গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কী ধরনের পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে—এ নিয়ে নতুন করে তীব্র আলোচনা তৈরি হয়েছে। দুই ডজনের বেশি সাবেক ও বর্তমান ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা সদস্যের জবানবন্দির ভিত্তিতে নির্মিত নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’ সেই অন্দরমহলের চিত্র সামনে এনেছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দেওয়া এসব সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ফোন হ্যাকিং এবং দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগ।
ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর পরিচালিত ‘নাজা’ প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কারের প্রতিযোগিতায় থাকা একমাত্র প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে এটি উৎসবে বিশেষ মনোযোগ পেয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রটির প্রযোজক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। নির্মাণের পেছনে রয়েছে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান।
‘নাজা’ নামটিও এসেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি সংক্ষিপ্ত পরিভাষা থেকে। কোনো সামরিক হামলায় সম্ভাব্য নিহত বেসামরিক নাগরিকদের বোঝাতে এই ধরনের পরিভাষা ব্যবহারের বিষয়টি প্রামাণ্যচিত্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের প্রাণহানিকে কীভাবে সামরিক ভাষা ও কাঠামোর মধ্যে সংজ্ঞায়িত করা হয়, সেটিও এখানে আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রামাণ্যচিত্রটির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, এতে ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ২৪ জন সদস্যের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন সরাসরি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নজরদারি এবং সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে রাতে এসব সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় গোপন রাখতে প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁদের চেহারা ও কণ্ঠ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে।
সাক্ষাৎকারগুলোতে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট হামলার বর্ণনা নয়। বরং কীভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়, কীভাবে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করা হয় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—তার একটি বিস্তৃত কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতাদের দাবি, তাঁদের অনুসন্ধানের লক্ষ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনায় কয়েকজন সেনার দায় নির্ধারণ করা নয়; বরং সামরিক নীতি, নির্দেশনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সেই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা বোঝা।
এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। সাক্ষাৎকারদাতাদের বর্ণনা অনুযায়ী, এআই-ভিত্তিক বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে হামাসের তুলনামূলক নিচু স্তরের বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য সদস্যকে চিহ্নিত করা হতো। এরপর তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বাড়িতে হামলার সময় সেখানে পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছেন—এমন তথ্য জানা থাকার পরও হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধের প্রযুক্তিনির্ভর চরিত্র এখানে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ফোন হ্যাকিংয়ের অভিযোগে। প্রামাণ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামাস যোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তাঁদের ফোনে প্রবেশ করা হতো। এমনকি হামলার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথন গোপনে শোনার অভিযোগও রয়েছে। এই ধরনের নজরদারি যুদ্ধের প্রচলিত গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডকে কীভাবে ব্যক্তিগত জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
প্রামাণ্যচিত্রে আরও কিছু প্রত্যক্ষ বর্ণনা রয়েছে, যেগুলো বিশেষভাবে আলোড়ন তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে এমন একটি এলাকা ধ্বংস করার অভিযোগ, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাসিন্দা নিজেদের ঘরে ছিলেন। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনাও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এখানে প্রশ্নটি কেবল কতজন মানুষ নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে নয়। বরং একটি সামরিক ব্যবস্থার ভেতরে বেসামরিক মানুষের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনী কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করার সিদ্ধান্ত নিলেও সেখানে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি থাকলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের নানা নীতি প্রযোজ্য হয়। তাই পরিকল্পিত বা জেনেশুনে বেসামরিক মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
প্রামাণ্যচিত্রটির পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর নিজেদের কাজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তাঁরা ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার নেপথ্যের কাঠামো খতিয়ে দেখার দায়বদ্ধতা থেকে ছবিটি তৈরি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান থেকেই তাঁরা এই অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিয়েছেন।
তাঁদের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাঁরা ছবিটিকে শুধু ‘বিপথগামী সেনাদের’ বিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধের গল্প হিসেবে দেখতে চাননি। বরং তাঁদের অনুসন্ধানের কেন্দ্রে ছিল সামরিক নির্দেশ, নীতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার যুক্তি এবং এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাঠামো। অর্থাৎ কোনো একজন সেনা বা কর্মকর্তাকে আলাদা করে দায়ী করার পরিবর্তে তাঁরা এমন একটি ব্যবস্থার দিকে নজর দিয়েছেন, যার ভেতরে ধারাবাহিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
প্রামাণ্যচিত্রটির পেছনের অনুসন্ধানও দীর্ঘ সময়ের। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি প্রকাশনা +৯৭২ ম্যাগাজিন, হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম লোকাল কল এবং দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘নাজা’ নির্মিত হয়েছে। গোপন সূত্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো প্রযোজনা প্রক্রিয়া কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হয়েছিল। এমনকি উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগপর্যন্ত ছবিটির বিষয়বস্তুও প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী বিভাগের প্রধান ও ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক পল লুইসের ভাষায়, এটি গাজায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলো উন্মোচন ও যাচাই করতে বছরের পর বছর ধরে করা অনুসন্ধানের পরিণতি। ফলে ‘নাজা’কে কেবল একটি চলচ্চিত্র হিসেবে নয়, দীর্ঘ সময় ধরে সংগৃহীত তথ্য, সাক্ষ্য ও অনুসন্ধানের একটি দৃশ্যমান রূপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবার্তো বারবেরাও ছবিটির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ‘নাজা’ রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং চলচ্চিত্রের দিক থেকেও অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কাজ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি সাধারণ সাক্ষাৎকারের সংকলন নয়। ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গাজা অভিযান চলাকালে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলাতে নির্মাতাদের প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে।
এই প্রামাণ্যচিত্রের আলোচনায় গাজার মানবিক বিপর্যয়ের বৃহত্তর চিত্রও সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ। নিহত ও আহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হতাহত মানুষের এই সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
শুধু প্রাণহানি নয়, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ভয়াবহ। খাদ্য সরবরাহে বিধিনিষেধের কারণে গাজায় মানবিক সংকট ও দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বাড়িঘর ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছেন। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট তাঁদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতির সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। সেদিন হামাসের নেতৃত্বে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘাত ক্রমেই আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট এবং অবকাঠামো ধ্বংস নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
‘নাজা’ নির্মাতাদের আগের কাজের সঙ্গেও গাজার এই অনুসন্ধানের একটি যোগসূত্র রয়েছে। ২০২৫ সালে সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে অস্কার পাওয়া ‘নো আদার ল্যান্ড’-এর চার সহপরিচালকের মধ্যে ছিলেন ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর। ওই ছবিতে তাঁরা ফিলিস্তিনি সহপরিচালক বাসেল আদরা ও হামদান বালালের সঙ্গে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, বাড়িঘর ধ্বংস এবং দখলদারত্বের চিত্র নথিভুক্ত করেছিলেন।
‘নো আদার ল্যান্ড’-এ যেখানে ক্যামেরার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে একটি ভূখণ্ডে মানুষের জীবন ও উচ্ছেদের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছিল, ‘নাজা’-তে অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো। দুই ছবির মধ্যে এই পার্থক্য থাকলেও একটি মিল স্পষ্ট—দুটিতেই নির্মাতারা সংঘাতের দৃশ্যমান ফলাফলের পাশাপাশি তার নেপথ্যের কাঠামো বোঝার চেষ্টা করেছেন।
‘নাজা’কে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক সম্ভবত এখানেই। এটি শুধু গাজায় কী ঘটেছে, সেই প্রশ্ন তুলছে না; বরং কেন ঘটেছে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কোন প্রযুক্তি ও সাংগঠনিক কাঠামো সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছে—সেই প্রশ্ন সামনে আনছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই সামরিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নজরদারি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল গোয়েন্দা ব্যবস্থার ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। কিন্তু প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হয়, ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতিও তত ভয়াবহ হতে পারে। কোনো অ্যালগরিদম বা গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন মানুষকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করার পর সেই তথ্যের ভিত্তিতে সামরিক হামলা চালানো হলে সেখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই জায়গাতেই ‘নাজা’ শুধু একটি যুদ্ধের গল্প হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতা, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহির গল্প। সাক্ষাৎকারদাতাদের অভিযোগগুলো যদি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় এবং সেগুলোর সঙ্গে অন্যান্য প্রমাণের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়, তাহলে গাজা যুদ্ধের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে কোনো প্রামাণ্যচিত্রে উঠে আসা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণের পাশাপাশি স্বাধীন যাচাই, প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। যুদ্ধের তথ্যের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পক্ষের সাক্ষ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎসও প্রয়োজন।
তারপরও ‘নাজা’র গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ যুদ্ধের ভয়াবহতার অনেকটাই সাধারণ মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘর, গোয়েন্দা ইউনিট, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা এবং সামরিক পরিকল্পনার অন্দরমহল সাধারণত অদৃশ্য থেকে যায়। এই অদৃশ্য কাঠামোকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছে প্রামাণ্যচিত্রটি।
গাজায় নিহত মানুষের সংখ্যা, ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর কিংবা বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘ সারির পেছনে রয়েছে অসংখ্য সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, কোন তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল এবং বেসামরিক মানুষের জীবনকে সেখানে কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল—‘নাজা’ মূলত সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে। ভেনিসের পর্দায় ছবিটির প্রদর্শন তাই শুধু একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী নয়; গাজা যুদ্ধের নেপথ্য কাঠামো, প্রযুক্তি ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনারও সূচনা করেছে।
আপনার মতামত জানানঃ