
গাজার আকাশে যখন যুদ্ধবিমান গর্জে ওঠে, তখন শুধু ভবন ধ্বংস হয় না—ধ্বংস হয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ, একটি মায়ের স্বপ্ন, একটি শিশুর হাসি। যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, এখানে মানুষ শুধু নিহত হয় না; তাদের অস্তিত্বকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান ভয়াবহ পরিস্থিতি আজ সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি, যেখানে নারী ও শিশুদের শুধু যুদ্ধের শিকার নয়, বরং যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
গাজার নারীরা প্রতিদিন যে ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা কল্পনাকেও হার মানায়। তারা ঘর হারিয়েছেন, সন্তান হারিয়েছেন, পরিবার হারিয়েছেন। কিন্তু তাতেও যেন শেষ নয়। তাদের শরীর, মাতৃত্ব, মানসিকতা—সবকিছুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। ভয়ভীতি, নির্যাতন, ধর্ষণ, অপমান, গৃহহীনতা, অনাহার—সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন গাজার নারীরা।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সাল পর্যন্ত গাজায় ২২ হাজারেরও বেশি নারী এবং ১৬ হাজারের বেশি কিশোরী নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪৭ জন নারী ও কিশোরী প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছেন অন্তত দুজন। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন, একটি ভবিষ্যৎ।
যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় তখন, যখন একটি মায়ের চোখের সামনে তার সন্তানকে হত্যা করা হয়। গাজার বহু মা সেই ভয়াবহতার সাক্ষী হয়েছেন। কেউ সন্তানকে কোলে নিয়েই প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ আবার নিজের সন্তানদের মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে। ফিলিস্তিনি শিশু চিকিৎসক ডা. আলা আল-নাজ্জারের ঘটনা আজও বিশ্বকে নাড়া দেয়। তিনি যখন হাসপাতালে আহত মানুষদের চিকিৎসা করছিলেন, তখন বিমান হামলায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনি একসঙ্গে হারান তার নয়টি সন্তানকে।
একজন মা সন্তানের মৃত্যু কীভাবে সহ্য করেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ সন্তান হারানো মানে জীবিত থেকেও প্রতিদিন মৃত্যুর যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো।
গাজার শিশুরাও আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের শিকার। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২৫টি শিশু মারা গেছে। প্রতি ঘণ্টায় একটি শিশু নিহত হয়েছে। এই শিশুদের অনেকেই যুদ্ধ বুঝে ওঠার আগেই মারা গেছে। কেউ স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখার আগেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। কেউ জন্মের পর পৃথিবীকে ভালোভাবে দেখার সুযোগও পায়নি।
যারা বেঁচে আছে, তাদের অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। কারও হাত নেই, কারও পা নেই, কারও চোখ নেই। অসংখ্য শিশু আজ মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত। তারা প্রতিরাতে বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙে। তারা জানে না পরদিন সকালে তারা বেঁচে থাকবে কিনা।
গাজায় শুধু বোমা নয়, ক্ষুধাও আজ একটি ভয়ংকর অস্ত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। অনেক শিশু খাবারের অভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, চোখ দেবে যাচ্ছে, অথচ চিকিৎসা নেই, ওষুধ নেই, খাবার নেই। যুদ্ধ যেন শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না; ধীরে ধীরে তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার গর্ভবতী নারীরা। হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। অনেক নারী রাস্তার পাশে, তাঁবুর ভেতরে বা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিজারিয়ান অপারেশন পর্যন্ত করা হচ্ছে অ্যানেসথেসিয়া ছাড়া। কল্পনা করা যায়, একজন মা কী ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন!
আগে গাজায় মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রতি এক লাখে ৩০ জন। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪৮-এ। অর্থাৎ পরিস্থিতি ৩১ গুণেরও বেশি ভয়াবহ হয়েছে। অপুষ্টি, চিকিৎসার অভাব, নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে গর্ভপাতের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বলা হচ্ছে, গর্ভপাতের হার প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধের মাঝেও নারীরা থেমে নেই। তারা সন্তানদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, অসুস্থদের সেবা করছেন, তাঁবুতে শিশুদের পড়াচ্ছেন, প্রতিবেশীদের খাবার জোগাড় করছেন। অনেক নারী স্বামী হারিয়ে পুরো পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। গাজার ৫৮ হাজারের বেশি পরিবার এখন নারীপ্রধান।
কিন্তু এই সংগ্রামের মাঝেও তাদের জন্য নিরাপদ কোনো জায়গা নেই। এমনকি কারাগারও হয়ে উঠেছে নির্যাতনের আরেকটি কেন্দ্র। শত শত ফিলিস্তিনি নারীকে আটক করা হয়েছে। অনেককে অভিযোগ ছাড়াই বন্দি রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের ওপর চালানো হচ্ছে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। জোরপূর্বক কাপড় খুলতে বাধ্য করা, মারধর, চিকিৎসা না দেওয়া, অনাহারে রাখা—এসব অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে।
অনেক নারীকে পরিবারের সদস্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য “জিম্মি” হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ নারীরা এখানে শুধু যুদ্ধের শিকার নন; তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে মানসিক চাপ ও ভয় সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে।
আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো, গাজার প্রজনন স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ফার্টিলিটি ক্লিনিক ধ্বংসের ফলে হাজার হাজার ভ্রূণ, শুক্রাণু ও ডিম্বাণু নষ্ট হয়ে গেছে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে থামিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গাজার নারী সাংবাদিকদের অবস্থাও ভয়াবহ। যারা যুদ্ধের সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, তারাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। বহু নারী সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সত্য বলা যেন আজ সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুধু মানুষ হত্যা করে না; এটি মানুষের ভেতরের মানবিকতাকেও ধ্বংস করে দেয়। গাজার শিশুরা আজ খেলনা চেনে না, তারা চেনে বিস্ফোরণের শব্দ। গাজার মায়েরা লোরি গেয়ে সন্তান ঘুম পাড়াতে পারেন না; তারা আতঙ্কে রাত কাটান। প্রতিটি সকাল তাদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা নিয়ে আসে।
বিশ্ব যখন আধুনিক সভ্যতার কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে, তখন গাজার বাস্তবতা যেন সেই সভ্যতার মুখে এক ভয়ংকর প্রশ্নচিহ্ন। একটি জাতির নারী ও শিশুদের এভাবে ধ্বংস হতে দেখেও যদি পৃথিবী নীরব থাকে, তবে মানবতার দাবি কতটা সত্য?
আজ গাজার নারীরা শুধু নিজেদের জন্য লড়ছেন না; তারা লড়ছেন অস্তিত্বের জন্য। তারা ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সন্তানকে বাঁচাতে চান, ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে চান। আর সেই কারণেই হয়তো তারা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।
যুদ্ধের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য হলো, এখানে কোনো বিজয় নেই। এখানে শুধু মৃত্যু, কান্না আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের স্তূপ। একটি শিশুর মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান হতে পারে না। একটি মায়ের কান্না কোনো রাজনৈতিক হিসাবের অংশ হতে পারে না।
গাজার এই মানবিক বিপর্যয় আজ শুধু একটি অঞ্চলের সংকট নয়; এটি সমগ্র মানবতার বিবেকের পরীক্ষা। প্রশ্ন একটাই—আর কত মৃত্যু, আর কত অনাহার, আর কত শিশুর রক্ত ঝরলে পৃথিবী সত্যিই থামবে?
আপনার মতামত জানানঃ