
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ নিয়ে একসময় সবচেয়ে জোরালো ছিল অর্জনের ভাষা। এখন সামনে এসেছে প্রস্তুতির প্রশ্ন। সরকার আরও তিন বছর সময় চাইছে। এই পরিবর্তনকে কেবল জাতীয় মর্যাদার উত্থান-পতন হিসেবে দেখলে অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যাবে। আবার বাড়তি সময়ের আবেদনকে সাফল্য হিসেবে উদ্যাপন করলেও জিজ্ঞাসাটি থেকে যায়: এতদিন যে প্রস্তুতি হওয়ার কথা ছিল, তা কতটা হয়েছে?
১৯ অক্টোবর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির অক্টোবরের মধ্যেই স্থগিতের আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্তের আশা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে প্রস্তুতির ঘাটতির স্বীকৃতি রয়েছে। সরকার বাড়তি সময় কাজে লাগাতে কর্মপরিকল্পনার কথাও বলেছে। তবে প্রত্যাশা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। জাতিসংঘের এলডিসি পোর্টালের বর্তমান তথ্যে বাংলাদেশের নির্ধারিত উত্তরণের তারিখ এখনো ২৪ নভেম্বর ২০২৬।
জাতিসংঘের উন্নয়ননীতি কমিটি বা সিডিপি বাড়তি প্রস্তুতিকালকে উপযুক্ত বিবেচনা করেছে, তবে কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছে। ইকোসকও বিষয়টি সাধারণ পরিষদের পদক্ষেপের জন্য এগিয়েছে। অর্থাৎ সময় চাওয়ার যুক্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে; অনুমোদন হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
উত্তরণের অর্থ কী?
প্রচলিত শিরোনামে ‘উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ’ বলা হলেও এখানে নির্দিষ্ট বিষয়টি জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়া। এটি বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের সমার্থক নয়। বাংলাদেশ ২০১৫ সালেই নিম্নমধ্যম আয়ের শ্রেণিতে প্রবেশ করেছে।
এলডিসি উত্তরণের বিবেচনায় মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতার সূচক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করেছিল। এই অগ্রগতি বাস্তব অর্জন। তবে মানদণ্ড পূরণ করলেই প্রতিটি শিল্প সমানভাবে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় না; গড় অগ্রগতির মধ্যেও প্রতিষ্ঠান, অঞ্চল ও মানুষের সক্ষমতায় বড় ব্যবধান থাকতে পারে।
উত্তরণের সনদ তাই উন্নয়নের সমাপ্তি ঘোষণা করে না। বরং দীর্ঘদিনের বিশেষ সহায়তার কিছু ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বদলে যাওয়ার পরিবেশে অর্থনীতি কতটা টেকসই থাকবে, সেই পরীক্ষাটি সামনে আনে।
সময় চাওয়া কেন যৌক্তিক হতে পারে
একটি রপ্তানিমুখী কারখানার প্রতিযোগিতা শুধু বিদেশের শুল্কহারের ওপর নির্ভর করে না। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, সময়মতো কাঁচামাল, সহজ ঋণ, দক্ষ শ্রমিক এবং বন্দরে নির্ভরযোগ্য সেবা তার ব্যয় ও সরবরাহক্ষমতা নির্ধারণ করে। বিশেষ বাণিজ্যসুবিধার পরিবর্তন এসব দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি চাপ সামলাতে হয়।
সেই চাপের একটি অংশ শ্রমিকের ওপর পড়তে পারে—নতুন নিয়োগ কমানো, মজুরির উন্নতি পিছিয়ে দেওয়া কিংবা ছোট সরবরাহকারীর কাজ হারানোর মাধ্যমে। এগুলো অনিবার্য ফল নয়; নীতি তৈরির সময় বিবেচনায় রাখার ঝুঁকি। তাই উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা উন্নয়নের বিরোধিতা নয়। কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় রক্ষার চিন্তা থেকেই বাড়তি সময় চাওয়ার যুক্তি থাকতে পারে।
কিন্তু সেই যুক্তির শক্তি নির্ভর করবে সময়ের ব্যবহার কতটা নির্দিষ্ট তার ওপর। ক্যালেন্ডারে তিন বছর যোগ হলে বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে না, শুল্কায়নের জট খোলে না, শ্রমিকের দক্ষতাও আপনা থেকে উন্নত হয় না।
সব সুবিধা এক দিনে শেষ হয় না
আলোচনায় সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা হলো: উত্তরণের দিনই সব বাজারে সব সুবিধা শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। সুবিধার ধরন, বাজার এবং সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পরিবর্তনের সময় আলাদা হতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের ব্যাখ্যায়, ২০২৬ সালে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত বাংলাদেশসহ তিন দেশ উত্তরণের পর আরও তিন বছর ইবিএ সুবিধা পাবে, অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে জিএসপি প্লাসের জন্য আবেদনের সুযোগও রয়েছে। তবে আবেদন করার সুযোগ আর সুবিধা নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়; সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ ও মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে ‘উত্তরণ হলেই ইউরোপের বাজার বন্ধ’ ধরনের আতঙ্ক বাস্তবতাকে বিকৃত করে। একই সঙ্গে তিন বছরের অন্তর্বর্তী সুবিধা আছে বলে নিষ্ক্রিয় থাকারও সুযোগ নেই। ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা আগাম পরিকল্পনা করেন। ভবিষ্যৎ বাজারসুবিধার অনিশ্চয়তা তাই চূড়ান্ত পরিবর্তনের আগেও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
উত্তরণের তারিখ পেছানো এবং উত্তরণের পরে নির্দিষ্ট সুবিধা বহাল রাখা দুটি আলাদা নীতিপথ। একটি অর্জিত হলেই অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হবে—এমন হিসাব করা উচিত নয়।
প্রস্তুতির ঘাটতির দায় কার?
বর্তমান সরকার আগের প্রস্তুতির ঘাটতি তুলে ধরতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে বর্তমান কাজের স্বচ্ছতার ওপর। অতীতের ব্যর্থতার বিবরণ বর্তমানের বাস্তবায়ন-প্রতিবেদনের বিকল্প হতে পারে না।
কোন খাত কতটা ঝুঁকিতে, কোন সংস্কার আটকে আছে, কোন সংস্থা দায়ী এবং সমাধানের সময়সীমা কত—এসব প্রকাশ করা দরকার। ব্যবসায়ীদের দাবি মূল্যায়নেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অতিরিক্ত সুবিধা কি প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, নাকি অদক্ষতা টিকিয়ে রাখবে? জনসম্পদ ব্যবহারের প্রশ্নে এই পার্থক্য জরুরি।
সমস্যাকে কেবল পুরোনো সরকারের প্রচার অথবা বর্তমান সরকারের কূটনীতির প্রতিযোগিতায় নামিয়ে আনলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলো হারিয়ে যান। শ্রমিক জানতে চান তাঁর কাজ থাকবে কি না। ছোট উদ্যোক্তা জানতে চান প্রতিযোগিতার ব্যয় তিনি সামলাতে পারবেন কি না। রাষ্ট্রের উত্তরণের পরিকল্পনায় তাঁদের উত্তর থাকতে হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ এবং জিএসপি প্লাসের প্রস্তুতি পাশাপাশি চলছে। এ ক্ষেত্রে আলোচনার উদ্যোগকে কার্যকর চুক্তির সমান ধরে নেওয়া যাবে না। মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে বাজার খোলার বিনিময়, দেশীয় শিল্পের প্রস্তুতি, রাজস্ব এবং বাস্তবায়নের প্রশ্ন থাকে। কাজেই বিকল্প প্রস্তুতি সচল রাখাই বিচক্ষণতা।
বাড়তি সময়ের সঙ্গে কী বদলানো দরকার
সময় বাড়লে প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রকাশ্য বাস্তবায়নসূচি। কোন মন্ত্রণালয় কী করবে, কত বাজেটে করবে এবং কোন সূচকে অগ্রগতি মাপা হবে—তা নাগরিকের জানার উপযোগী করতে হবে। পরিকল্পনা অংশীদারদের কাছে জমা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের কাছেও বোধগম্য হওয়া প্রয়োজন।
বন্দরে পণ্য ছাড়ের সময়, শিল্পে জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা, রপ্তানির বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য, শ্রমমানের বাস্তব প্রয়োগ এবং বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতি—এসব দিয়ে প্রস্তুতি মাপা যায়। সভা ও প্রশিক্ষণের সংখ্যা সেই ফলাফলের বিকল্প নয়। স্বাধীন মূল্যায়ন ও নিয়মিত প্রকাশ্য পর্যালোচনা ব্যর্থতা শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।
এই লেখার মূল্যায়ন হলো, উত্তরণ পেছানোর আবেদন একই সঙ্গে যুক্তিসংগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চেষ্টা এবং প্রস্তুতির ঘাটতির স্বীকৃতি হতে পারে। কোন পরিচয়টি শেষ পর্যন্ত প্রধান হবে, তা নির্ধারণ করবে পরবর্তী কাজ।
রাষ্ট্র আরও সময় চাইতে পারে। কিন্তু মানুষ জানতে চাইবে, সেই সময় পেয়ে রাষ্ট্র কী বদলাল। তিন বছর পর যদি একই অজুহাত ফিরে আসে, তবে স্থগিতাদেশের অর্জন থাকবে ক্যালেন্ডারে; অর্থনীতির সক্ষমতায় নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন প্রস্তুতি, যার সাফল্য আন্তর্জাতিক তালিকার পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা ও মানুষের জীবনে দেখা যায়।
আপনার মতামত জানানঃ