মানবদেহের প্রতিটি কোষের ভেতরে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া। আমরা হাঁটছি, চিন্তা করছি, শ্বাস নিচ্ছি, খাবার হজম করছি কিংবা ঘুমিয়ে পড়ছি—প্রতিটি কাজের পেছনে রয়েছে শক্তির জটিল ব্যবহার। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানেন, এই শক্তি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো মাইটোকন্ড্রিয়া। কিন্তু এই ক্ষুদ্র কোষীয় কাঠামোর ভেতরে শক্তি তৈরির প্রক্রিয়া কি শুধু প্রচলিত রাসায়নিক নিয়ম দিয়েই পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি সেখানে এমন কোনো সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া কাজ করছে, যার ব্যাখ্যা খুঁজতে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বিস্ময়কর শাখা কোয়ান্টাম মেকানিকসের দিকে তাকাতে হবে?
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। গবেষকেরা জীবন্ত কোষ, বিভিন্ন প্রাণীর টিস্যু এবং মাইটোকন্ড্রিয়ায় এমন একটি অস্বাভাবিক কম্পন শনাক্ত করার দাবি করেছেন, যা তাঁদের প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী সম্ভাব্য কোয়ান্টাম অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাঁদের পর্যবেক্ষণে পাওয়া সংকেতটির কম্পাঙ্ক প্রায় ৭১ টেরাহার্টজ। অর্থাৎ, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৭১ লাখ কোটি বার কম্পনের সমতুল্য একটি অত্যন্ত দ্রুত প্রক্রিয়া।
গবেষণাটির শিরোনাম ‘A quantum state of mitochondria in the living cell’। ইউ ইয়াং, ঝেংলং গু এবং বো সংয়ের এই গবেষণা ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ bioRxiv-এ প্রিপ্রিন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা দাবি করেছেন, তাঁদের পর্যবেক্ষণ জীবন্ত কোষের শক্তি উৎপাদন বুঝতে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের একটি সম্ভাব্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনছে। তবে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: এটি এখনো প্রাথমিক গবেষণা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পিয়ার রিভিউয়ে যাচাই করা প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়। তাই আবিষ্কারের সম্ভাবনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর সীমাবদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, মাইটোকন্ড্রিয়া আসলে কী করে। মানবদেহের অধিকাংশ কোষের ভেতরে থাকা এই অঙ্গাণুকে প্রায়ই কোষের শক্তিকেন্দ্র বলা হয়। খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদান এবং অক্সিজেন ব্যবহার করে মাইটোকন্ড্রিয়া এমন এক ধরনের অণু তৈরি করতে সাহায্য করে, যার নাম অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট বা ATP। পেশির সংকোচন, স্নায়ুকোষের কার্যক্রম, কোষের ভেতরে বিভিন্ন অণু পরিবহন এবং অসংখ্য জৈবিক প্রক্রিয়ায় ATP শক্তি সরবরাহ করে।
এই শক্তি উৎপাদন কোনো সাধারণ যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরে ইলেকট্রন পরিবহন, প্রোটনের ঘনত্বের পার্থক্য এবং এনজাইমের মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়ার একটি জটিল ব্যবস্থা কাজ করে। ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খল থেকে সৃষ্ট প্রোটন প্রবণতা ATP তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই পুরো ব্যবস্থায় অণু, ইলেকট্রন এবং শক্তির বিনিময় ঘটে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে।
এখানেই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের প্রসঙ্গ আসে। সাধারণভাবে আমরা কোনো বস্তু বা অণুকে নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকা একটি কণা হিসেবে কল্পনা করি। কিন্তু অতি ক্ষুদ্র জগতে কণার আচরণ অনেক সময় আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। ইলেকট্রনের শক্তি নির্দিষ্ট কিছু স্তরে থাকতে পারে, কণা তরঙ্গের মতো বৈশিষ্ট্যও দেখাতে পারে এবং কিছু পরিস্থিতিতে কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের মাধ্যমে এমন বাধা অতিক্রম করতে পারে, যা প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের সরল ব্যাখ্যায় সম্ভব হওয়ার কথা নয়।
জীবদেহে কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া থাকা অবশ্য নতুন কোনো ধারণা নয়। রাসায়নিক বন্ধন, ইলেকট্রনের বিন্যাস এবং অণুর শক্তিস্তর ব্যাখ্যা করতেই কোয়ান্টাম মেকানিকসের প্রয়োজন হয়। কিছু জৈবিক ব্যবস্থায় কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের ভূমিকাও নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সালোকসংশ্লেষণে শক্তি স্থানান্তর, কিছু এনজাইমের বিক্রিয়া এবং পাখির চৌম্বকক্ষেত্র অনুভব করার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে কোয়ান্টাম জীববিজ্ঞানের গবেষণা চলছে। তবে এসব উদাহরণের প্রমাণের শক্তি এক নয়। কোনো প্রক্রিয়ায় কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ভূমিকা থাকা আর জীবদেহে বিশেষ কোনো দীর্ঘস্থায়ী কোয়ান্টাম অবস্থা আবিষ্কার করা এক বিষয় নয়।
নতুন গবেষণাটির বিশেষত্ব এখানেই। গবেষকেরা জীবন্ত কোষে এমন একটি সংকেত শনাক্ত করেছেন, যা তাঁদের মতে পরিচিত জৈব অণুর স্বাভাবিক কম্পন দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁরা মানুষের HEK-293T কোষ এবং ইঁদুরের কিডনি, যকৃৎ, হৃদ্যন্ত্র ও কঙ্কালপেশির টিস্যু পরীক্ষা করেন। পাশাপাশি এসব টিস্যু থেকে পৃথক করা মাইটোকন্ড্রিয়াও বিশ্লেষণ করেন। এ জন্য তাঁরা ব্যবহার করেন ফুরিয়ার-ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি বা FTIR নামের একটি পদ্ধতি।
সহজভাবে বললে, এই প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো নমুনা বিভিন্ন কম্পাঙ্কের অবলোহিত আলোর সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা পরিমাপ করা যায়। অণু ও রাসায়নিক বন্ধন নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে কম্পন করে। সেই কম্পনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নমুনার রাসায়নিক গঠন এবং অণুর আচরণ সম্পর্কে ধারণা পান।
গবেষকেরা জীবন্ত নমুনায় প্রায় ৭১ টেরাহার্টজের একটি অস্বাভাবিক সংকেত দেখতে পান। তাঁদের পরীক্ষায় নমুনা শুকিয়ে গুঁড়ো করে কাঠামোগত সংগঠন নষ্ট করার পর এই সংকেত আর দেখা যায়নি। বিপরীতে, জীবন্ত কোষ ও বিভিন্ন টিস্যুতে এটি শনাক্ত করা গেছে। এই পার্থক্য তাঁদের ধারণা দেয় যে সংকেতটি কোনো একক অণুর সাধারণ কম্পনের পরিবর্তে মাইটোকন্ড্রিয়ার অক্ষত কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
কিন্তু এই সংকেতের উৎস কী? এখানেই গবেষকেরা একটি তাত্ত্বিক মডেল উপস্থাপন করেছেন। তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরের ঝিল্লিতে থাকা লিপিডের CH₂ বন্ধনের কম্পন এবং আলোর মধ্যে বিশেষ ধরনের পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটতে পারে। এই ক্রিয়ার ফলে আলো ও পদার্থের বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে একটি যৌথ কোয়ান্টাম অবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যাকে পোলারিটন বলা হয়।
পোলারিটনকে সহজভাবে বোঝাতে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। সাধারণত আলো এবং পদার্থের কম্পনকে আমরা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখি। কিন্তু উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এদের মধ্যে শক্তিশালী পারস্পরিক ক্রিয়া হলে এমন একটি যৌথ অবস্থা তৈরি হতে পারে, যা পুরোপুরি শুধু আলোও নয়, আবার শুধু পদার্থের কম্পনও নয়। এতে উভয়ের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেতে পারে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে এ ধরনের যৌথ অবস্থার পরিচিত উদাহরণ রয়েছে। নতুন গবেষণায় প্রশ্নটি হলো, মাইটোকন্ড্রিয়ার জীবন্ত কাঠামোর ভেতরে এমন কোনো অবস্থা বাস্তবে তৈরি হচ্ছে কি না।
গবেষকদের মডেল অনুসারে, প্রায় ৮৭ টেরাহার্টজের একটি অন্তর্নিহিত কম্পন এই পারস্পরিক ক্রিয়ার কারণে প্রায় ৭১ এবং ১০৩ টেরাহার্টজের দুটি শক্তিস্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এর মধ্যে ৭১ টেরাহার্টজের সংকেতটি তাঁদের পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ১০৩ টেরাহার্টজের সম্ভাব্য সংকেতটি পানি ও অন্যান্য জৈব অণুর কম্পনের পরিসরের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
এখানে মনে রাখা জরুরি, গবেষকেরা মাইটোকন্ড্রিয়ার এই প্রস্তাবিত কোয়ান্টাম অবস্থাকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত করেননি। তাঁরা পরীক্ষায় পাওয়া সংকেত এবং তাত্ত্বিক হিসাব মিলিয়ে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ৭১ টেরাহার্টজের অস্বাভাবিক সংকেতটি একটি পর্যবেক্ষণ; সেটির পেছনে কোয়ান্টাম অবস্থা রয়েছে—এটি এখনো একটি পরীক্ষাযোগ্য ব্যাখ্যা।
গবেষণাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ সম্ভবত ATP উৎপাদন নিয়ে করা পরীক্ষা। গবেষকেরা জীবন্ত কোষকে দুর্বল মধ্য-অবলোহিত আলো দিয়ে প্রায় ১০ মিনিটের জন্য উদ্দীপ্ত করেন। তাঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭১ টেরাহার্টজের আলো প্রয়োগের পর পরীক্ষিত কোষে ATP উৎপাদন প্রায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ৮৭ টেরাহার্টজের আলো প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তুলনার জন্য ব্যবহৃত ৫৩ দশমিক ৭ টেরাহার্টজের আলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।
ফলাফলটি আকর্ষণীয়, কারণ এতে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলো এবং কোষের শক্তি উৎপাদনের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু এই পরীক্ষার অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে ফেলেছেন, কোয়ান্টাম অবস্থা সরাসরি ATP উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণাটিতে ব্যবহৃত কোষের ধরন, পরীক্ষার পরিসর এবং নমুনার সংখ্যা সীমিত ছিল। প্রতিটি পরীক্ষামূলক দলে আটটি নমুনা ছিল বলে গবেষণার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের শরীরে একই প্রক্রিয়া ঘটে কি না, কিংবা বাস্তব জীবনে এর প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এখনো জানা যায়নি।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, এই কম্পনের পেছনে অন্য কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে কি না। জীবন্ত কোষ অত্যন্ত জটিল একটি রাসায়নিক পরিবেশ। সেখানে পানি, প্রোটিন, লিপিড, আয়ন এবং অসংখ্য অণুর পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটে। কোনো অস্বাভাবিক স্পেকট্রাল সংকেতের অর্থ নির্ধারণ করতে হলে এসব সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাপমাত্রার প্রভাব, নমুনার গঠন, পরিমাপের সীমাবদ্ধতা এবং বিকল্প রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোও বাদ দিতে হবে।
এই কারণেই গবেষণাটির ফল স্বাধীন গবেষণাগারে পুনরাবৃত্তি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্য বিজ্ঞানীরা যদি একই সংকেত শনাক্ত করতে পারেন এবং আরও সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রস্তাবিত কোয়ান্টাম অবস্থার বৈশিষ্ট্য যাচাই করতে পারেন, তাহলে ধারণাটি অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আলো থেকে মাইটোকন্ড্রিয়ায় শক্তি স্থানান্তরের গতিবিদ্যা সরাসরি পরিমাপ করতে পারলে প্রস্তাবিত প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এই গবেষণা ভবিষ্যতে সফলভাবে যাচাই হলে তার সম্ভাব্য গুরুত্ব কী? প্রথমত, এটি জীবন্ত কোষের ভেতরে আলো, অণুর কম্পন এবং শক্তি উৎপাদনের সম্পর্ক বোঝার নতুন পথ খুলতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোষের বিপাকীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলোর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আরও গবেষণা হতে পারে। তৃতীয়ত, জীবদেহের জটিল শক্তি ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কোন ধারণাগুলো কার্যকর, তা আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাগুলোকে এখনই চিকিৎসা-পদ্ধতি বা নতুন কোনো থেরাপি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কোষের পরীক্ষাগারে পাওয়া একটি ফল মানুষের শরীরে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হতে হলে বহু ধাপের যাচাই প্রয়োজন। কোনো আলো প্রয়োগ করে মানুষের শক্তি বাড়ানো, বার্ধক্য ধীর করা কিংবা রোগ নিরাময় করা যাবে—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ এই গবেষণা দেয়নি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই এখনো খোলা: জীবনের শক্তি উৎপাদনে কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ার ভূমিকা ঠিক কতটা? জীবন্ত কোষের ভেতরে কোয়ান্টাম মেকানিকস কাজ করে, কারণ অণু ও ইলেকট্রনের জগৎ নিজেই কোয়ান্টাম নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু জীবন্ত মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরে একটি বিশেষ কোয়ান্টাম অবস্থা শক্তি উৎপাদনকে কার্যকরভাবে প্রভাবিত করছে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। নতুন গবেষণাটি এই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর সামনে এনেছে, চূড়ান্ত সমাধান নয়।
বিজ্ঞানের সৌন্দর্য এখানেই। একটি অস্বাভাবিক সংকেত নতুন ধারণার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু সেই ধারণাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন আরও পরীক্ষা, স্বাধীন যাচাই এবং বিকল্প ব্যাখ্যার কঠোর মূল্যায়ন। মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরে সত্যিই যদি এমন কোনো কোয়ান্টাম অবস্থা কাজ করে, তবে তা জীবনের শক্তি উৎপাদন সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আর যদি পরবর্তী গবেষণায় অন্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, সেটিও বিজ্ঞানের অগ্রগতিরই অংশ হবে।
আমাদের কোষের ভেতরে কোয়ান্টাম জগতের চিহ্ন আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর তাই এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে ৭১ টেরাহার্টজের অদ্ভুত সংকেত বিজ্ঞানীদের সামনে এমন একটি সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে, যা পরীক্ষা করে দেখা মূল্যবান। হয়তো ভবিষ্যতের গবেষণা দেখাবে, জীবনের জটিল রাসায়নিক যন্ত্রপাতির ভেতরে আলো ও পদার্থের সূক্ষ্ম পারস্পরিক ক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথবা প্রমাণিত হবে, রহস্যময় সংকেতটির ব্যাখ্যা অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে। আপাতত নিশ্চিত করে বলা যায়, কোষের শক্তিকেন্দ্র সম্পর্কে আমাদের জানা অনেক কিছু থাকলেও, তার প্রতিটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
আপনার মতামত জানানঃ