ফারাক্কা শুধু একটি বাঁধের নাম নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ জলসংকট, নদীভাঙন, কৃষি বিপর্যয় এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার এক গভীর প্রতীক। প্রতি বছরের ১৬ মে এলেই আবার আলোচনায় উঠে আসে এই নাম। কারণ, ১৯৭৬ সালের এই দিনে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী লাখো মানুষ নিয়ে রাজশাহী থেকে ফারাক্কার উদ্দেশে লংমার্চ করেছিলেন। তার কণ্ঠে তখন ছিল একটাই দাবি—বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রায় অর্ধশতক পর দাঁড়িয়ে আজও সেই দাবি পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকট আরও জটিল হয়েছে।
এবারের ফারাক্কা দিবসকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেশি। কারণ, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। অর্থাৎ দুই দেশের সামনে এখন নতুন করে চুক্তি, কূটনীতি এবং ভবিষ্যৎ পানিনিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি বা সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা এখনো চোখে পড়ছে না।
ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৬১ সালে। ভারত সরকার দাবি করেছিল, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা এবং হুগলি নদীর প্রবাহ সচল রাখার জন্যই এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় বাঁধটি। এরপর গঙ্গার পানি ফিডার খালের মাধ্যমে হুগলি নদীতে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপর। কারণ, গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায় থাকা বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহে ভয়াবহ ঘাটতির মুখে পড়ে।
ফারাক্কা চালুর আগে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার গড় প্রবাহ ছিল প্রায় ৬৫ হাজার কিউসেক। বাঁধ চালুর পর কোনো কোনো বছর তা নেমে আসে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার কিউসেকে। নদীর বুক শুকিয়ে যেতে শুরু করে। পদ্মা নদীর বিস্তীর্ণ অংশে জেগে ওঠে চর। যেসব নদীতে একসময় বড় নৌযান চলত, সেখানে মানুষ হেঁটে পারাপার শুরু করে।
এই সংকট শুধু নদীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনজীবনের ওপরও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকেরা এখন আগের মতো সেচ পান না। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতায় থাকা বহু জমিতে পানির অভাবে চাষাবাদ কমে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নেমে গেছে। আগে যেখানে ৮ থেকে ১০ ফুট খনন করলেই পানি পাওয়া যেত, এখন অনেক এলাকায় ৬০ থেকে ১০০ ফুট নিচে নেমে গেছে পানির স্তর।
শুধু কৃষি নয়, পরিবেশগত বিপর্যয়ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি দেশের ভেতরে আরও গভীরে প্রবেশ করছে। সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। সুন্দরী গাছ আগামরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে এই লবণাক্ততা মিলিত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
ফারাক্কা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ নতুন নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৭৭ সালে প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদি পানিবণ্টন চুক্তি হয়। কিন্তু ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কোনো কার্যকর চুক্তি ছিল না। ওই সময়ে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে, যার প্রভাব বাংলাদেশে আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়েছিল। চুক্তিতে বিভিন্ন প্রবাহ পরিস্থিতিতে কীভাবে পানি ভাগ হবে তার একটি সূত্র নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে বহু সময় বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে যে, চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য পানি তারা পায়নি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, নতুন চুক্তি হলে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের স্বার্থ আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার শুধু পানির পরিমাণ নয়, চুক্তি বাস্তবায়নের জবাবদিহির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, কাগজে থাকা চুক্তি বাস্তবে কার্যকর না হলে তার সুফল পাওয়া যায় না।
পানিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন আবেগের জায়গা থেকে বের হয়ে তথ্যভিত্তিক কূটনীতিতে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক নদী আইনের “ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার” নীতিকে সামনে রেখে আলোচনায় যেতে হবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুসমর্থনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, এই কনভেনশন আন্তসীমান্ত নদীতে ভাটির দেশের ন্যায্য হিস্যার পক্ষে আইনি ভিত্তি দেয়।
ফারাক্কা সংকট শুধু বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়, এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক পানিনিরাপত্তার প্রশ্নও। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার সঙ্গে নেপাল, ভুটান ও চীনেরও সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো অববাহিকাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে এনে পানি ব্যবস্থাপনা করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমাধান সম্ভব নয়।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও এমন উদাহরণ রয়েছে। ইউরোপে দানিউব কমিশন, আফ্রিকায় নাইল বেসিন উদ্যোগ কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মেকং রিভার কমিশন দেখিয়েছে, আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। দক্ষিণ এশিয়াতেও সেই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
আপনার মতামত জানানঃ