বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ আর ভারতের সম্পর্ক কোনো সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সমঝোতা নয়, এটি ইতিহাস, আবেগ, কৌশল এবং পারস্পরিক নির্ভরতার এক দীর্ঘ অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ দশক ধরে দিল্লি ও আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অনেক ওঠানামা সত্ত্বেও মোটের ওপর স্থিতিশীল থেকেছে। এই সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিলেন শেখ হাসিনা, যিনি ভারতের কাছে শুধু প্রতিবেশী দেশের একজন নেতা নন, বরং এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিনিধি। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে প্রশ্নটা এখন আর আবেগের নয়, প্রশ্নটা ঠান্ডা বাস্তবতার—ভারত কি ধীরে ধীরে তার পুরোনো বন্ধু আওয়ামী লীগের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
বছর দেড়েক আগেও যখন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়ে, তখন ভারত দ্বিধা করেনি। শেখ হাসিনাকে তারা আশ্রয় দিয়েছে, নিরাপত্তা দিয়েছে, সম্মানিত অতিথির মর্যাদা দিয়েছে। শুধু শেখ হাসিনা নন, হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, সাবেক মন্ত্রী-এমপি, দলীয় সংগঠক ও সমর্থকও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রয় পেয়েছেন। ভারতের মাটি থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক যোগাযোগ, বিবৃতি, আন্তর্জাতিক লবিং চলেছে। এই সময় জুড়ে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বলে এসেছে যে তারা বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়—যার স্পষ্ট অর্থ ছিল, আওয়ামী লীগ যেন নির্বাচনের বাইরে না থাকে।
কিন্তু বাস্তবতা অন্য দিকে গড়িয়েছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন দলটিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই হচ্ছে আওয়ামী লীগ ছাড়াই। এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—ভারত এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রতিবাদ জানায়নি। বরং দেখা গেছে, দিল্লি এই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই কূটনৈতিকভাবে এগোচ্ছে। এতদিন যে দেশ আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না বলে ইঙ্গিত দিচ্ছিল, সেই দেশই এখন আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে হিসাব কষতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ‘আউটরিচ’-এ। দিল্লি এখন শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বরং সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী—এই দুই শক্তির দিকেই ভারতের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শোক জানিয়ে তারেক রহমানকে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সেই চিঠি নিজে ঢাকায় এসে পৌঁছে দিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে এই ধরনের অঙ্গভঙ্গি কখনোই নিছক সৌজন্য নয়, এগুলো বার্তা।
দিল্লির অনেক বিশ্লেষক খোলাখুলিভাবেই বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে চিরস্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক সৌমেন রায়ের ভাষায়, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় জাতীয় স্বার্থ দিয়ে। আওয়ামী লীগ যখন ভারতের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ছিল, তখন সম্পর্ক গভীর হয়েছে। কিন্তু যদি দেখা যায় অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনীতি বা ভূরাজনৈতিক অবস্থান বেশি সুরক্ষিত হবে, তাহলে দিল্লি সেই পথেই হাঁটবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আবেগী নয়, পুরোপুরি বাস্তববাদী।
এই বাস্তববাদ থেকেই অনেকেই মনে করছেন, ভারত আর আওয়ামী লীগের ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’-এর জন্য সক্রিয় তদবির করবে না। দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর একটি বড় অংশের ধারণা, বাংলাদেশে যা ঘটেছে তার দায় পুরোপুরি আওয়ামী লীগের ওপরই বর্তায়। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার সময় দলটি সমাজের ভেতরের ক্ষোভ, বিরোধী মনোভাব এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথভাবে আমলে নেয়নি। সেই ক্ষোভ একপর্যায়ে শুধু আওয়ামী লীগবিরোধী নয়, ভারতবিরোধী মনোভাবেও রূপ নিয়েছে। ভারত এই বাস্তবতা ভালোভাবেই বোঝে। তাই তারা আর এমন কিছু করতে চায় না, যাতে বাংলাদেশে ‘আওয়ামী লীগ মানেই ভারত’—এই ধারণা আরও শক্ত হয়।
তবে এর মানে এই নয় যে ভারত আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি ছেঁটে ফেলছে। অনেক ভারতীয় বিশ্লেষকই মনে করেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে মুছে যাওয়ার মতো দল নয়। গত তিন দশকের নির্বাচনী ডেটা দেখলে বোঝা যায়, দলটির একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে—সাধারণত ৩০ শতাংশের আশপাশে। আওয়ামী লীগ যে বামঘেঁষা, ধর্মনিরপেক্ষ এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে, সেই রাজনীতির সামাজিক জায়গা বাংলাদেশে এখনও আছে। ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত রিভা গাঙ্গুলি দাসের মতে, এত বড় একটি রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘদিন বাইরে রাখা সম্ভব নয়। সময় লাগতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগ একসময় না একসময় রাজনীতিতে ফিরে আসবে।
ভারতের দৃষ্টিতে এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ভূগোল। যে দলই বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসুক, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এড়িয়ে চলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বাস্তবতার বন্ধনে আবদ্ধ। স্ম্রুতি পট্টনায়কের মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, দিল্লি এখন আর কোনো একক দলের ওপর সব ডিম রাখবে না। তারা একাধিক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করার পথ খুলে রাখবে। এতে ভারতের কৌশলগত ঝুঁকি কমবে।
এদিকে ভারতের মাটিতে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনোভাব ভিন্ন। তাদের বড় অংশ এখনো বিশ্বাস করেন, ১৯৭১ সালের বন্ধন এত সহজে ছিঁড়ে যাওয়ার নয়। অভিনেত্রী ও রাজনীতিক রোকেয়া প্রাচীর বক্তব্যে এই আবেগ স্পষ্ট। তাঁর মতে, যেমন ভারতে কংগ্রেস ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কল্পনা করা যায় না, তেমনি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, প্রতিবেশী ভারতের জন্যও উদ্বেগজনক।
তবে দিল্লির দৃষ্টিতে আবেগের চেয়ে হিসাব বড়। ভারত জানে, আওয়ামী লীগ আজ যে অবস্থায় আছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দলটিকেই নিজের ভুল, ব্যর্থতা এবং কৌশলগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে হবে। ভারত এই প্রক্রিয়ার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু চালক হবে না। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং ক্ষমতায় ফিরতে তাঁর সময় লেগেছিল একুশ বছর। ইতিহাস হয়তো হুবহু ফিরে আসে না, কিন্তু ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত আওয়ামী লীগের থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে—এ কথা বলা অতিরঞ্জন হবে। আবার আগের মতো নিঃশর্ত রাজনৈতিক বিনিয়োগও আর করছে না। দিল্লি এখন দূরত্ব বজায় রেখে সম্পর্ক রাখার কৌশলে হাঁটছে—যেখানে দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়, আবার সব আলো জ্বালিয়েও রাখা হয়নি। এই কৌশল ভারতের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ তাই অনেকটাই নির্ভর করবে তারা নিজেদের কতটা বদলাতে পারে, কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফিরে আসতে পারে। ভারত অপেক্ষা করবে, পর্যবেক্ষণ করবে, এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এটাই এই সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা।
আপনার মতামত জানানঃ