গাজায় চলমান যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনিদের জীবনকেই ধ্বংস করছে না, একই সঙ্গে ইসরায়েলি সমাজের ভেতরেও গভীর এক সামাজিক ও মানসিক সংকট তৈরি করছে—এমনটাই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক নানা বিশ্লেষণ ও গবেষণায়। দীর্ঘদিন ধরে দখলদারত্ব, সামরিক আগ্রাসন এবং প্রতিশোধের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ইসরায়েলি রাষ্ট্র এখন সেই সহিংসতার অভিঘাত নিজের সমাজের ভেতরেই অনুভব করতে শুরু করেছে। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি সমাজের বড় একটি অংশ যুদ্ধ ও সামরিক শক্তির প্রতি যে অন্ধ সমর্থন দেখিয়েছে, তা এখন ধীরে ধীরে সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক কঠোরতার রূপ নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বহু বছর ধরেই সামরিকীকরণকে জাতীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়ই জনগণের সামনে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছে যে শক্তি প্রয়োগই সব সমস্যার সমাধান। ফিলিস্তিন প্রশ্ন, সীমান্ত সংকট কিংবা আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব—সব ক্ষেত্রেই সামরিক ক্ষমতাকে প্রধান সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে সমাজের ভেতরে সহিংসতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক এক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। গাজা যুদ্ধ সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা দখলদারত্ব শুধু নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং দখলদার সমাজকেও নৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। ইসরায়েলি দার্শনিক ইয়েশায়াহু লাইবোভিৎজ বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন যে দখলদারত্ব মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে। তাঁর মতে, অন্য একটি জাতিকে দীর্ঘ সময় ধরে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নৈতিক কাঠামোকেও ধ্বংস করে দেয়। আজকের ইসরায়েলি সমাজে ঘটে যাওয়া নানা পরিবর্তন যেন সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মানসিক চাপে ভুগছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা পিটিএসডির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক সেনাসদস্য যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। আত্মহত্যার চেষ্টা, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঘটনাও বাড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই সহিংস সংস্কৃতি এখন পারিবারিক জীবনেও প্রভাব ফেলছে। ইসরায়েলের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। নারী নির্যাতন, গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং নারী হত্যার মতো অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধকালীন মানসিক চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতা পরিবারগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বহু নারী সন্তান জন্মের পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছেন, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসরায়েলে এক ধরনের কঠোর সামরিকতাবাদী মানসিকতা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় কোনো মতপার্থক্য এখন আর দেখা যায় না। সরকার কিংবা বিরোধী দল—উভয় পক্ষই মূলত একই ধরনের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল, সামরিক অভিযান কিংবা আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্নে প্রায় সবাই একই ভাষায় কথা বলছে। ফলে গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘ কয়েক দশকের দখলদার নীতি, যুদ্ধকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং প্রতিনিয়ত সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার ফল। গাজা যুদ্ধ সেই সংকটকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে মাত্র। সমাজের ভেতরে এখন এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতা, ভয় এবং মানসিক অস্থিরতার মধ্যে বসবাস করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কোনো রাষ্ট্র যখন দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ এবং দমননীতিকে রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে, তখন সেই রাষ্ট্রের ভেতরেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে বিভিন্ন উপনিবেশবাদী শক্তির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সমাজে ভাঙন তৈরি হতে থাকে। ইসরায়েলের বর্তমান পরিস্থিতিকেও অনেকে সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
গাজা যুদ্ধের ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিই পরিবর্তিত হচ্ছে না, বরং ইসরায়েলি সমাজের অভ্যন্তরীণ কাঠামোও গভীরভাবে বদলে যাচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিশোধের রাজনীতি দেশটিকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে সহিংসতা এখন আর শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; তা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরেও প্রবেশ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে ইসরায়েল আরও বড় সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। কারণ যুদ্ধের ক্ষত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের চিন্তা, আচরণ এবং সমাজব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। বর্তমানে ইসরায়েলে যে মানসিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত সেই দীর্ঘমেয়াদি সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
গাজাকে ঘিরে সংঘাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যতই রাজনৈতিক ও সামরিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠুক না কেন, এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের ভেতরের পরিবর্তন। যুদ্ধ মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, নৈতিক ও মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর সেই ক্ষয়ের চিহ্ন এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ইসরায়েলি সমাজের ভেতরে।
আপনার মতামত জানানঃ