বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা, নেতৃত্ব, নির্বাচন ও সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে পরিচালিত হয়, তাদের বিপুল সাংগঠনিক ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসে এবং সেই অর্থের হিসাব কতটা স্বচ্ছ—এসব প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় আসে। একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কার্যালয় পরিচালনা, কর্মীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম, সভা-সমাবেশ, প্রচার-প্রচারণা এবং নির্বাচনি প্রস্তুতি—সবকিছুতেই বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। অথচ দলগুলোর প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের বড় ব্যবধান রয়েছে। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা এই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে: রাজনৈতিক দলগুলোর এত টাকা আসে কোথা থেকে?
টিআইবির ১ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন, আর্থিক জবাবদিহি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত এবং পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। ৩২টি দল গবেষকদের তথ্য দিয়েছে। গবেষণার মূল সময়সীমা ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রতিবেদনটি কেবল দলগুলোর অর্থের হিসাব নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ব্যয়ের হিসাব। টিআইবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে ন্যূনতম ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় এবং কার্যক্রম পরিচালনা করতে একটি রাজনৈতিক দলের বছরে প্রায় ১৪ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে, কোনো দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হলে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫৩২ কোটি থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা পর্যন্ত।
এই হিসাবগুলো প্রাক্কলিত; কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রকৃত আয় বা ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব নয়। তবে এগুলো রাজনৈতিক দল পরিচালনার অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। বিশেষ করে যখন সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয়ের সঙ্গে এই ব্যয়ের তুলনা করা হয়, তখন অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনায় সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় প্রায় ১১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে সদস্য চাঁদা দিয়ে পুরো অর্থের সংস্থান সম্ভব নয়। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কাঠামোর ক্ষেত্রেও ব্যয়ের তুলনায় সদস্য চাঁদার সম্ভাব্য আয় অনেক কম।
এখানেই রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। সদস্যদের চাঁদা ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলো অনুদান, ব্যক্তিগত সহায়তা, বিভিন্ন তহবিল, নির্বাচনি অনুদান কিংবা অন্য বৈধ উৎস থেকে অর্থ পেতে পারে। কিন্তু এসব অর্থের উৎস, পরিমাণ, গ্রহণের নিয়ম এবং ব্যয়ের খাত যদি স্পষ্টভাবে প্রকাশ না করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের পক্ষে অর্থের প্রকৃত প্রবাহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে। তাই তাদের অর্থায়নের বিষয়টি কেবল দলীয় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থ, রাজনৈতিক সমতা এবং জবাবদিহির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা এবং অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্য দলগুলোকে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। অর্থাৎ সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে দলগুলো প্রভাবশালী অর্থদাতা ও ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে। এই নির্ভরতার ফলে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব নির্বাচন কিংবা নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে গবেষণার এই পর্যবেক্ষণকে সব দল বা সব অর্থদাতার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং এটি রাজনৈতিক অর্থায়নের কাঠামোগত ঝুঁকি সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা।
একটি রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন যদি স্বচ্ছ নিয়মের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক দল তখন সদস্য, কর্মী ও সাধারণ সমর্থকদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার বদলে অর্থদাতাদের প্রভাবের মুখোমুখি হতে পারে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের মাত্রা বাড়লে নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের স্বার্থ কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এ কারণে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা কেবল হিসাব প্রকাশের বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের মানের সঙ্গেও যুক্ত।
গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও বেশ কিছু দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। কোনো কোনো দলের আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালি বিধি নেই। অনেক দলের গঠনতন্ত্রে সদস্যদের পদভেদে চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, মনোনয়ন ফরমের ফি, হিসাব সংরক্ষণ, আর্থিক লেনদেন, ক্রয়প্রক্রিয়া, নিরীক্ষা এবং আর্থিক জবাবদিহির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। দলগুলো নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে কি না, প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করে এবং সেই হিসাব কতটা স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা হয়—এসব বিষয়েও ঘাটতি চিহ্নিত করেছে গবেষণাটি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেওয়া বার্ষিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না। ফলে একটি দলের প্রকৃত আয় কত, কোন উৎস থেকে অর্থ এসেছে, কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট অনুদানের বিপরীতে কী ধরনের শর্ত ছিল—এসব তথ্য জানার সুযোগ সীমিত থাকে। নির্বাচন কমিশনে হিসাব জমা দেওয়া এবং সেই হিসাব জনসাধারণের জন্য সহজে উন্মুক্ত রাখা এক বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন জমা দিলেই যথেষ্ট নয়; তথ্য এমনভাবে প্রকাশ করতে হবে, যাতে নাগরিক, গণমাধ্যম ও গবেষকেরা তা যাচাই করতে পারেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চিত্রও গবেষণায় আলোচনায় এসেছে। একটি দলের নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচিত হয়, দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কারা নেন এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামত কতটা গুরুত্ব পায়—এসব বিষয় দলীয় গণতন্ত্রের মৌলিক সূচক। টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ দল জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলীয় প্রধান নির্বাচন করলেও গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটে নির্বাচন করে। দলীয় প্রধান পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার চর্চাও সীমিত। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি দলে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১০টি রাজনৈতিক দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে। ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, তার নির্দিষ্ট সীমা নেই। ১৬টি দলের জাতীয় কাউন্সিল অনিয়মিত বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য দলীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে দীর্ঘদিন নেতৃত্বে থাকা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়; মূল প্রশ্ন হলো, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া কতটা প্রতিযোগিতামূলক, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও অর্থ ও প্রভাবের ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত সুস্পষ্ট নয়। কয়েকটি দলের গঠনতন্ত্রে জনপ্রিয়তা, সততা এবং দলের প্রতি আনুগত্যের মতো বিষয় উল্লেখ থাকলেও সেগুলোর পরিমাপ বা মূল্যায়নের নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই। টিআইবির গবেষণায় প্রভাবশালী দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে অর্থ-প্রতিপত্তি ও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনটি প্রভাবশালী দলে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো গবেষণায় উঠে আসা অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ; সংশ্লিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে পৃথক তদন্ত ও প্রমাণের গুরুত্ব রয়েছে।
নির্বাচনে অর্থের প্রভাব শুধু প্রার্থী মনোনয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রচার-প্রচারণা, কর্মী পরিচালনা, যাতায়াত, নির্বাচনি কার্যালয়, প্রচারসামগ্রী এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক আয়োজনেও অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রার্থীরা তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারেন—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়। রাজনীতিতে যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা, অভিজ্ঞতা ও নীতিগত অবস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সামর্থ্য যদি বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ পেশাজীবী, তরুণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতা থাকা জরুরি, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার সুযোগ যেন কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টিও টিআইবির গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। দলীয় গঠনতন্ত্র ও আইনি অঙ্গীকারে নারীর অন্তর্ভুক্তির কথা থাকলেও বাস্তব কার্যক্রমে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নেতৃত্ব পর্যায়ে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানো ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে পূর্ণাঙ্গ বলা কঠিন। একইভাবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামত, নিয়মিত কাউন্সিল এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা না হলে দলীয় কাঠামোতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ অব্যাহত থাকতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য টিআইবি ১২ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন; রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা; নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক হিসাব যাচাই ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তদারকি বাড়ানো; এবং তালিকাভুক্ত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, প্রতিটি পর্যায়ের নেতৃত্ব গোপন ভোটে নির্বাচন, দলীয় প্রধানসহ নেতৃত্বস্থানীয় পদে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নির্ধারণ এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নির্বাচন কমিশনের কার্যকর তদারকি ও আইনি কাঠামোর শক্তিশালী প্রয়োগও জরুরি। দলগুলোর আর্থিক হিসাব প্রকাশের একটি অভিন্ন পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন, যাতে আয়, ব্যয়, অনুদান, সদস্য চাঁদা এবং নির্বাচনি তহবিলের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা যায়। অনুদান গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, পরিমাণ ও প্রযোজ্য সীমা স্পষ্ট করা দরকার। একই সঙ্গে নিরীক্ষা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়, বরং স্বাধীনভাবে সম্পন্ন হয় এবং নিরীক্ষার ফলাফল জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য থাকে।
রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা করে, কিন্তু তাদের নিজেদের ভেতরের গণতন্ত্র ও আর্থিক স্বচ্ছতা দুর্বল থাকলে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখে এবং জননীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। তাই দলগুলোর অর্থের উৎস ও ব্যয়ের হিসাব গোপন বা অস্পষ্ট থাকলে তা কেবল দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জনস্বার্থ, নির্বাচনি সমতা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা জড়িয়ে রয়েছে।
সবশেষে প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর এত টাকা কোথা থেকে আসে, তা নয়; বরং সেই অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করা হয়, কারা দেয়, কোন শর্তে দেয় এবং কোথায় ব্যয় হয়—এসব তথ্য জনগণের সামনে কতটা স্পষ্ট, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাবকে জনসম্মুখে আনা, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করা এবং অর্থের প্রভাব থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচনের দিনে ভোটের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না; রাজনৈতিক দলগুলোর দৈনন্দিন আচরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েও তার ভিত্তি তৈরি হয়। তাই রাজনৈতিক অর্থায়নের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কেবল সাংবাদিকতা বা গবেষণার বিষয় নয়, এটি নাগরিকের জানার অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আপনার মতামত জানানঃ