
বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দিল্লিতে যে অস্বাভাবিক মাত্রার আগ্রহ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, তা কূটনৈতিক মহলে প্রায় প্রকাশ্য আলোচনা। সাধারণত প্রতিবেশী দেশে নির্বাচন হলে ভারত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, কিন্তু এবারকার নজরদারি ও কৌশলগত প্রস্তুতির মাত্রা আলাদা। কারণ একাধিক ‘নতুন বাস্তবতা’ একসাথে হাজির হয়েছে—যা গত দেড় দশকে দেখা যায়নি।
প্রথম বড় পরিবর্তন হলো, দীর্ঘ সময় পর এমন এক সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে যেখানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থাকবে না। শেখ হাসিনার টানা শাসনামলে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক এক ধরনের পূর্বানুমানযোগ্য ধারায় চলছিল। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কানেক্টিভিটি, বাণিজ্য—সবখানেই একটি ধারাবাহিকতা ছিল। দিল্লি সেই স্থিতাবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এখন সেই সমীকরণ বদলাতে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আসতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যার নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। দিল্লির দৃষ্টিতে বিএনপি একসময় ছিল ‘ভারত-সন্দেহপ্রবণ’ রাজনৈতিক শক্তি। বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে খালেদা জিয়া–এর নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দিল্লির অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না—এমন ধারণা ভারতীয় কূটনৈতিক মহলে প্রচলিত। যদিও সেই সময়ের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতা আজ আর একই নেই, তবু অতীতের স্মৃতি কৌশলগত মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি–র সম্ভাব্য ভূমিকা। তারা সরকারে অংশীদার হোক বা শক্তিশালী বিরোধী দল—সংসদে তাদের প্রভাবশালী উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিত বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে দিল্লিতে এক ধরনের ‘অঘোষিত রেড লাইন’ হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন—ভারত কি বাস্তবতার খাতিরে তাদের সঙ্গে ‘ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ’ গড়ে তুলবে?
দিল্লির কৌশলগত চর্চাকেন্দ্রগুলোর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলছে, ভারত ইতোমধ্যেই সব সম্ভাব্য পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে। নীতি একটাই—যে-ই নির্বাচিত হয়ে আসুক, দিল্লি তার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। এই অবস্থান ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি পুরনো নীতির সঙ্গেই মেলে: প্রতিবেশীকে বদলানো যায় না, তাই নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে হয়।
তবে কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হলো উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা। শেখ হাসিনার আমলে ভারতের জন্য একটি বড় স্বস্তির জায়গা ছিল—উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের মাটিতে সক্রিয় আশ্রয় পায়নি। বরং ঢাকার সহযোগিতায় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ভারতে প্রত্যর্পিত হন। এই নিরাপত্তা সহযোগিতা দিল্লির কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
নতুন সরকার এই প্রশ্নে কী অবস্থান নেবে—এটাই দিল্লির প্রধান উদ্বেগ। ভারতের কৌশলগত মহল স্পষ্ট করে বলছে, উত্তর-পূর্বের নিরাপত্তা ইস্যুতে তারা আপস করবে না। শিলিগুড়ি করিডর থেকে শুরু করে আসাম, মিজোরাম পর্যন্ত সামরিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ দিল্লি একদিকে কূটনৈতিক প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা প্রস্তুতিও জোরদার রেখেছে।
তবে শুধু নিরাপত্তাই নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধান বাণিজ্যিক শক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রেল, সড়ক ও বন্দর সংযোগ—সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন বা শীতল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি দুই পক্ষেরই নেই। দিল্লির অনেক সাবেক কূটনীতিক মনে করেন, এই অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা সম্পর্ককে বাস্তববাদী পথে রাখবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী স্লোগানও উঠেছিল—এই অভিজ্ঞতা দিল্লিকে সতর্ক করেছে। তাই এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ভারত প্রকাশ্যে নাক গলানো থেকে বিরত থেকেছে। অতীতে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ‘হস্তক্ষেপ’ নিয়ে যে অভিযোগ উঠত, এবার সেই অভিযোগের সুযোগ কম দিতে চেয়েছে দিল্লি। এমনকি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও ভারত রুটিন কূটনৈতিক আপত্তিও তোলেনি—এটিকে অনেকেই ‘স্ট্র্যাটেজিক সাইলেন্স’ হিসেবে দেখছেন।
বিএনপি প্রসঙ্গে দিল্লির মনোভাব যে বদলেছে, তা বিভিন্ন ইঙ্গিতে বোঝা যায়। অতীতে যাকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো, এখন তাকে ‘সম্ভাব্য স্থিতিশীল বিকল্প’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ভারতের কূটনৈতিক আউটরিচও তুলনামূলকভাবে খোলামেলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, বর্তমান অপশনগুলোর মধ্যে বিএনপি দিল্লির কাছে ‘মন্দের ভালো’—কারণ তারা তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কিছু প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, কর্মকর্তা পর্যায়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। তবে বাস্তবতা হলো—যদি জামায়াত নির্বাচিত হয়ে সরকারে ভূমিকা নেয়, দিল্লির পক্ষে সম্পূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত আদর্শ নয়, স্বার্থ ও বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
দিল্লির সাবেক হাইকমিশনাররা জোর দিচ্ছেন ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দটির ওপর। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অনিশ্চয়তার পর একটি নির্বাচিত, প্রতিনিধিত্বমূলক ও কার্যকর সরকার—এটাই ভারতের প্রধান প্রত্যাশা। কারণ অস্থির বাংলাদেশ মানে সীমান্তে অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যে বিঘ্ন, আঞ্চলিক কূটনীতিতে ঝুঁকি।
সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ভারতের জন্য একাধিক অজানা প্রশ্ন নিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাস্তবতা, বিএনপি-জামায়াত সমীকরণ, উত্তর-পূর্বের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে দিল্লি এখন হিসাব কষছে। তবে একটি বিষয়ে কূটনৈতিক মহলে প্রায় ঐকমত্য আছে: বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, যদি তারা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ—বিশেষত উত্তর-পূর্বাঞ্চল—সম্মান করে এবং পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে আগ্রহী হয়, তবে দিল্লি পূর্ণাঙ্গ এনগেজমেন্টে যেতে প্রস্তুত।
অর্থাৎ, এই নির্বাচন শুধু ঢাকার ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি দিল্লির জন্যও কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের মুহূর্ত। অনিশ্চয়তার চেয়ে নিশ্চিততা—এই মুহূর্তে ভারতের কাছে সেটাই বড়। আর সেই নিশ্চিততা কতটা দৃঢ় হবে, তা নির্ভর করছে ভোটের ফল এবং পরবর্তী সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ