মিনেসোটার মিনিয়াপলিসে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের দুর্ভাগ্য নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। দুই বছরের একটি শিশুকে আটক করার ঘটনা শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, আদালতের নথি, আইনজীবীদের বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা আরও ভয়াবহ। এই ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে আইনের শাসন, মানবাধিকার, এমনকি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতাও।
বৃহস্পতিবার দুপুরে এলভিস জোয়েল টিই তাঁর দুই বছরের মেয়েকে নিয়ে দোকান থেকে ফিরছিলেন। সাধারণ একটি দিন, সাধারণ একটি পরিবার, যেখানে বাবা-মেয়ের হাতে ছিল হয়তো কেনাকাটার ব্যাগ, আর মনে ছিল ঘরে ফেরার তাড়া। ঠিক সেই সময়েই দৃশ্যপটে হাজির হন ফেডারেল ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই-এর সদস্যরা। অভিযোগ করা হয়েছে, তাঁদের কাছে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না। তবু তাঁরা বাবাকে থামান, এবং মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। শিশুটি তখন গাড়ির ভেতরে। একজন এজেন্ট গাড়ির জানালার কাচ ভেঙে ফেলেন। কাচ ভাঙার শব্দ, শিশুর আতঙ্কিত চিৎকার, মায়ের অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা—এই সব মিলিয়ে যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা কোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
শিশুটির মা ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি তাঁর সন্তানকে কাছে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, আইসিই এজেন্টরা বাবাকে শিশুটিকে মায়ের কাছে দিতে দেননি। এই নিষ্ঠুরতা কেবল শারীরিক নয়, মানসিকও। দুই বছরের একটি শিশুর কাছে মা-বাবা মানেই নিরাপত্তা, পরিচিত পৃথিবী। সেই পৃথিবী হঠাৎ করে ভেঙে পড়লে তার মানসিক অভিঘাত কতটা গভীর হতে পারে, তা বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই।
শিশুটিকে ইমিগ্রেশন বিভাগের একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। এরপর দ্রুতগতিতে বাবা ও মেয়েকে মিনেসোটা থেকে সরিয়ে টেক্সাসে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় পরিবারটির আইনজীবীরা আদালতের দ্বারস্থ হন। সন্ধ্যার দিকে একজন ফেডারেল বিচারক স্পষ্ট নির্দেশ দেন—বাবা ও মেয়েকে মিনেসোটার বাইরে পাঠানো যাবে না, এবং রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে শিশুটিকে মুক্তি দিতে হবে। বিচারকের মন্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ: এই শিশুর কোনো অপরাধের ইতিহাস নেই। এই কথাটিই আসলে পুরো ঘটনার নৈতিক ভিত্তিকে নগ্ন করে দেয়। একটি শিশু, যার অপরাধের প্রশ্নই ওঠে না, তাকে কেন, কীভাবে আটক করা হলো?
কিন্তু এখানেই আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার অভিযোগ ওঠে। আদালতের আদেশ জারির পরও সরকারি কর্মকর্তারা তা মানেননি। আদেশ জারির কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবা ও মেয়েকে উড়োজাহাজে করে টেক্সাসের একটি আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কেবল একটি পরিবারের অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি, বরং আদালতের কর্তৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের আদেশ অমান্য করার অর্থ কী, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যাপক আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে শুক্রবার বিকেলে শিশুটিকে মিনেসোটায় ফিরিয়ে এনে তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই খবর কিছুটা স্বস্তি দিলেও পুরো ঘটনার ক্ষত মুছে দেয় না। শিশুটি এখন মায়ের কোলে, কিন্তু বাবা এলভিস জোয়েল এখনও আটক রয়েছেন। একটি পরিবারের ভেতর থেকে একজন অভিভাবককে আলাদা করে রাখা মানে সেই পরিবারের সামাজিক ও মানসিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া। শিশুটি হয়তো এখনো পুরো ঘটনা বুঝতে পারছে না, কিন্তু এই বিচ্ছেদের প্রভাব তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি স্তরে ছাপ ফেলতে পারে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দাবি করেছে, শিশুটির বাবা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং তিনি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। আরও বলা হয়েছে, শিশুটির মা নাকি তাকে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু পরিবারটির আইনজীবীরা এই সব দাবিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিই সদস্যরাই শিশুটিকে মায়ের কাছে যেতে দেননি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়লে পরিস্থিতি সামাল দিতে এজেন্টরা রাসায়নিক গ্যাস ও ফ্ল্যাশ-ব্যাং ব্যবহার করেন। এই তথ্য পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। জনসমক্ষে, একটি শিশুর সামনে এমন সামরিক কৌশল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির একটি গভীর সমস্যা আবারও সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, আইসিই অভিবাসীদের দ্রুত এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিয়ে যায়, যাতে তারা আইনি সহায়তা না পায় এবং আদালতের নজরের বাইরে থাকে। আইনজীবী ইরিনা ভায়নারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, এটিই একটি পরিকল্পিত কৌশল। মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা, পরিবারকে ভেঙে দেওয়া এবং আইনি লড়াইকে কঠিন করে তোলাই যেন লক্ষ্য।
দুই বছরের একটি শিশুর আটক হওয়া কেবল আইনের ব্যাখ্যার বিষয় নয়, এটি মানবিকতার প্রশ্ন। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত হতে পারে, আর সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়—এই প্রশ্ন নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে ঘটনাটি। অভিবাসন আইন প্রয়োগের নামে যদি শিশুদেরও অপরাধীর মতো扱 করা হয়, তবে সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়?
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে ‘নৃশংসতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, অনেকে প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি সত্যিই নিরাপত্তার প্রশ্ন, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার? ইতিহাস বলে, যখনই কোনো রাষ্ট্র নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সবচেয়ে দুর্বলদের ওপর আঘাত হানে, তখনই সেই রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট গভীর হয়।
শিশুটির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। সে তার মায়ের কাছে ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু বাবার অনুপস্থিতি, আটকের স্মৃতি, ভয়ের সেই মুহূর্ত—এসব তার অবচেতনে থেকে যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোটবেলার ট্রমা অনেক সময় ভাষায় প্রকাশ পায় না, কিন্তু আচরণ, ভয়, সম্পর্কের ভেতর দিয়ে তা প্রকাশিত হয় সারা জীবন।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আইন কেবল বইয়ের পাতায় লেখা নিয়ম নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইন প্রয়োগের সময় যদি মানবিকতা হারিয়ে যায়, তবে সেই আইনই একসময় অবিচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। মিনেসোটার এই দুই বছরের শিশুটি হয়তো কোনোদিন জানবে না, সে কীভাবে একটি জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছিল। কিন্তু তার গল্প আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে রেখেছে—যেখানে আমরা দেখতে পাই, ক্ষমতা আর মানবিকতার সংঘাতে আমরা কোন দিকে দাঁড়িয়ে আছি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়: একটি সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, সেটিই কি তার সভ্যতার আসল মাপকাঠি নয়? এই শিশুটির আটকের ঘটনা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের বাধ্য করে, এবং হয়তো দীর্ঘদিন ধরে তাড়িয়ে বেড়াবে আমাদের বিবেককে।
আপনার মতামত জানানঃ