বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধু নির্বাচনী ফলাফলের অঙ্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; ব্যাখ্যা করতে হয় ইতিহাস, আদর্শ, সামাজিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দীর্ঘ পথরেখা ধরে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তেমনই এক মোড়। স্বাধীনতার বিরোধিতার অভিযোগ বহন করা একটি দল—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—প্রথমবারের মতো এককভাবে ৬৮টি আসন জিতে সংসদের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে। তাদের নেতৃত্বে জোট পেয়েছে মোট ৭৭টি আসন। স্বাধীনতার পর বহুবার নিষিদ্ধ হওয়া, যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে চরম সংকটে পড়া এবং নিবন্ধন হারানো একটি দলের জন্য এই অর্জন নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।
দলটির বর্তমান আমির শফিকুর রহমান নিজ আসনে জয়ী হয়েছেন এবং রাজধানী ঢাকায় পাঁচটি আসনে বিজয় দলটির রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ঢাকার মতো প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জয় শুধু আসনসংখ্যা বাড়ায় না, বরং গ্রহণযোগ্যতার এক নতুন বার্তা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক শক্তি, দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেটওয়ার্ক, অনলাইন প্রচার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর বিভক্ত অবস্থান—সব মিলিয়েই এই ফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তবে এই সাফল্য বোঝার জন্য পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। জামায়াতের ইতিহাস শুরু ব্রিটিশ ভারতেই। ১৯৪১ সালের ২৬শে আগস্ট লাহোরে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ প্রতিষ্ঠা করেন। দেশভাগের পর সংগঠনটি পাকিস্তানে কার্যক্রম চালায় এবং পূর্ব পাকিস্তানেও শাখা গড়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটি অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দলটির শীর্ষ নেতারা পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনা ও বিচারের মুখোমুখি হন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে জামায়াত কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। দলটির বহু নেতা অন্য দলে যোগ দেন বা আড়ালে সক্রিয় থাকেন। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে যায়। ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি এ. এস. এম. সায়েম ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে জামায়াত নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। প্রথমে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামের প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হয়ে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়।
১৯৭৯ সালেই জামায়াতে ইসলামী নামে প্রকাশ্যে কনভেনশন করে দলটি নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির ছিলেন গোলাম আযম। তিনি ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে দেশে ফিরে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে দলটির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নাগরিকত্ব প্রশ্নে আইনি লড়াই, গ্রেফতার ও গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন বিতর্কে ঘেরা ছিল।
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে সামরিক শাসন, গণআন্দোলন ও নির্বাচন—সব কিছুর ভেতর দিয়েই জামায়াত নিজেদের জায়গা তৈরি করে। জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি ১৮টি আসন পায়। সে সময় সরকার গঠনে বিএনপির সমর্থক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পর্যায়ে জামায়াত আর প্রান্তিক শক্তি নয়; বরং ক্ষমতার সমীকরণে প্রভাব বিস্তারকারী দল।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হলে জামায়াত প্রথমবার সরাসরি সরকারে অংশ নেয়। দলটির দুই শীর্ষ নেতা—মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ—মন্ত্রীত্ব পান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে দলটি গভীর সংকটে পড়ে। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ঘোষণা করে। কয়েকটি নির্বাচন তারা সরাসরি অংশ নিতে পারেনি; কখনো জোটের প্রতীক নিয়ে, কখনো আড়ালে থেকে রাজনীতিতে ছিল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দলটি আবার নিষিদ্ধ হয়, যা স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের পর আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন ফিরে পায়। এই পুনরাগমন কেবল আইনি ছিল না; সাংগঠনিক পুনর্গঠনেরও সূচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় প্রচার, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ‘ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি’—এসব বার্তা দিয়ে দলটি নতুন ইমেজ তৈরির চেষ্টা করে।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং কিছু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকাও জামায়াতের পক্ষে যায় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে চালানো সাংগঠনিক কাজ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি কল্যাণমূলক ও সুশাসনের বার্তা তুলে ধরা—এই কৌশলও ফল দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের এই সাফল্যকে কেবল সংখ্যার হিসেবে দেখা যাবে না। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক, বিচার, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বয়ানের মুখোমুখি থাকা একটি দল এখন সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তি। অর্থাৎ, তারা এখন কেবল আন্দোলন বা জোট রাজনীতির অংশ নয়; বরং সরাসরি সংসদীয় বিতর্ক, আইন প্রণয়ন ও নীতিগত প্রশ্নে প্রভাব রাখার অবস্থানে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও যুদ্ধাপরাধের প্রশ্ন এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। জামায়াতকে তাই একদিকে তাদের অতীতের দায় ও বিতর্কের মুখোমুখি হতে হবে, অন্যদিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করতে হবে। সংসদে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব মানে কেবল সরকারের সমালোচনা নয়; বিকল্প নীতি প্রস্তাব, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং জাতীয় প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন।
রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, নিষিদ্ধ থেকে পুনরুত্থান—এই পথ সহজ নয়। পাকিস্তান আমলে দু’বার, স্বাধীন বাংলাদেশে দু’বার নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও জামায়াত সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে। এই স্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে একটি আদর্শভিত্তিক কাঠামো, শক্ত শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে বিস্তৃত সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর। এবারের ফল সেই পথে এক বড় ধাপ।
বাংলাদেশের রাজনীতি বরাবরই পরিবর্তনশীল। কখনো জোট, কখনো একক আধিপত্য, কখনো গণআন্দোলন—প্রতিটি পর্ব নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। জামায়াতের বর্তমান অবস্থানও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। স্বাধীনতার বিরোধিতার অভিযোগ থেকে শুরু করে নিবন্ধন বাতিল, শীর্ষ নেতাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড, রাজনৈতিক নির্বাসন—সবকিছু পেরিয়ে দলটি এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল। এই যাত্রা যেমন সমর্থকদের কাছে পুনর্জাগরণের গল্প, তেমনি সমালোচকদের কাছে ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়ের পুনরাবির্ভাব।
আগামী দিনগুলোয় তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করবে এই অর্জনের স্থায়িত্ব। তারা কি অতীতের বিতর্ককে পেছনে ফেলে নীতিগত ও সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন পরিচয় গড়ে তুলতে পারবে, নাকি পুরোনো প্রশ্নই সামনে ফিরে আসবে—তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামীর জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে দিয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ