মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন যুদ্ধবিমান উড়ে, তখন শুধু বিস্ফোরণের শব্দই শোনা যায় না—সেই শব্দে কেঁপে ওঠে বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের গল্প নয়; এটি ধীরে ধীরে বিশ্বব্যবস্থার শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো এক সংকটে পরিণত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক ছিল, নাকি এটি তাদের আরেকটি কৌশলগত ভুলের উদাহরণ হয়ে থাকবে?
যুদ্ধের শুরুতে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা ছিল দ্রুত, নির্ভুল এবং ভয়াবহ আঘাতের মাধ্যমে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে ফেলা। ধারণা ছিল, ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে, বিপ্লবী গার্ডের নেতৃত্ব ধসে যাবে এবং দেশের ভেতরে এমন এক অস্থিরতা তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদের নেতৃত্বও একই বিশ্বাসে যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহ দিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে একটি “শিরশ্ছেদ অভিযান” দ্রুত ফল এনে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা পরিকল্পনার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগিয়েছে।
ওয়াশিংটন হয়তো ভেবেছিল, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও গোপন অভিযান, অভ্যন্তরীণ চাপ এবং বিমান হামলার সমন্বয়ে সরকারকে দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু ইরান কোনো সাধারণ রাষ্ট্র নয়। হাজার বছরের ইতিহাস, গভীর জাতীয়তাবোধ, শক্তিশালী সামরিক কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে থাকার অভিজ্ঞতা দেশটিকে অন্যরকম স্থিতিশীলতা দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি; বরং দেশটির অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও দৃঢ় হয়েছে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আরও সক্রিয় হয়েছে, ধর্মীয় নেতৃত্ব একত্র হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মনোভাব শক্তিশালী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত আত্মসমর্পণ, কিন্তু ইরান দেখিয়েছে—তারা দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।
এই যুদ্ধের আরেকটি বড় দিক হলো প্রযুক্তিগত বাস্তবতা। আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল উন্নত বিমানবাহী রণতরী কিংবা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান দিয়ে জেতা যায় না। তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাইবার প্রযুক্তি বড় শক্তিগুলোকেও বিপদে ফেলতে পারে। ইরান ঠিক সেই জায়গাতেই নিজেদের শক্তি তৈরি করেছে।
বিশ্ব এখন দেখছে, কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ ডলারের ড্রোন দিয়ে কীভাবে কোটি কোটি ডলারের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেখানে একটি ড্রোন ঠেকাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, সেখানে ইরান কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারছে। অর্থনৈতিকভাবে এটি আমেরিকার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত। জ্বালানি সংকট শুধু অর্থনীতিকেই নয়, খাদ্যব্যবস্থা, শিল্প ও পরিবহনকেও প্রভাবিত করে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেল ও গ্যাস স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা হতে পারে। সেক্ষেত্রে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্ব দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও এখন সরাসরি সংঘাতের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।
এই যুদ্ধ আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে—বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য আগের মতো শক্তিশালী নেই। একসময় আমেরিকার সামরিক শক্তি মানেই ছিল দ্রুত জয়। কিন্তু আফগানিস্তান, ইরাকের পর ইরান পরিস্থিতিও দেখাচ্ছে, আধুনিক বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তারা নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সক্ষমতা তৈরি করেছে। দীর্ঘ চাপের মধ্যেও তাদের এই অগ্রগতি অনেকের কাছে বিস্ময়কর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক জোটের পরিবর্তন। ইরান এখন একা নয়। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক গভীর। যদিও এই দুই দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক প্রভাব কমিয়ে আনতে আগ্রহী। ফলে ইরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই যুদ্ধের রাজনৈতিক দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও প্রশ্ন উঠছে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল? সমালোচকেরা বলছেন, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত খুব সীমিত একটি গোষ্ঠীর মধ্যে নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে যথেষ্ট বিশ্লেষণ বা বিকল্প মতামতের সুযোগ ছিল না। জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
একসময় যেভাবে “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ” যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছিল, অনেকেই এখন আশঙ্কা করছেন—ইরান যুদ্ধও তেমন এক দীর্ঘমেয়াদি ফাঁদে পরিণত হতে পারে। কারণ ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক কাঠামো এমন যে, দ্রুত জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই যুদ্ধ জটিল। তেল আবিব মনে করে, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও পারমাণবিক সক্ষমতা তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই তারা চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে নিয়ে ইরানকে দুর্বল করতে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ইসরায়েলও বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ইরান এখন নিজেদের “প্রতিরোধের প্রতীক” হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় বলা হচ্ছে, তারা পশ্চিমা চাপের সামনে মাথা নত করেনি। এই বার্তা শুধু ইরানের জনগণের জন্য নয়; পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকাবিরোধী মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করার জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। মধ্যপ্রাচ্যের লাখো মানুষ নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, শ্রমবাজার—সবকিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ যুদ্ধ বাড়লে অর্থনৈতিক ধাক্কা সবচেয়ে আগে আঘাত হানে শ্রমজীবী মানুষদের ওপর।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার অস্থির হলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়তে পারে।
যুদ্ধের ভেতরেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—কূটনীতির বিকল্প এখনো নেই। সামরিক শক্তি হয়তো ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বাইরের শক্তি দিয়ে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আরও বড় অস্থিরতা তৈরি করে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পথ খুঁজবে। হয়তো সেটিকে তারা কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবে, কিন্তু বাস্তবে সেটি হবে সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি। কারণ এই যুদ্ধ দেখিয়েছে, বিশ্ব এখন আগের মতো একমেরুকেন্দ্রিক নয়।
ইরানও জানে, দীর্ঘ যুদ্ধ তাদের জন্যও ক্ষতিকর। তাই তারা সম্ভবত সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়, বরং কৌশলগত চাপ বজায় রেখে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইবে। রাশিয়া ও চীনও মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের অস্থিতিশীলতা চায় না। ফলে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলই হয়তো একমাত্র বাস্তব পথ হয়ে উঠবে।
তবু প্রশ্ন রয়ে যায়—যে যুদ্ধ শুরু হলো এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে, সেটি কি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক সময় সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিও ভুল হিসাবের কারণে দীর্ঘ সংকটে পড়ে যায়। ইরান যুদ্ধ সেই তালিকায় নতুন অধ্যায় যোগ করবে কিনা, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে।
আপনার মতামত জানানঃ