অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বড় আর্থিক সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার একটি প্রস্তাব বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই উড়োজাহাজগুলো কেনা হবে মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Boeing–এর কাছ থেকে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি কোনো এককালীন লেনদেন নয়; বরং ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ কাঠামোর আওতায় এই অর্থ পরিশোধ করা হবে। হিসাব অনুযায়ী, বছরে আনুমানিক ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হতে পারে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন উপদেষ্টা এস কে বশির উদ্দিন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সরকার উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস এবং মার্কিন নির্মাতা বোয়িং—উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যাচাই করা হয়। বিশ্লেষণের পর বোয়িংয়ের সঙ্গে দরকষাকষির জন্য একটি আলোচনা দল গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন অর্থনীতি–সংক্রান্ত উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তবে এই আলোচনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
উপদেষ্টার ভাষায়, দরকষাকষি সফলভাবে শেষ হলে সরকার এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় এগোতে পারবে। কিন্তু যদি আলোচনা কোনো কারণে ভেস্তে যায়, তাহলে এই মুহূর্তে উড়োজাহাজ কেনা সম্ভব নাও হতে পারে। তার বক্তব্যে একটি সতর্কতা স্পষ্ট—এই সিদ্ধান্ত আবেগের নয়, বরং আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
এই উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা Biman Bangladesh Airlines গুরুতর সক্ষমতা সংকটে ভুগছে। গত বছরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করলেও, তাদের মধ্যে মাত্র ২০ লাখ যাত্রী বহন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। অর্থাৎ মোট যাত্রীর একটি খুবই ছোট অংশ রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি পরিবহন করতে পেরেছে। উপদেষ্টার মতে, এর মূল কারণ হলো বিমানের পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকা।
বর্তমানে বিমানের বহরে মোট ১৯টি উড়োজাহাজ থাকলেও, এর মধ্যে মাত্র ১৪টি কার্যকরভাবে উড়তে সক্ষম। এই সীমিত বহর দিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতিযোগিতামূলক সেবা দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সরকারের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রয়োজন হবে অন্তত ৪৭টি উড়োজাহাজ। সেই লক্ষ্য পূরণে বর্তমান বহর যে সম্পূর্ণ অপ্রতুল, তা স্বীকার করতেই হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনাকে সরকার একটি ‘প্রাথমিক ধাপ’ হিসেবে দেখছে। এটি একসঙ্গে সব সমস্যার সমাধান নয়, বরং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পথে একটি ভিত্তি তৈরি করার উদ্যোগ। দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনাও সেই চিন্তারই প্রতিফলন—রাষ্ট্র যেন একবারে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মধ্যে না পড়ে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্কও কম নয়। উড়োজাহাজ কেনার প্রসঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত প্রশ্ন। উপদেষ্টা বশির উদ্দিন বলেন, সরকার এর আগে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি বিশেষ বিধানের অধীনে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং তার ভিত্তিতে একটি বৈশ্বিক চুক্তির কাঠামো দাঁড় করানো হয়, যাকে ART Agreement বলা হচ্ছে। এই চুক্তির কিছু অংশ বাংলাদেশ থেকে ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার ভাষায়, এই ফাঁসের ঘটনায় বাংলাদেশ অপমানিত হয়েছে, তবে তিনি মনে করেন না যে এতে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যেকোনো বড় সম্পদ ক্রয় বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে একটি গোপনীয়তা চুক্তি বা নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট থাকে। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তথ্য প্রকাশ না করাই আন্তর্জাতিক রীতি। চুক্তি সম্পন্ন হলে তা প্রকাশ্যে আসবেই। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু তথ্য প্রকাশ হওয়াকে তিনি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখছেন না।
এই বক্তব্যের মধ্যেই স্পষ্ট হয়, উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তটি কেবল পরিবহন খাতের নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্য বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, WTO কাঠামোর ভেতরে অবস্থান, এমনকি কূটনৈতিক মর্যাদার প্রশ্নও এখানে এসে মিশেছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব নয়, কিন্তু তা একেবারে নগণ্য ব্যয়ও নয়। এই অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য বা শিক্ষার মতো খাতে ব্যয় হলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় একটি জনগোষ্ঠী উপকৃত হতে পারত—এই যুক্তি ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে সরকারের যুক্তি হলো, একটি শক্তিশালী জাতীয় এয়ারলাইন দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক সুফল বয়ে আনে। পর্যটন, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিদেশি এয়ারলাইনগুলো বাংলাদেশের আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। দেশের যাত্রীরা বিদেশি এয়ারলাইনে ভ্রমণ করছেন, ফলে ভাড়া বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যদি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে এই অর্থের একটি অংশ দেশেই রাখা সম্ভব হবে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কেবল উড়োজাহাজ কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না—এই সতর্কতা অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের। ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, রুট পরিকল্পনা, সেবার মান, সময়ানুবর্তিতা এবং কর্পোরেট সংস্কার—এই সবকিছু একসঙ্গে না এগোলে নতুন উড়োজাহাজও লোকসানের বোঝা হয়ে উঠতে পারে। অতীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই।
এই কারণেই উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ একটি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় সৃষ্টি করবে। প্রয়োজনীয়, কারণ বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে জাতীয় এয়ারলাইনকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সরকারের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ২০৩৫ সালের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এখনই ধাপে ধাপে বহর বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ক্রয় সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি নীতি নির্বাচন। রাষ্ট্র কি একটি শক্তিশালী জাতীয় এয়ারলাইন গড়ে তুলতে চায়, নাকি ধীরে ধীরে বিদেশি এয়ারলাইনের ওপর নির্ভরতা মেনে নেবে—এই প্রশ্নের উত্তর এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য একটি আর্থিক ও কৌশলগত উত্তরাধিকার রেখে যাবে। সেটি সফল বিনিয়োগে পরিণত হবে, নাকি আরেকটি বিতর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রকল্প—তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার
আপনার মতামত জানানঃ