মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যেন ক্রমেই আরও জটিল ও বিস্ফোরক হয়ে উঠছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের অগ্রগতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর কৌশলগত কয়েকটি দ্বীপের দিকে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে তাদের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করতে পারে সৌদি আরবের ওপর।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি শুধু দেশটির দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের নতুন অধ্যায় নয়; এর প্রভাব এখন ছড়িয়ে পড়ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ার পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের নৌপথের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। ফলে বাব আল-মান্দেব যদি নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তাহলে তার প্রভাব সৌদি আরব ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারেও পৌঁছাতে পারে।
১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছে বলে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্র দাবি করেছে। কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও তাদের উপস্থিতির খবর এসেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই দ্বীপগুলো এবং মোখা অঞ্চল সামরিক ও নৌ-কৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকে লোহিত সাগরের দক্ষিণাংশ এবং বাব আল-মান্দেবের নৌপথের ওপর নজরদারি ও চাপ সৃষ্টি করা তুলনামূলকভাবে সহজ।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এরপর এই নৌপথ ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। এ কারণে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে প্রণালিটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথগুলোর একটি হওয়ায় এখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচলের খরচ, বিমা ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের সময়—সবই বেড়ে যেতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাতের কারণে দেশটির তেল রপ্তানির প্রচলিত নৌপথের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে সৌদি তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ বিকল্প পথে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ যে পথটি আগে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিই সৌদি আরবের জন্য আরও বেশি কৌশলগত হয়ে উঠেছে।
এই নির্ভরতার জায়গাটিই এখন বড় ঝুঁকি। বাব আল-মান্দেবে যদি হুথিরা কার্যকরভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে কিংবা নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি নতুন সমস্যায় পড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বাব আল-মান্দেব দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পণ্যের মোট পরিবহনের প্রায় ৫ শতাংশ। এই পরিমাণই বোঝায়, প্রণালিটিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার অভিঘাত কতটা বিস্তৃত হতে পারে।
এরই মধ্যে হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের জাহাজকে লক্ষ্য করে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত এসেছে। হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরে অন্যান্য নৌযানের চলাচল নিরাপদ থাকবে; তবে সৌদি আরবের জাহাজ সেই নিরাপত্তার আওতায় থাকবে না। অর্থাৎ সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে অবরোধ ও হামলার হুমকি অব্যাহত রয়েছে। জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার পর চলতি মাসে হামলা আরও জোরদার হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সৌদি আরবের ভেতরেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সৌদির দক্ষিণাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই হুথিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হামলার পরিধি ও লক্ষ্যবস্তু নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘও ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেছেন, দেশটির যুদ্ধ আরও নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মোখার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌপথের প্রবেশপথের কাছে তাদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও হুথিদের ভূমিকা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হুথিদের উত্তেজনা বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয় এবং যারা তাদের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে, তাদেরও এর পরিণতির দায় নিতে হবে। অন্যদিকে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হুথিদের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। ফলে হুথিদের কর্মকাণ্ডে ইরানের ভূমিকা নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
ইরান ও সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরে দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করে আসছে। সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে বিভিন্ন দেশে মিত্র ও সমর্থিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে। ইয়েমেন এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি। হুথিদের সাধারণত ইরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে দেখা হলেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য, সাংগঠনিক কাঠামো এবং স্থানীয় স্বার্থও রয়েছে।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটির রাজনৈতিক সংকট পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। এর পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া সেই সামরিক অভিযান বহু বছর ধরে চলে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের লড়াই থামলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেই হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা তৈরি করেছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও তেল অবকাঠামো তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে অতীতেও। চলতি সপ্তাহেও সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের তেল স্থাপনায় হামলার খবর এসেছে। কয়েক ডজন মানুষ আহত হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির খবর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দামও প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে গ্যাসবাডির তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। যদিও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক বৈশ্বিক কারণ কাজ করতে পারে, একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাজারের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। যুদ্ধের কারণে এই পথের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। তার সঙ্গে যদি বাব আল-মান্দেবেও বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ ও এশিয়ার দিকে জ্বালানি পরিবহনের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হবে। জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হলে সময় ও খরচ উভয়ই বাড়বে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়ার তেল আমদানিকারক দেশগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জ্বালানি পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দামে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের দাম পর্যন্ত এর প্রভাব পৌঁছাতে পারে। ফলে আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত খুব দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
পরিস্থিতির কূটনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তি নতুন বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। চুক্তির আওতায় কোনো একটি সদস্য দেশ হামলার শিকার হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের খবরও এসেছে। ফলে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা শুধু ইরান-সৌদি দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
পাকিস্তানও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাকিস্তান ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে হুথিদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের দাবি অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে হুথিদের কর্মকাণ্ড কমানো বা থামানোর ক্ষেত্রে তেহরানের প্রকৃত সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকটের কেন্দ্র এখন আর শুধু ইয়েমেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত, অন্যদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তার সঙ্গে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের সময় যত দীর্ঘ হবে, ততই নতুন নতুন পক্ষ ও ফ্রন্ট এতে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেবের ওপর নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়, তাহলে সৌদি আরবকে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডরের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হতে পারে। এতে দেশটির তেল রপ্তানি অবকাঠামো, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সামরিক প্রস্তুতির ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
আর তেলের দাম বাড়লে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কারণ জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা যত বাড়বে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যও তত বেশি হবে। ফলে যে সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব বলে মনে হতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক তাই সংঘাতের বিস্তার। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি, সৌদি আরবের ওপর হামলার আশঙ্কা, বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা—সবগুলো ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় আঞ্চলিক সংকটের চিত্র তৈরি করছে। সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি কতটা বাড়ে, সৌদি আরব কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কত দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যায় তার ওপর।
সব মিলিয়ে ইয়েমেনের উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এখন আর কেবল একটি গৃহযুদ্ধের সামরিক ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্বের জ্বালানি বাজার। বাব আল-মান্দেব যদি সংঘাতের নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি তার ঢেউ বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাতেও আঘাত করতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ