বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের মুহূর্তে নয়াদিল্লির দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে ঢাকার দিকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় দেওয়া এক অভিনন্দনবার্তায় বিএনপির নেতা তারেক রহমান-কে শুভেচ্ছা জানিয়ে ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বার্তার ভাষা ছিল উষ্ণ কিন্তু সতর্ক—যেন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা আছে, তবে তা সহজ হবে না।
গত কয়েক বছরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও ঘনীভূত হয়। বাংলাদেশের ভেতরে একটি শক্তিশালী ধারণা তৈরি হয় যে দিল্লি দীর্ঘ সময় ধরে হাসিনার সরকারকে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। সেই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয় সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন বিরোধ, বাণিজ্য বৈষম্য এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কিছু উসকানিমূলক মন্তব্য। ভিসা পরিষেবা সীমিত হয়ে আসে, আন্তসীমান্ত বাস-ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়, এমনকি ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইটও কমে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির বিজয় দিল্লির জন্য একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ। ভারতের কূটনৈতিক মহলে বিএনপি কোনো অপরিচিত শক্তি নয়। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া-র নেতৃত্বে বিএনপি যখন সরকার গঠন করেছিল এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র সঙ্গে জোট করেছিল, তখন দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। দিল্লির মনে সন্দেহ জন্মায়, ঢাকা কি কৌশলগতভাবে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকছে? সেই সময়ের ‘১০ ট্রাক অস্ত্র’ কাণ্ড এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রশ্ন আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দিল্লি পেয়েছিল তার কাঙ্ক্ষিত অনেক কিছু—নিরাপত্তা সহযোগিতা, উত্তর-পূর্বে সন্ত্রাস দমন, উন্নত কানেক্টিভিটি এবং আঞ্চলিক কৌশলগত সমন্বয়। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। অনেকের চোখে ভারত হয়ে ওঠে একপাক্ষিক সুবিধাভোগী, আর বাংলাদেশ যেন সমান মর্যাদা পাচ্ছে না—এমন ধারণা বিস্তার লাভ করে।
এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত কীভাবে সম্পর্ক গড়বে? দিল্লির সামনে কয়েকটি স্পর্শকাতর ইস্যু রয়েছে। প্রথমত, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে ভোলা ও যশোরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ দিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উষ্ণতা। হাসিনার পতনের পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক দ্রুত গতিতে এগিয়েছে—ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের সফর হয়েছে, বাণিজ্য বেড়েছে।
দিল্লিভিত্তিক বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়েকের মতে, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অধিকার রয়েছে। অস্বাভাবিক ছিল হাসিনা আমলে প্রায় সম্পূর্ণ যোগাযোগহীনতা। তবে ঝুঁকি হলো—পেন্ডুলাম কি এবার অতিরিক্ত অন্যদিকে হেলে পড়বে? এই আশঙ্কা দিল্লিতে রয়েছে।
এদিকে তারেক রহমান সাম্প্রতিক এক সমাবেশে বলেছেন, ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়—বাংলাদেশ সবার আগে।’ এই বক্তব্যে তিনি দিল্লি ও রাওয়ালপিন্ডি—দুই শক্তির প্রতিই দূরত্বের বার্তা দিয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান—দেশীয় ভোটারদের কাছে জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার, আর আন্তর্জাতিক মহলে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও ভারত ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গভীরভাবে সংযুক্ত। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত, নদী-নালা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, পারিবারিক সম্পর্ক—এসবকে উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নীতি নিতে পারে না। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, আর ভারত এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট, সমুদ্রবন্দর ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো দুই দেশের সম্পর্কের মেরুদণ্ড। যৌথ সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ-টহল, বার্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপ—এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ভারতের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণসুবিধাও কার্যকর রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি এই সহযোগিতা পুরোপুরি ভেঙে দেবে না। কারণ এটি কেবল ভারতের স্বার্থ নয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সবচেয়ে জটিল ইস্যু সম্ভবত শেখ হাসিনার অবস্থান। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং ২০২৪ সালের সহিংসতার ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ চায়, দিল্লির সামনে কঠিন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত আসবে। আবার বাংলাদেশের ভেতরে বিরোধী দলগুলোও এই ইস্যুকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ফলে এটি হবে দুই দেশের সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরীক্ষার ক্ষেত্র।
দিল্লির জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো বাগাড়ম্বর। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল বা রাজনীতিবিদদের উসকানিমূলক মন্তব্য বাংলাদেশে জনমতকে দ্রুত প্রভাবিত করে। একইভাবে বাংলাদেশি রাজনৈতিক বক্তব্যও দিল্লিতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়ালের ভাষায়, যদি দুই পক্ষই নিজেদের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে সম্পর্ক ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র মধ্যে আটকে থাকতে পারে—সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু আস্থা সীমিত।
অন্যদিকে ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই প্রথম উদ্যোগ নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে; এখন সময় আস্থা পুনর্গঠনের। দিল্লি যদি বাস্তববাদী ও সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করে এগোয়, তবে বিএনপি নেতৃত্বও ইতিবাচক সাড়া দিতে পারে।
বিএনপির জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে ভারসাম্য রক্ষা। একদিকে জাতীয়তাবাদী ভোটব্যাংক, অন্যদিকে আঞ্চলিক বাস্তবতা। ভারতবিরোধী আবেগকে পুরোপুরি উসকে দিলে স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার অতিরিক্ত নরম অবস্থান নিলে বিরোধীরা ‘আত্মসমর্পণ’ অভিযোগ তুলতে পারে। ফলে কৌশলী, ধাপে ধাপে আস্থা তৈরির পথই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ এখন উভয় পক্ষের সামনে। অতীতের অবিশ্বাস ইতিহাসের অংশ; কিন্তু বর্তমান ভূরাজনীতি আরও জটিল। চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, আঞ্চলিক সংযোগ—এসবের মাঝে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে। দিল্লি যদি সতর্কতার বদলে আত্মবিশ্বাস বেছে নেয় এবং ঢাকা যদি আবেগের বদলে বাস্তববাদে ভর করে, তবে নতুন অধ্যায় শুরু হওয়া অসম্ভব নয়।
প্রশ্ন একটাই—প্রথম দৃঢ় ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপটি কে নেবে, আর কত দ্রুত?
আপনার মতামত জানানঃ