
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী ঘিরে চলতি জুলাই মাসজুড়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষণীয়—প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দল নিজেদের সেই আন্দোলনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। কর্মসূচির নাম, স্মরণসভার আয়োজন, সংসদে বক্তব্য—সবকিছুর মধ্য দিয়েই ফুটে উঠছে একধরনের “ভাষ্য-প্রতিযোগিতা”। এই লেখায় দেখা যাক, কোন দল কীভাবে জুলাইকে নিজের ভাষায় সাজাচ্ছে।
কেন এই প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মৌলিক বিভাজনরেখা তৈরি করেছে—আন্দোলন-পূর্ব ও আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশ। যে দল বা জোট নিজেদের এই আন্দোলনের “প্রকৃত মালিক” বা “নেতৃত্বদানকারী শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, রাজনৈতিক বৈধতা ও ভবিষ্যৎ ভোটব্যাংকের প্রশ্নে তাদের একটি বাড়তি সুবিধা তৈরি হবে। এ কারণেই আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জুলাইয়ের স্মৃতি ও উত্তরাধিকার নিয়ে দলগুলোর মধ্যে এই মনোযোগ বেড়েছে।
এনসিপি: নিজেদের প্রধান উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যা সরাসরি জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের হাত ধরে গঠিত হয়েছিল, “দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ” স্লোগান সামনে রেখে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে কবর জিয়ারত, দেশব্যাপী গ্রাফিতি অঙ্কন, দেয়াললিখন, ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শনী ও পদযাত্রা। এই ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এনসিপি স্পষ্টভাবে নিজেদের জুলাইয়ের “চেতনার” মূল বাহক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে—যা দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রীয় ভিত্তি।
ছাত্রদল: ঐক্যের ভাষ্য নিয়ে হাজির
বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলও দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে নিজস্ব কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তবে তাদের বার্তার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে “ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য”। ছাত্রদলের নেতৃত্ব বলছে, ঐক্যবদ্ধভাবে জুলাই চেতনা ধারণ করে ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই ভাষ্যের বিশেষত্ব হলো, এটি জুলাইকে কোনো একক দলের অর্জন হিসেবে না দেখিয়ে একটি সম্মিলিত জাতীয় প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে—যা কৌশলগতভাবে এনসিপির “মালিকানা” দাবিকে পরোক্ষভাবে খণ্ডন করার একটি উপায় হতে পারে।
বিএনপি: নৈতিক সমর্থন থেকে সরাসরি অংশগ্রহণের ভাষ্যে রূপান্তর
বিএনপির ভাষ্য নির্মাণ প্রক্রিয়াটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আন্দোলনের সময় দলটির শীর্ষ নেতারা সরাসরি রাজপথে ব্যাপকভাবে সক্রিয় না থাকলেও, দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটির প্রকাশ্য বয়ান ধীরে ধীরে “নৈতিক সমর্থন” থেকে “সরাসরি অবদান”-এর দিকে সরে এসেছে বলে সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণ। এখন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলটি জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে, যদিও এনসিপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে বাস্তবায়নে গড়িমসির অভিযোগ দলটিকে এই ভাষ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে চাপে ফেলছে।
জামায়াত: সম্মিলিত কৃতিত্বের ভাষ্য, কিন্তু অতীত বক্তব্যে দ্বন্দ্ব
জাতীয় সংসদে সাম্প্রতিক এক অধিবেশনে জুলাই আন্দোলনের “মাস্টারমাইন্ড” বা প্রধান নায়ক প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি বাগবিতণ্ডা হয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বলেন, এই আন্দোলনের কোনো একক মাস্টারমাইন্ড নেই, কৃতিত্ব বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষ ও দেশের যুবসমাজের। জবাবে বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদীন ফারুক পাল্টা মনে করিয়ে দেন, শফিকুর রহমান নিজেই অতীতে এক ইফতার মাহফিলে তারেক রহমানকে জুলাই আন্দোলনের “মহানায়ক” বলে উল্লেখ করেছিলেন। জবাবে শফিকুর রহমান ব্যাখ্যা দেন, সেই মন্তব্য তিনি ২০২৪ সালের এপ্রিলে দিয়েছিলেন, কিন্তু ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এই ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখায়, দলগুলোর ভাষ্য সময় ও রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী কীভাবে বদলে যাচ্ছে।
অন্তর্নিহিত প্রতিযোগিতা: রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
সংবাদমাধ্যমের একাধিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই প্রবণতাকে সরাসরি “রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে শীতল প্রতিযোগিতা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো—প্রকাশ্যে কোনো দলই আন্দোলনকে নিজেদের একক সম্পত্তি বলে দাবি করছে না (কারণ তা রাজনৈতিকভাবে অসংবেদনশীল ও অগ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে), কিন্তু কর্মসূচির কাঠামো, বক্তব্যের সুর ও সংসদীয় বাগবিতণ্ডার মধ্য দিয়ে প্রত্যেকেই নিজেদের একটি বিশেষ ও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কেন এই ভাষ্য-নির্মাণ পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি নিয়ে প্রতিটি দলের নিজস্ব ভাষ্য নিছক আবেগের প্রকাশ নয়—এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বৈধতা, ভোটার সংযোগ ও ক্ষমতার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া। কোন দল কীভাবে জুলাইকে বর্ণনা করছে, তা লক্ষ করলে বোঝা যায় তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক কোন জায়গায় দেখতে চায়। পাঠকের জন্য এই ভাষ্যগুলোর পার্থক্য চিনতে পারা তাই কেবল ইতিহাস বোঝার প্রশ্ন নয়, বর্তমান রাজনীতির অভিমুখ বোঝারও একটি হাতিয়ার।
আপনার মতামত জানানঃ