বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং মানবিক সক্ষমতার প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ডিভাইস, অনলাইন শিক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর বিস্তার; অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে মনোযোগের সংকট, পাঠ্যবই থেকে দূরত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিনির্ভরতা এবং চিন্তাশক্তির ক্রমাগত অবক্ষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এখন আগের মতো বই হাতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় কাটাতে দেখা যায় না। পাঠাগারের নীরবতা অনেক ক্ষেত্রে স্থান ছেড়ে দিয়েছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, শর্ট ভিডিওর আকর্ষণে এবং ভার্চ্যুয়াল জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায়। এই পরিবর্তন কেবল প্রজন্মগত রুচির পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগেরও কারণ।
একসময় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মুক্তচিন্তা, গবেষণা, বিতর্ক এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে কাটাত, নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করত এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখত। শিক্ষা তখন শুধু পরীক্ষায় পাস করার মাধ্যম ছিল না; বরং ছিল ব্যক্তিত্ব গঠন ও চিন্তার বিকাশের একটি প্রক্রিয়া। বর্তমানে সেই চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই বদলে গেছে। এখন অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন মানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা, ছবি আপলোড করা, ভিডিও তৈরি করা কিংবা অনলাইন পরিচিতি বৃদ্ধি করা। কে কত বই পড়েছে, তার চেয়ে অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায় কার কত ফলোয়ার আছে কিংবা কোন পোস্টে কত লাইক এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্রভাব কেবল আচরণগত পরিবর্তন তৈরি করছে না; এটি মানুষের মনোযোগের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের মনোযোগ একটি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে ব্যবহারকারী দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকে। অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ বিশ্লেষণ করে একের পর এক আকর্ষণীয় কনটেন্ট দেখাতে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্রুত উত্তেজনা পাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়া, গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করা বা জটিল বিষয় নিয়ে চিন্তা করা তখন ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
আজকের অনেক শিক্ষার্থী কয়েক মিনিটের বেশি একটি দীর্ঘ লেখা পড়তে অস্বস্তি অনুভব করে। তারা দ্রুত তথ্য গ্রহণে অভ্যস্ত, কিন্তু গভীরভাবে বুঝতে বা বিশ্লেষণ করতে আগ্রহী নয়। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এমন একটি প্রজন্ম, যারা তথ্যের ভাণ্ডারে প্রবেশ করতে পারছে, কিন্তু জ্ঞানের গভীরে পৌঁছাতে পারছে না। তারা অনেক কিছু জানে বলে মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জ্ঞান থাকে বিচ্ছিন্ন তথ্যের সমষ্টি মাত্র।
পাঠ্যবই থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পুরো সেমিস্টার পার করে দেয় একটি মূল বই সম্পূর্ণ না পড়েই। পরীক্ষার আগে সাজেশন, শর্ট নোট, পিডিএফ কিংবা ইউটিউব ভিডিওর ওপর নির্ভর করে তারা প্রস্তুতি নেয়। বই পড়াকে তারা সময়সাপেক্ষ ও কঠিন কাজ মনে করে। অথচ বই শুধু তথ্য দেয় না; এটি মানুষের ধৈর্য, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং কল্পনাশক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানো মানে একটি চিন্তার জগতে প্রবেশ করা। যখন শিক্ষার্থীরা সেই অভ্যাস হারিয়ে ফেলে, তখন তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।
এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন এক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। এআই নিঃসন্দেহে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। এটি গবেষণা সহজ করছে, তথ্য বিশ্লেষণ দ্রুত করছে এবং শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য করে তুলছে। কিন্তু এর ব্যবহার যদি চিন্তার বিকল্প হিসেবে শুরু হয়, তাহলে তা শিক্ষার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী অ্যাসাইনমেন্ট, রিপোর্ট কিংবা প্রজেক্টের ক্ষেত্রে নিজে চিন্তা না করে সরাসরি এআই-নির্ভর উত্তর ব্যবহার করছে। অনেক সময় তারা সেই উত্তর যাচাইও করে না।
ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন, ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। মানুষ যত বেশি নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে, তার চিন্তাশক্তি তত বেশি বিকশিত হয়। বিপরীতে, যদি প্রতিটি সমস্যার সমাধান অন্য কোনো প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থী এখন ‘কীভাবে চিন্তা করতে হয়’ তার চেয়ে ‘কীভাবে দ্রুত উত্তর পাওয়া যায়’ সেটি বেশি শিখছে।
ক্যাম্পাস সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন স্পষ্ট। বর্তমান সময়ে বিনোদন, সামাজিকতা এবং তাত্ক্ষণিক আনন্দ অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত আড্ডা, অনুষ্ঠান, ট্যুর, পার্টি কিংবা অনলাইন উপস্থিতির মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যেন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইতিহাসে যেসব ব্যক্তি সমাজে বড় অবদান রেখেছেন, তাঁদের অধিকাংশের জীবন ছিল দীর্ঘ অধ্যবসায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের উদাহরণ।
আজকের তরুণদের একটি অংশ দ্রুত সাফল্যের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে অনাগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাফল্যের ঝলক দেখে তারা মনে করে সফলতা যেন সহজেই অর্জন করা যায়। কিন্তু বাস্তবে বড় অর্জনের পেছনে থাকে বছরের পর বছর পরিশ্রম, ব্যর্থতা এবং ধৈর্য। এই সত্যটি অনেক সময় ভার্চ্যুয়াল জগতের চমকের আড়ালে হারিয়ে যায়।
মনোযোগের সংকটকে অনেক বিশেষজ্ঞ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করেন। মানুষের মস্তিষ্ক প্রকৃত অর্থে মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য তৈরি নয়। যখন একজন শিক্ষার্থী একসঙ্গে ভিডিও দেখে, চ্যাট করে, গান শোনে এবং পড়াশোনা করার চেষ্টা করে, তখন তার মনোযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হয়। এর ফলে শেখার গুণগত মান কমে যায় এবং তথ্য দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রবণতা ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী দিনের বিশ্বে শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং উদ্ভাবনী দক্ষতা। যদি শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে চিন্তা করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলে, তাহলে তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে ঠিকই, কিন্তু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারবে না। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি বড় ঝুঁকি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় এখন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের চেয়ে ডিগ্রি অর্জনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শেখার চেয়ে সিজিপিএ অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং মৌলিক জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে দ্রুত পাস করার প্রবণতা গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এমন একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, কিন্তু স্বাধীনভাবে নতুন ধারণা তৈরি করতে পারবে না। তারা এআই দিয়ে রিপোর্ট লিখতে পারবে, কিন্তু নিজে গবেষণা করতে পারবে না; তারা তথ্য খুঁজে পাবে, কিন্তু সেই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশ প্রযুক্তির ভোক্তা হিসেবে টিকে থাকতে পারলেও প্রযুক্তির উদ্ভাবক হিসেবে এগিয়ে যেতে পারবে না।
তবে এই সংকটের সমাধান প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শত্রু হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং ডিজিটাল শৃঙ্খলা। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কখন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে এবং কখন নিজের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পাঠাভ্যাস, গবেষণা, মৌলিক চিন্তা এবং বিশ্লেষণী দক্ষতার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এমন মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শুধু তথ্য মুখস্থ করলেই চলবে না; বরং চিন্তার গভীরতাও মূল্যায়িত হবে।
পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে শুধুমাত্র একটি ডিভাইস হাতে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করা, আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া এবং কৌতূহলকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তরুণদেরও বুঝতে হবে যে প্রযুক্তি একটি সহায়ক যন্ত্র, মানুষের বিকল্প নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত উত্তর দিতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো স্বপ্ন দেখতে পারে না; তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে না; নির্দেশনা দিতে পারে, কিন্তু জীবনের অর্থ খুঁজে দিতে পারে না।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তারা আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, বেশি সংযুক্ত এবং বেশি সুযোগপ্রাপ্ত। কিন্তু সেই সুযোগকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন মনোযোগ, অধ্যবসায়, পাঠাভ্যাস এবং মৌলিক চিন্তার সংস্কৃতি। অন্যথায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যেও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; সেটি পরিমাপ করা হয় তার মানুষের চিন্তার গভীরতা, সৃজনশীলতা এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা সফলভাবে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মননশীলতা, অধ্যয়ন এবং স্বাধীন চিন্তার সংস্কৃতি পুনর্গঠন করতে পারি তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ