়, বিয়ে-অনুষ্ঠানস্থলে ও কাজী অফিসে সম্পন্ন হয়ে থাকে। অতএব মসজিদে নির্দিষ্ট সময়ে নারীদের প্রবেশাধিকারে নিয়ন্ত্রিত কারণে প্রদত্ত রায় কার্যত নারী অধিকারকে সংকুচিত করেছে। বার্তায় তারা বিজ্ঞ উচ্চ আদালতকে এ রায় পুনর্বিবেচনা করে সংবিধান প্রদত্ত নারী-পুরুষ সম অধিকারের ভিত্তিতে রায় প্রদানের অনুরোধ জানান।

এদিকে ‘নারী কাজী হতে পারবেন না’ মর্মে আদালতের দেওয়া রায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও অনেকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অনেকেই আদালতের দেওয়া এই নির্দেশনাকে নারীর প্রতি রাষ্ট্রের সংকুচিত দৃষ্টি মনে করেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, নারীরা বিমানের পাইলট, সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করছেন- তাহলে কেন নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না? এমনো প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কেউ কেউ বলছেন, নারীরা ঋতুমতির নির্দিষ্ট সময়ে পরিবার থেকে রাষ্ট্রের সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে থাকেন, সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনো সমস্যা হচ্ছে না, নারীরা বিয়ে পড়ালেও তেমনি সমস্যা থাকার কথা নয়। কেননা, বিয়ে রেজিস্টার করা রাষ্ট্রের কাজ, কোনো ধর্মের কাজ নয়। এবিষয়ে আইনজ্ঞ হাসনাত কাউয়ূমের বয়ান উল্লেখ্যযোগ্য। তিনি জানিয়েছেন,  বিয়ে এবং রেজিষ্ট্রেশন ভিন্ন। মুসলমানদের বিয়ে হয় মুসলিম আইনে আর মুসলিম আইন অনুযায়ী বিয়ে একটি চুক্তি। রেজিস্ট্রেশন হয় রাষ্ট্রীয় আইনে। এই আইনের বয়স অল্প।

বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন না হলে ধর্মমতে সে বিয়ে অবৈধ হবে না । বিবাহ এবং তালাক  রেজিষ্ট্রেশন আইন হওয়ার আগে আমাদের বাপ-দাদারা বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন করেনি, করার বিধি-বিধানও ছিলো না, তাতে আমরা তাদের অবৈধ উত্তরাধিকারী নই।

রেজিষ্ট্রেশনের দায়িত্ব পালন করার জন্য মসজিদে যাওয়া আবশ্যক নয়, এমন কি বিয়ে করার জন্যও নয়।

রেজিষ্ট্রেশনের কাজ একটি রাষ্ট্রীয় আইনি দায়িত্ব। এ দায়িত্ব মুসলিম মহিলা কেন, যে কোন ধর্মের যোগ্য নারী -পুরষেরই করতে পারার অধিকার থাকার কথা।

২০১৪ সালে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়িয়ার পৌরসভার তিনটি ওয়ার্ডের নিকাহ্ রেজিস্ট্রার হিসেবে তিনজন মহিলার নাম প্রস্তাব করেছিল এক উপদেষ্টা কমিটি। সেই প্যানেলের প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ই জুন আইন মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’ এমন মত দিয়ে একটি চিঠি দিয়ে ঐ প্যানেল বাতিল করে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ঐ চিঠিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন নিকাহ্ রেজিস্ট্রার প্যানেলের একজন সদস্য আয়েশা সিদ্দিকা। এরপর রিটের শুনানি আমলে নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের চিঠি কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এর পর শুনানি শেষে এই রুলটি খারিজ করে রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই রায়ের ফলে নারীরা বাংলাদেশে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না – আইন মন্ত্রণালয়ের সেই সিদ্ধান্তটিই বহাল থাকলো।

এসডাব্লিউ/এমএন/কেএইচ/২১২০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares