
ভারতের বিহারের আরারিয়া জেলার কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিস্মতি বারবার নিজের ওড়নার কোণা দিয়ে চোখ মুছছিলেন। জীবনে কখনো জেলার বাইরে না যাওয়া এই নারীকে হঠাৎ করেই ছুটতে হয়েছিল প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরের মধ্যপ্রদেশের কাটনি শহরে। কারণ, তার দুই ছেলে ও এক নাতিকে ট্রেন থেকে নামিয়ে আটক করেছিল পুলিশ। তারা যাচ্ছিল মহারাষ্ট্রের একটি মাদ্রাসায় পড়তে। কিন্তু যাত্রাপথেই তাদের ঘিরে তৈরি হয় মানব পাচারের সন্দেহ, শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ, আর কয়েকশ’ কিলোমিটার দূরের গ্রামগুলোতে নেমে আসে উৎকণ্ঠা, কান্না আর আতঙ্ক।
১১ই এপ্রিল সকালে বিহারের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৬৩ জন শিশু-কিশোর এবং আটজন শিক্ষক পাটনা-পুনে এক্সপ্রেসে চড়ে মহারাষ্ট্রের লাতুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। তাদের অধিকাংশই বিহারের আরারিয়া জেলার দরিদ্র মুসলিম পরিবার থেকে আসা। ট্রেনটি মধ্যপ্রদেশের কাটনি স্টেশনে পৌঁছানোর পর শিশু কল্যাণ কমিটির এক সদস্যের অভিযোগের ভিত্তিতে জিআরপি ও আরপিএফ তাদের নামিয়ে নেয়। অভিযোগ ছিল, শিশুদের কাজ করানোর জন্য অন্য রাজ্যে পাচার করা হচ্ছে।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। পরিবারগুলো কয়েকদিন ধরে সন্তানদের কোনো খোঁজ পায়নি। কেউ ধার করে, কেউ গরু বিক্রি করে, কেউ আত্মীয়স্বজনের সাহায্য নিয়ে কাটনির উদ্দেশ্যে ছুটে যায়। কিস্মতি বলছিলেন, ফোনে যখন জানতে পারেন তার সন্তানদের পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, তখন তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি বলছিলেন, “আমার ছেলেরা হাফেজ হওয়ার জন্য যাচ্ছিল। ওরা দুই বছর ধরে পড়ছে। আমি শুধু ওদের সঙ্গে একবার দেখা করতে চেয়েছিলাম।”
আরারিয়া, কিষাণগঞ্জ, কাটিহার কিংবা পূর্ণিয়ার মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এই দৃশ্য নতুন নয়। প্রতি বছর ঈদের ছুটির পর শত শত শিশু বিভিন্ন রাজ্যের মাদ্রাসায় ফিরে যায়। অনেক পরিবারই বিশ্বাস করে, স্থানীয়ভাবে যেসব সুযোগ নেই, সেসব সুযোগ সন্তানরা বাইরে গিয়ে পেতে পারে। বিশেষ করে আবাসিক সুবিধাসহ মাদ্রাসাগুলো দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য একধরনের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিহারের এই অঞ্চলগুলো ভারতের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোর মধ্যে পড়ে। নীতি আয়োগ যেসব জেলাকে “আকাঙ্ক্ষামূলক জেলা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে রয়েছে আরারিয়া, পূর্ণিয়া ও কাটিহার। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এগুলো পিছিয়ে। এখানে অসংখ্য পরিবার দিনমজুরি, কৃষিশ্রম বা ছোটখাটো কাজের ওপর নির্ভরশীল। সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর সামর্থ্য নেই অধিকাংশেরই। সরকারি স্কুলে পড়ালেখার মান নিয়ে আস্থাহীনতা রয়েছে। ফলে অনেকেই মাদ্রাসাকেই একমাত্র ভরসা মনে করেন।
এই শিশুদের অনেকেই প্রথমবারের মতো এত দূরের যাত্রায় বের হয়েছিল। তাদের কারও বয়স ছয়, কারও দশ, কারও বা চৌদ্দ। পরিবারগুলো বলছে, শিশুদের সঙ্গে আধার কার্ড, পঞ্চায়েত প্রধানের প্রত্যয়নপত্র, এমনকি মাদ্রাসার অনুমোদনপত্রও ছিল। কিন্তু কাটনিতে পৌঁছানোর পর সেসব কাগজপত্রও তাদের রক্ষা করতে পারেনি।
মোহাম্মদ চুন্নি নামের এক কিশোর বলছিল, মুঘলসরাই স্টেশনে প্রথম তাদের থামানো হয়েছিল। তখন শিক্ষকরা সব নথি দেখালে যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু কাটনিতে আর সেই সুযোগ মেলেনি। শিশুদের একটি ছোট আবাসে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের দিন কাটে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। কেউ পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি, কেউ বুঝতেই পারেনি কেন তাদের অপরাধীর মতো আটকে রাখা হয়েছে।
অভিযোগকারী দুর্গেশ মারিয়া অবশ্য বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তার দাবি, শুরুতে তথ্য এসেছিল যে শিশুদের শ্রমের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। পরে যদিও মানব পাচারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি, তবুও এত অল্প বয়সী শিশুদের দূরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তার কাছে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে।
তবে পরিবারগুলো এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছে, শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাও দেওয়ার জন্যই মহারাষ্ট্রের মাদ্রাসায় পাঠানো হচ্ছিল। লাতুরের ‘আশরাফিয়া আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া’ মাদ্রাসার পরিচালক আজিজুর রহমান দাবি করেছেন, সেখানে ইংরেজি, অঙ্ক, মারাঠি এবং কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। বহু বছর ধরেই বিহার থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়ে আসছে।
এই ঘটনার পর বিহারের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক অভিভাবক বলছেন, তারা এখন আর সন্তানদের বাইরে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, পথে যদি আবার আটকানো হয়? যদি সন্তানদের দিন-দিন আটকে রাখা হয়? যদি তাদের অপরাধীর মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়?
কিশোওয়ার জাহান নামের এক নারী বলছিলেন, তার স্বামী মারা গেছেন। ছয় সন্তানকে নিয়ে তিনি খুব কষ্টে সংসার চালান। তার ছেলে ইরফানকে তিনি মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছিলেন শুধুমাত্র এই আশায় যে অন্তত পড়াশোনা শিখে মানুষ হতে পারবে। তিনি বলছিলেন, “আমাদের যদি টাকা থাকত, তাহলে কি আমরা সন্তানকে এত দূরে পাঠাতাম? সরকার যদি এখানে ভালো স্কুল বা মাদ্রাসা বানাত, তাহলে আমাদের বাচ্চারা বাইরে যেত কেন?”
এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে। কেন এত শিশু নিজ রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে যাচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসে দারিদ্র্য, শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং আবাসিক প্রতিষ্ঠানের অভাবের কথা। বিহারে তিন হাজারের বেশি মাদ্রাসা থাকলেও অধিকাংশই অনাবাসিক। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সন্তানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক বা ওড়িশার কিছু মাদ্রাসা বিনামূল্যে আবাসন ও শিক্ষা দেয়। তাই বহু পরিবার বাধ্য হয় সন্তানদের বহু দূরে পাঠাতে।
এই ঘটনার আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে—সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশানা করার অভিযোগ। স্থানীয় সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, মুসলিম পরিচয়ের কারণেই শিশুদের প্রতি সন্দেহ করা হয়েছে। দাড়ি, টুপি, মাদ্রাসা—এসব শব্দ এখন অনেক জায়গায় নিরাপত্তা ও সন্দেহের আলোচনার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাটনিতে দায়ের হওয়া মামলাটি শিশু মানব পাচার আইনের আওতায় করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, অধিকাংশ অভিভাবকই নিজের সম্মতিতে সন্তানদের পাঠিয়েছেন। তাদের কাছে টিকিট ছিল, পরিচয়পত্র ছিল, এমনকি গন্তব্য মাদ্রাসার নথিও ছিল। এরপরও প্রায় দুই সপ্তাহ শিশুদের আটকে রাখা হয়।
শুধু মধ্যপ্রদেশেই নয়, ওড়িশার কটকেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সেখানে ৫৯ জন নাবালককে ট্রেন থেকে নামিয়ে আটকে রাখা হয়। তারাও মাদ্রাসায় পড়তে যাচ্ছিল। পরিবারগুলোর অভিযোগ, প্রশাসন শিশু সুরক্ষার কথা বললেও বাস্তবে তারা ভয়, অপমান এবং মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছে।
সাবরিন নামের এক মা বলছিলেন, তার সন্তান গ্রামের একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ত। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তিনি তাকে ওড়িশার মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু কটক স্টেশনেই তাকে আটকানো হয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আধার কার্ড, ট্রান্সফার সার্টিফিকেট এবং স্থানীয় প্রত্যয়নপত্র থাকার পরও কেন শিশুদের অপরাধীর মতো আচরণ করা হলো?
এই ঘটনাগুলো ভারতজুড়ে মাদ্রাসা শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রশাসন বলছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের দায়িত্ব। কিন্তু অভিভাবকরা বলছেন, তাদের সন্তানদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা ছিল অপমানজনক এবং অমানবিক।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শিশুদের মনে। অনেকেই এখন ভয় পাচ্ছে। কেউ আর বাইরে যেতে চায় না। কেউ ট্রেন দেখলেই আতঙ্কিত হচ্ছে। ইরফান বলছিল, “যদি বাইরে যেতে না দেয়, তাহলে এখানে স্কুল বানিয়ে দিক।”
তার এই সরল কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে পুরো সংকটের সারাংশ। যেখানে শিক্ষা পাওয়ার জন্য দরিদ্র পরিবারগুলোকে সন্তানদের শত শত কিলোমিটার দূরে পাঠাতে হয়, সেখানে একটি ট্রেনযাত্রা শুধু যাত্রা থাকে না—তা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার লড়াই, ভবিষ্যতের আশা, আর কখনো কখনো রাষ্ট্রের সন্দেহের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এক কঠিন অভিজ্ঞতা।
আপনার মতামত জানানঃ