
আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের প্রবর্তিত নতুন ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকারের ধারণাকে এক নতুন, বিতর্কিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই আইন শুধু অপরাধ ও শাস্তির কাঠামো বদলায়নি, বরং আফগান সমাজকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রেণিভিত্তিক ও বৈষম্যমূলক এক ব্যবস্থার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আবদ্ধ করেছে। আইনটি কার্যকর হওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে আধুনিক আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করছে।
নতুন এই আইনে আফগান সমাজকে চারটি পৃথক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শ্রেণির জন্য একই অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সর্বোচ্চ শ্রেণিতে স্থান পেয়েছেন ধর্মীয় আলেম ও উলামারা। এই শ্রেণির কেউ অপরাধ করলে তাকে আদালতে ডেকে কেবল উপদেশ দিয়েই ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, গুরুতর অপরাধ হলেও শাস্তির বদলে নৈতিক পরামর্শই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে তথাকথিত অভিজাত শ্রেণি। তাদের জন্যও শাস্তির মাত্রা সীমিত—সতর্কবার্তা বা উপদেশের মধ্যেই তা শেষ হবে। তৃতীয় শ্রেণিতে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের জন্য কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর সর্বনিম্ন শ্রেণিতে রাখা হয়েছে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে, যাদের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতন বা শারীরিক শাস্তির অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
এই শ্রেণিবিন্যাস আফগান সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে শুধু স্বীকারই করেনি, বরং তাকে আইনি বৈধতা দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি কার্যত “আইনের চোখে সবাই সমান”—এই মৌলিক নীতিকে বাতিল করে দিয়েছে। ধর্মীয় নেতা ও ক্ষমতাধর গোষ্ঠী কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ পাচ্ছে, আর সমাজের দরিদ্র ও দুর্বল অংশ সবচেয়ে কঠোর শাস্তির মুখে পড়ছে। এতে বিচারব্যবস্থা আর ন্যায়বিচারের হাতিয়ার না থেকে ক্ষমতার সুরক্ষাকবচে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো নতুন আইনে ‘স্বাধীন ব্যক্তি’ ও ‘দাস’ শব্দের ব্যবহার। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বিশ্বে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইনে একে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ তালেবান সরকারের নতুন আইনে দাসপ্রথাকে কার্যত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য রাস্তাঘাট ও বাজারে ক্রীতদাসকে সঙ্গে নিয়ে চলাচলকেও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে আফগান সমাজে এমন এক চিত্র ফিরে আসতে পারে, যা মধ্যযুগীয় বাস্তবতাকেও ছাড়িয়ে যায়—যেখানে মানুষকে পণ্যের মতো প্রদর্শন করা হবে এবং রাষ্ট্র নিজেই সেই ব্যবস্থার আইনি রক্ষক হয়ে দাঁড়াবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগান মানবাধিকার সংস্থা রাওয়াদারি এই আইনের একটি কপি সংগ্রহ করেছে। ১০টি অধ্যায় ও ১১৯টি ধারাসংবলিত এই আইন গত ৪ জানুয়ারি জারি করা হয় এবং ইতোমধ্যে দেশটির বিভিন্ন আদালতে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, এটি কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাস্তব প্রয়োগের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। এতে করে আশঙ্কা আরও গভীর হচ্ছে যে, শিগগিরই আফগানিস্তানের আদালতগুলো এই বৈষম্যমূলক বিধান অনুসারে রায় দেওয়া শুরু করবে।
নতুন আইনে ন্যায়বিচারের মৌলিক সুরক্ষাগুলোও প্রায় অনুপস্থিত। আইনজীবী পাওয়ার অধিকার, নিরপেক্ষ শুনানি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বা গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এর ফলে নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ঝুঁকি বহুগুণে বাড়বে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে, যাদের জন্য শারীরিক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তাদের ওপর নির্যাতনকে আইনের আড়ালে বৈধতা দেওয়া হবে।
এই আইন আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই দেশটিতে নারীর অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শিক্ষা ও মতপ্রকাশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। নতুন ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড সেই ধারারই এক চরম প্রকাশ, যেখানে রাষ্ট্র নিজেই বৈষম্যকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি শুধু একটি আইন নয়, বরং একটি আদর্শিক ঘোষণা—যেখানে সমতা ও মানবাধিকারের বদলে শ্রেণি ও আনুগত্যই বিচারব্যবস্থার মূল মানদণ্ড।
আন্তর্জাতিক মহল এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আইনটির বাস্তবায়ন স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি ও নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আইনের চোখে সবাই সমান এবং কাউকে দাসত্বে আবদ্ধ করা যাবে না। নতুন আফগান আইন এই দুই নীতিকেই প্রকাশ্যে অস্বীকার করছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থার ফলে আফগান সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। বিচার আর ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল না থেকে শাস্তি ও নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হলে সাধারণ মানুষ আদালতের ওপর আস্থা হারাবে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও খাদ্যসংকটে ভুগছে, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই অপরাধে একজন আলেম উপদেশ পেয়ে মুক্তি পাবে, আর একজন দরিদ্র মানুষ শারীরিক শাস্তির মুখে পড়বে—এই বাস্তবতা সমাজে গভীর ক্ষোভ ও বৈষম্যের বোধ তৈরি করতে পারে।
এই আইন কার্যকর হলে আফগানিস্তান আরও এক ধাপ আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে যাবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এমনিতেই দেশটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক স্বীকৃতির অভাবে সংকটে রয়েছে। মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সহযোগিতা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর, যারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায়ভার বহন করতে বাধ্য হবে।
সব মিলিয়ে, তালেবান সরকারের নতুন ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড আফগানিস্তানের জন্য এক গভীর সংকেত বহন করছে। এটি শুধু বিচারব্যবস্থার কাঠামো বদলায়নি, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে—যেখানে নাগরিকের অধিকার নয়, বরং তার সামাজিক অবস্থানই নির্ধারণ করবে তার ভাগ্য। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষায়, এই আইন আইনের চোখে সমতার নীতিকে বাতিল করে বৈষম্যকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দিয়েছে। প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে, এই পথ কত দূর যাবে এবং এর মূল্য শেষ পর্যন্ত কতটা চড়া হয়ে উঠবে আফগান জনগণের জন্য।
আপনার মতামত জানানঃ