তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ করেছে। প্রায় দুই দশক পর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপির সামনে শুরু থেকেই ছিল বড় প্রত্যাশা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল দলটি। ফলে নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও ছিল অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। নির্বাচনের আগে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, তার মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার ছিল অন্যতম।
১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিনই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিল সরকার—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। ছয় মাস পর সেই অগ্রাধিকারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে সরকার ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে, আবার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশে অপরাধ, রাজনৈতিক সংঘাত এবং মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সেই পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে নয়টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫৫ জন। ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৩৬৫টি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো মব সহিংসতায় ১২০ জনের মৃত্যুর হিসাব।
আরেকটি বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবেও রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৮৩০টি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫২৯। অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও মাঠপর্যায়ে সংঘাতের প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর হামলার ঘটনাগুলো রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য আরও সুস্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল। ফলে এই খাতে সরকারের ছয় মাসের পারফরম্যান্সকে এখনো সন্তোষজনক বলা কঠিন।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সরকারের সামনে ছিল বড় ধরনের চাপ। দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ধীরগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের মধ্যে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আগের সরকারের সময় তৈরি হওয়া নানা আর্থিক অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার উত্তরাধিকার।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকার কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্বল কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগকে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার জন্য তহবিল গঠনের উদ্যোগও ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগও সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষ ও কৃষকদের সরাসরি সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—দ্রব্যমূল্য—এখনো পুরোপুরি কমেনি।
মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক নীতি এবং সরবরাহব্যবস্থার সমন্বিত উন্নতি ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন। ফলে ছয় মাসে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের কিছু সাফল্য থাকলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দ্রব্যমূল্যের চাপ এখনো বড় বাস্তবতা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষার জায়গা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ লোডশেডিং, বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়ম এবং অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। গরমের সময়ে বিদ্যুৎ সংকট শুধু পারিবারিক জীবন নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব ফেলেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সংকট। জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার অবশ্য এসব সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি অবকাঠামোর সমস্যা এবং টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো কারণ দেখিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে কারণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যার সমাধান। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
এই সংকটের রাজনৈতিক প্রভাবও দেখা গেছে। সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাজপথে কর্মসূচি দিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন আরও জোরালো হলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও দ্রব্যমূল্যের মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক চাপের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।
তবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সরকারের ছয় মাসের চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই নির্বাচন সরকারের জন্য মর্যাদাপূর্ণ সাফল্য।
তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জুনে মালয়েশিয়া ও চীন সফরে দুই দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। অর্থনৈতিক করিডর, তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সহযোগিতার আলোচনা বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো সরকারের অন্যতম কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও ঢাকা জানিয়েছে, সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে আগামী কয়েক মাস সরকার কী কৌশল নেয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত রাজনৈতিক সংস্কার ও সুশাসন নিয়ে। গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার। আগের সরকারের সময় দলীয়করণ, দুর্নীতি, দুর্বল জবাবদিহি এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশা ছিল নতুন সরকারের কাছে।
জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়েও তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। বিএনপি সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীন বিচার বিভাগ, পুলিশ সংস্কার, মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কাঠামো এবং দুর্নীতি দমনের মতো বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সমালোচনা বাড়ছে।
এখানেই সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জটি দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বৈধতা পেলেও শুধু নির্বাচনই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের শেষ ধাপ নয়। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিরোধী মতের জন্য কার্যকর রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করাও একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। এই জায়গায় প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে।
অবশ্য সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অধিকাংশই বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। অর্থাৎ সরকার মনে করছে, ছয় মাসের সময়সীমায় তার কর্মপরিকল্পনার বড় অংশ পূরণ হয়েছে।
কিন্তু সরকারের সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ঘোষিত কর্মসূচি নয়, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের মূল্যায়নের মাপকাঠি হলো বাজারে পণ্যের দাম, ঘরে বিদ্যুৎ আছে কি না, রাস্তায় নিরাপত্তা কতটা, চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তার অধিকার কতটা নিশ্চিত করছে।
এই বিচারে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে একেবারে ব্যর্থ বলা যেমন কঠিন, তেমনি বড় সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করাও কঠিন। সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যাংকিং সংস্কার এবং কূটনীতিতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে প্রথম ছয় মাস ছিল বিএনপি সরকারের জন্য মূলত পরীক্ষা ও অবস্থান তৈরির সময়। সরকার কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের অগ্রাধিকার দেখিয়েছে, কিন্তু সেই উদ্যোগের ফল কতটা সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আগামী ছয় মাসে সরকারের সামনে তাই শুধু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নয়; বরং জনগণের আস্থা ধরে রাখা, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সামাল দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার চ্যালেঞ্জও থাকবে।
ছয় মাস কোনো সরকারের দীর্ঘ সময় নয়, আবার এতটাও কম নয় যে কোনো মূল্যায়ন করা যাবে না। বিএনপি সরকারের ক্ষেত্রে এই ছয় মাসের সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা হলো—ক্ষমতায় ফেরা যতটা কঠিন ছিল, প্রত্যাশা পূরণ করা তার চেয়েও কঠিন। নির্বাচনী বিজয় সরকারকে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে; এখন সেই বিজয়কে কার্যকর শাসন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ দেওয়াই হবে তারেক রহমান সরকারের পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ