
১৯৪৫ সালের ২৬ জুন, সান ফ্রান্সিসকো। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা একটি সনদে সই করলেন। ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরে তখনো লড়াই চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী বিপর্যয় ঠেকানোর প্রতিষ্ঠান তৈরির চেষ্টা চলছিল।
সেই সনদ কার্যকর হলো ২৪ অক্টোবর। জন্ম নিল জাতিসংঘ। পরে সই করা পোল্যান্ডকে নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলো ৫১টি রাষ্ট্র। ২০২৬ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠানটির বয়স ৮১ বছর।
তবে এর জন্মকাহিনি কেবল শান্তির পক্ষে মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার গল্প নয়। এটি যুদ্ধজয়ী শক্তিগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার ইতিহাসও। সেই দ্বৈত উত্তরাধিকার আজও জাতিসংঘকে চালিত করে: একদিকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমতা, অন্যদিকে কয়েকটি রাষ্ট্রের বিশেষ সিদ্ধান্তক্ষমতা।
আগের স্বপ্নের ভাঙা ভিত
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও মানুষ এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল। ১৯২০ সালে কার্যক্রম শুরু করা লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জের উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি রক্ষা। কিন্তু এর বড় সমর্থক মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন নিজের দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সদস্যই হয়নি।
জাতিপুঞ্জের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, বড় শক্তিকে বাইরে রেখে কিংবা তাদের কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সেই ব্যর্থতার ভয়াবহ প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু পরবর্তী প্রতিষ্ঠানের নকশায় একটি কঠিন প্রশ্ন ছিল: বড় শক্তিকে ভেতরে রাখতে কতটা বিশেষ সুবিধা দিতে হবে? আর সেই সুবিধা দিলে ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত থাকবে? জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতারা এই প্রশ্নের নিখুঁত সমাধান পাননি। তাঁরা একটি রাজনৈতিক আপস করেছিলেন।
শান্তির নকশা, শক্তির দরকষাকষি
জাতিসংঘের পরিকল্পনা এক সম্মেলনে তৈরি হয়নি। যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন ঘোষণা ও আলোচনায় এর ধারণা গড়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালের ডামবার্টন ওকসের আলোচনায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রস্তাব তৈরি হয়। ১৯৪৫ সালের ইয়াল্টায় নিরাপত্তা পরিষদের ভোটপদ্ধতি নিয়ে বড় শক্তিগুলোর সমঝোতা এগোয়। এরপর সান ফ্রান্সিসকোতে সনদের চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
ছোট দেশগুলো স্থায়ী সদস্যদের ভেটোক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। আশঙ্কাটি ছিল পরিষ্কার: কোনো বড় শক্তি নিজেই শান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠলে, তাকে ঠেকানোর প্রতিষ্ঠান কি তার সম্মতির ওপরই নির্ভর করবে? বড় শক্তিগুলো অবশ্য বিশেষ ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হয়নি।
এই সমঝোতার রাজনৈতিক যুক্তি ছিল, সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের ওপর বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দিলে তারা হয়তো সেই ব্যবস্থার অংশই হবে না। তাদের অংশগ্রহণ ধরে রাখতে দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা তাই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতার শর্তও হলো, সীমাবদ্ধতাও হলো।
সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি ভোট। কিন্তু শান্তি ও নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের অবস্থান আলাদা। আজ এই সদস্যরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। প্রতিষ্ঠার সময় রাশিয়ার জায়গায় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন; চীনের প্রতিনিধিত্বেও পরে পরিবর্তন আসে।
এভাবে রাষ্ট্রের সমতার আদর্শের সঙ্গে ক্ষমতার অসম বণ্টন একই সনদে জায়গা পেল।
ভেটো কীভাবে শান্তির উদ্যোগ আটকে দেয়
বর্তমান ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্তে নয়টি সমর্থন প্রয়োজন। অন্যান্য সিদ্ধান্তেও অন্তত নয়টি সমর্থন লাগে; সেখানে কোনো স্থায়ী সদস্যের নেতিবাচক ভোট প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। এটিই ভেটো। তবে স্থায়ী সদস্য ভোটদানে বিরত থাকলে তা নিজে থেকে ভেটো হয় না।
এই ক্ষমতা সব ধরনের ভোটে একইভাবে প্রযোজ্য নয়—পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শান্তি ও নিরাপত্তার বড় সিদ্ধান্তে এর প্রভাব গভীর। একটি সংঘাত নিয়ে অধিকাংশ সদস্য একমত হলেও স্থায়ী সদস্যের বিরোধিতায় পদক্ষেপ আটকে যেতে পারে।
ভেটোর সমস্যা শুধু প্রকাশ্য ভোটে সীমিত নয়। কোনো খসড়া আটকে যাবে জানা থাকলে আলোচনার সময়ই তার ভাষা দুর্বল করা হতে পারে। প্রস্তাব উত্থাপন পিছোতে পারে, কিংবা এমন আপস হতে পারে যা সংকটের প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রতিটি ঘটনার প্রমাণ আলাদা করে দেখতে হয়; তবু কাঠামোটি কেন বড় শক্তির সম্মতিকে কেন্দ্র করে চলে, তা এখানেই বোঝা যায়।
ফলে আন্তর্জাতিক ন্যায়ের প্রশ্ন অনেক সময় পরিণত হয় কৌশলগত মিত্রতা, সামরিক স্বার্থ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার দরকষাকষিতে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি প্রয়োজন আর রাষ্ট্রের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার তখন এক পথে চলে না।
সিদ্ধান্তের পরও কেন বাধা থাকে
শুধু ভেটো সরিয়ে দিলেই সব সমস্যা শেষ হবে না। জাতিসংঘের নিজস্ব স্থায়ী সেনাবাহিনী বা পুলিশ বাহিনী নেই। শান্তিরক্ষা অভিযানের জন্য সদস্যরাষ্ট্রের দেওয়া জনবল প্রয়োজন। অনুমোদিত দায়িত্ব, অর্থায়ন, সরঞ্জাম ও বাস্তব নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অভিযানের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে।
তাই নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত এবং মাঠে তা বাস্তবায়ন আলাদা ধাপ। পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া বিস্তৃত দায়িত্ব দিলে কাগজের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব সক্ষমতার ব্যবধান বাড়ে। আবার রাজনৈতিক সমাধান এগোতে না থাকলে শান্তিরক্ষীরা এমন সংঘাতের মধ্যে আটকে পড়তে পারেন, যার মূল কারণ তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এই সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভুলের দায় মুছে দেয় না। বরং দায় নির্ধারণে আলাদা করে দেখতে হয়: কে কী দায়িত্ব দিয়েছিল, কী সম্পদ পাওয়া গিয়েছিল এবং তা কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল?
রুয়ান্ডা ও স্রেব্রেনিৎসা: প্রতিশ্রুতির বিপর্যয়
১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যা জাতিসংঘের ইতিহাসে গভীর ব্যর্থতার অধ্যায়। পরবর্তী স্বাধীন তদন্তে সম্পদের ঘাটতি, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব এবং উপলব্ধ সম্পদ ব্যবহারের গুরুতর ভুলের কথা উঠে আসে। ব্যর্থতাকে জাতিসংঘব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসাও দেখায়, নিরাপত্তার ঘোষণা এবং বাস্তব সুরক্ষা এক নয়। নিরাপত্তা পরিষদ এলাকাটিকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করেছিল; তবু সুরক্ষা অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয় এবং সেখানে গণহত্যা ঘটে।
এই ঘটনাগুলোকে শুধু একটি ভোট বা একটি দেশের বাধা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। দায়িত্বের নকশা, সামরিক সক্ষমতা, তথ্যের মূল্যায়ন, সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—বিভিন্ন স্তরের ব্যর্থতা জড়িত ছিল। কিন্তু মানবিক প্রশ্নটি সরল: মানুষ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করেছিল, প্রতিষ্ঠান সেই ভরসা রক্ষা করতে পারেনি।
এই ইতিহাস স্মরণ করার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্ত করা নয়। উদ্দেশ্য হলো, ব্যর্থতার প্রকৃতি এতটা স্পষ্ট করা যাতে একই দুর্বলতা নতুন নামে ফিরে না আসে।
জাতিসংঘ কি কেবল ব্যর্থতার ইতিহাস?
নামিবিয়ার অভিজ্ঞতা ভিন্ন একটি ছবি দেয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হয়। ইউএনট্যাগ স্বাধীনতার পথে রূপান্তরপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। ১৯৯০ সালের ২১ মার্চ নামিবিয়া স্বাধীন হয়।
এই সাফল্য কোনো একক প্রতিষ্ঠানের অলৌকিক অর্জন ছিল না। স্থানীয় সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও বাস্তবায়নের সুযোগ একত্র হয়েছিল। জাতিসংঘ সেই প্রক্রিয়াকে সংগঠিত ও সহায়তা করার কার্যকর কাঠামো দেয়।
এখানেই প্রতিষ্ঠানটির কাজ বোঝার সূত্র পাওয়া যায়। পক্ষগুলোর সহযোগিতা, বাস্তবসম্মত দায়িত্ব এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ মিললে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিপরীতে বড় শক্তির সংঘাত ও অনিচ্ছার মধ্যে তার ক্ষমতা সংকুচিত হয়।
এ ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদ গোটা জাতিসংঘব্যবস্থার সমার্থক নয়। কূটনৈতিক আলোচনা, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক মান তৈরির কাজকে যুদ্ধ বন্ধ করার ব্যর্থতার সঙ্গে এক মাপে বিচার করলে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত ভূমিকা বোঝা কঠিন হয়। এসব কাজ যুদ্ধ না থামানোর ব্যর্থতাকে বাতিল করে না; মূল্যায়নকে পূর্ণ করে।
সাধারণ পরিষদ ও সংস্কারের সীমা
নিরাপত্তা পরিষদ অচল হলে সাধারণ পরিষদে যাওয়ার পথ রয়েছে। ১৯৫০ সালের ‘ইউনাইটিং ফর পিস’ প্রস্তাবের অধীনে শান্তির জন্য যৌথ ব্যবস্থার সুপারিশ বিবেচনা করা যায়। ১৯৫৬ সালে প্রথম জাতিসংঘ জরুরি বাহিনী গঠনের ইতিহাসেও এই পথের ভূমিকা ছিল।
তবে সাধারণ পরিষদের এমন সুপারিশ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক ক্ষমতার হুবহু বিকল্প নয়। বৃহৎ সমর্থন রাজনৈতিক চাপ ও বৈধতা তৈরি করতে পারে; সেই চাপ কার্যকর করতে রাষ্ট্রগুলোর উদ্যোগ প্রয়োজন হয়।
সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই ক্ষমতার প্রশ্ন ফিরে আসে। সনদের ১০৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধন কার্যকর হতে সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদনের পাশাপাশি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যরাষ্ট্রের অনুসমর্থন প্রয়োজন, যার মধ্যে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেককেও থাকতে হবে।
অর্থাৎ বিশেষ সুবিধার কাঠামো বদলাতে সুবিধাভোগীদের সম্মতিও প্রয়োজন। এটি সংস্কারের পথ বন্ধ করে না, তবে কেন সেই পথ কঠিন তা ব্যাখ্যা করে।
৮১ বছর পর জন্মদিনের প্রশ্ন
বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম, বহুপক্ষীয় আলোচনা এবং ছোট রাষ্ট্রের বক্তব্য রাখার মঞ্চ তাই দূরের কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়।
জাতিসংঘের ইতিহাস থেকে শিক্ষা হলো, ন্যায় প্রতিষ্ঠার ভাষা এবং তা কার্যকর করার ক্ষমতা এক জিনিস নয়। প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার রাজনৈতিক অঙ্গীকারও প্রয়োজন। আবার অঙ্গীকারকে জবাবদিহির বাইরে রাখলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সুবিধামতো নিয়ম প্রয়োগের ঝুঁকি থাকে।
১৯৪৫ সালের শান্তির স্বপ্ন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তা একটি অসম ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে শিখেছে, কখনো সফল হয়েছে, কখনো ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আজকের প্রশ্ন তাই শুধু জাতিসংঘ প্রয়োজন কি না নয়; প্রশ্ন হলো, যাদের হাতে তাকে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, তাদের দায় কীভাবে দৃশ্যমান ও কার্যকর করা যায়।
যুদ্ধ ঠেকানোর স্বপ্নের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সনদে শান্তির কথা লেখা নয়। নিজের স্বার্থের বিপরীতেও সেই কথার দায়িত্ব নেওয়া।
আপনার মতামত জানানঃ