ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবারের সঙ্গে মিলনমেলা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার উচ্ছ্বাস। প্রতি বছর লাখো মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের পথে যাত্রা করেন। ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে তৈরি হয় অতিরিক্ত চাপ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই আনন্দযাত্রা অনেক পরিবারের জন্য পরিণত হয় শোকযাত্রায়। এবারের ঈদুল আজহাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক চিত্র। গত ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ঈদযাত্রায় সারাদেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট ৪৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৮ জন মানুষ। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪০ জন।
এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের গল্প। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফেরা অনেক মানুষ আর কখনো পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারেননি। কারও বাবা হারিয়েছেন সন্তান, কারও সন্তান হারিয়েছে তার অভিভাবক, আবার কোথাও একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশে ঈদকে কেন্দ্র করে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি নতুন নয়। প্রায় প্রতি বছরই ঈদের আগে ও পরে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যায়। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ঈদের সময় যাত্রী পরিবহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেক পরিবহন প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ট্রিপ পরিচালনা করে। চালকদের দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালাতে হয়। ক্লান্তি, ঘুম, অতিরিক্ত গতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। প্রাণহানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো পাওয়া যায়নি। বরং পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৯ শতাংশের সঙ্গে মোটরসাইকেল জড়িত। এই তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তিগত যাতায়াতের সুবিধা, সহজলভ্যতা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল রাইড শেয়ারিং সেবার কারণে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ।
কিন্তু মোটরসাইকেল যত সহজ পরিবহন, ততই ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি কিংবা হেলমেট ব্যবহারে অবহেলা মুহূর্তেই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তরুণ চালকরা গতির রোমাঞ্চে নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করেন। আবার অনেকেই সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই সড়কে নামেন। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ঈদযাত্রায় শুধু মোটরসাইকেল নয়, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, বাস, ব্যাটারিচালিত রিকশা, কার, মাইক্রোবাস, নছিমন-করিমন এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। বিশেষ করে মহাসড়কে ভারী যানবাহনের সঙ্গে ছোট যানবাহনের সংঘর্ষ প্রায়ই ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়। সড়কে শৃঙ্খলার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ চালকের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তবে দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয় না। দেশের অনেক সড়ক এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও গর্ত, কোথাও অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় সড়ক চিহ্নের অভাব রয়েছে। অনেক স্থানে ফুটওভার ব্রিজ বা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় পথচারীরাও দুর্ঘটনার শিকার হন। সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন যতটা জরুরি, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যকর তদারকি।
রেলপথ এবং নৌপথেও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন। যদিও সড়কপথের তুলনায় এ সংখ্যা কম, তবুও প্রতিটি দুর্ঘটনাই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। রেলক্রসিংয়ে অসতর্কতা, অবৈধ পারাপার এবং নৌযানে নিরাপত্তা বিধি না মানা অনেক সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য ঘটনা নয়। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। উন্নত বিশ্বে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর বাস্তবায়ন।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই প্রয়োজন আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অতিরিক্ত গতির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে গণসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে যে সড়কে দায়িত্বশীল আচরণ শুধু নিজের নয়, অন্যের জীবনও রক্ষা করে।
প্রযুক্তির ব্যবহারও দুর্ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সিসিটিভি ক্যামেরা, স্পিড মনিটরিং সিস্টেম, ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশু-কিশোররা ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে সচেতন হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে চালকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রাখা প্রয়োজন।
ঈদের সময় গণপরিবহনে অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। যাত্রী পরিবহনে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করা, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং চালকদের বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। মহাসড়কে জরুরি চিকিৎসা সেবা এবং দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমও প্রাণহানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবছর দুর্ঘটনার পর আমরা শোক প্রকাশ করি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং নতুন করে প্রতিশ্রুতি দিই। কিন্তু কিছুদিন পর সেই আলোচনা আবার হারিয়ে যায়। পরবর্তী ঈদে একই ধরনের দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির খবর আবার সামনে আসে। এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু আলোচনা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ঈদ আনন্দের উৎসব। এটি মানুষের মিলন, ভালোবাসা এবং পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক। কিন্তু সেই আনন্দ যদি বারবার দুর্ঘটনার কারণে বিষাদে পরিণত হয়, তাহলে তা পুরো সমাজের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই অগ্রগতির সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
৪৩৮টি প্রাণহানি আমাদের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, পরিবহন মালিক, চালক, যাত্রী এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। অন্যথায় প্রতি ঈদেই নতুন নতুন পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা বহন করতে হবে।
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রতিটি জীবন মূল্যবান, প্রতিটি পরিবার গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি নিরাপদ যাত্রাই একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ভিত্তি।
আপনার মতামত জানানঃ