পিরামিড মানুষের হাতে তৈরি হয়নি—এই ধারণাটি কয়েক দশক ধরে রহস্যপ্রিয় মানুষের কৌতূহল উসকে দিয়ে আসছে। ইতিহাস, বিজ্ঞান ও প্রত্নতত্ত্বের ব্যাখ্যায় যেখানে পিরামিডকে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার এক অনন্য মানবিক কীর্তি হিসেবে দেখা হয়, সেখানে একটি ভিন্ন ধারার চিন্তাভাবনা দাবি করে—এমন বিস্ময়কর স্থাপনা মানুষের একার পক্ষে তৈরি করা সম্ভব ছিল না। এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় ‘প্রাচীন এলিয়েন’ তত্ত্ব, যার সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী প্রচারক ছিলেন সুইস লেখক এরিখ ফন ড্যানিকেন। তার মৃত্যু আবারও এই বিতর্কিত ধারণাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।
ড্যানিকেনের মতে, ভিনগ্রহের প্রাণীরা সরাসরি প্রাচীন মিশরীয়দের সহায়তা করেছিল পিরামিডসহ নানা বিশাল স্থাপনা নির্মাণে। তিনি বিশ্বাস করতেন, এসব এলিয়েন ছিল উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ‘মহাকাশচারী’, যারা পৃথিবীতে এসে মানব সভ্যতার বিকাশে প্রভাব ফেলেছে। তার ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত বই ‘চ্যারিয়টস অব দ্য গডস’ এই তত্ত্বকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে। বইটিতে তিনি দাবি করেন, শুধু মিশর নয়, মায়ান, ইনকা ও অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার স্থাপত্য, জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত জ্ঞান আসলে মানুষের নিজস্ব আবিষ্কার নয়, বরং বহির্জাগতিক উৎস থেকে পাওয়া।
ড্যানিকেনের যুক্তির মূল ভিত্তি ছিল পিরামিডের নিখুঁত প্রকৌশল ও রহস্যময় বৈশিষ্ট্য। তার প্রশ্ন ছিল—কয়েক টন ওজনের বিশাল পাথরের ব্লক কীভাবে এত নিখুঁতভাবে কাটা ও একটির ওপর আরেকটি বসানো হলো? কীভাবে সেগুলো শত শত ফুট উঁচুতে তোলা হলো? নির্মাণের সময় ভেতরে আলো জ্বালানোর কোনো স্পষ্ট প্রমাণ কেন নেই? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রাচীন মানুষ কীভাবে এত উন্নত গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করল, যার প্রতিফলন নাকি পিরামিডের মাত্রা ও অবস্থানে দেখা যায়?
ড্যানিকেন দাবি করেন, গ্রেট পিরামিডের উচ্চতা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় গুণ করলে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার দূরত্বের কাছাকাছি মান পাওয়া যায়, পিরামিডের নকশায় ‘পাই’ ধ্রুবকের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, এমনকি পৃথিবীর ভর বা আকার সম্পর্কিত তথ্যও নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে। তার মতে, এগুলো কাকতালীয় হতে পারে না। এসব রহস্য একত্রে প্রমাণ করে যে পিরামিড কেবল মানুষের হাতে তৈরি হয়নি—এমনটাই ছিল তার সিদ্ধান্ত।
এই তত্ত্বের সঙ্গে তিনি প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপকথাকেও যুক্ত করেন। ড্যানিকেন লিখেছিলেন, এলিয়েন সত্তারা মিশরের ফেরাউনদের ‘দ্বিতীয় জীবন’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার মতে, এই কারণেই শাসকদের দেহ মমি করে সংরক্ষণ করা হতো এবং কবরের সঙ্গে বিপুল সম্পদ রাখা হতো—যাতে ভবিষ্যতে তারা পুনরুজ্জীবিত হলে সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা দেন, প্রাচীন খোদাইচিত্র ও দেয়ালচিত্রে যেসব ‘দেবতা’র ছবি দেখা যায়, তারা আসলে ভিনগ্রহের সেই অতিথিরাই।
ড্যানিকেনের কাজের জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল। তার বই ৩২টি ভাষায় অনূদিত হয় এবং ৬ কোটির বেশি কপি বিক্রি হয়। তিনি বক্তৃতা, ডকুমেন্টারি ও টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার ধারণা ছড়িয়ে দেন বিশ্বজুড়ে। ‘অ্যানসিয়েন্ট এলিয়েন্স’ নামের টেলিভিশন অনুষ্ঠান এই তত্ত্বকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ করে তোলে। এমনকি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও একসময় সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন, “এলিয়েন্স বিল্ট দ্য পিরামিডস অবভিয়াসলি”—যা এই বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
তবে এই জনপ্রিয়তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসবিদদের শক্ত অবস্থান। তারা বারবার ড্যানিকেনের দাবি খণ্ডন করেছেন তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রাচীন মিশরে পিরামিড নির্মাণের সময় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজ করতেন। তারা ক্রীতদাস ছিলেন না, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সংগঠিত শ্রমিক। তাদের খাবার, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থার লিখিত নথি পাওয়া গেছে। পিরামিডের কাছাকাছি আবিষ্কৃত হয়েছে শ্রমিকদের বসতি, কবরস্থান এবং পাথর কাটার খনি ও পরিবহনের চিহ্ন।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন, পাথর টানার জন্য স্লেজ ও বালির ব্যবহার, ঢালু পথ বা র্যাম্পের সাহায্যে ব্লক তোলার পদ্ধতি এবং তামার সরঞ্জাম দিয়ে পাথর কাটার প্রযুক্তি সেই সময়েই বিদ্যমান ছিল। ভেতরে আলো জ্বালানোর ক্ষেত্রে তেলের বাতি বা আয়নার প্রতিফলনের মতো পদ্ধতির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। আধুনিক গবেষণা বলছে, পিরামিডের গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সামঞ্জস্য অনেক ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত বা পরে আরোপিত ব্যাখ্যা।
ড্যানিকেনের সমালোচকরা বলেন, তার তত্ত্বের মূল শক্তি ছিল প্রমাণ নয়, বরং গল্প বলার ক্ষমতা ও মানুষের রহস্যপ্রিয় মানসিকতা। লেখক নাইজেল ওয়াটসনের ভাষায়, ড্যানিকেনের সাফল্যের ভিত্তি ছিল বিশ্বাস, তথ্য নয়। তিনি যেসব প্রশ্ন তুলেছিলেন, সেগুলোর অনেকগুলোরই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে, যদিও সব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। কিন্তু অজানা মানেই এলিয়েন—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোকে বিজ্ঞানসম্মত বলা যায় না।
ড্যানিকেনের চিন্তার শিকড় আরও পুরোনো তত্ত্বে পাওয়া যায়। এর আগে লেখক ইগনেশিয়াস এল. ডনেলি দাবি করেছিলেন, পিরামিড তৈরি করেছিল হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা আটলান্টিসের মানুষ। ড্যানিকেন সেই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আটলান্টিসের জায়গায় বসান ভিনগ্রহের প্রাণীদের। এই ধারার চিন্তা একদিকে যেমন কল্পনাপ্রবণ ও আকর্ষণীয়, অন্যদিকে তা প্রাচীন মানুষের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে খাটো করে দেখার অভিযোগও এনে দেয়।
এরিখ ফন ড্যানিকেনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ ছিল না, তবু তিনি আজীবন মিশর, লাতিন আমেরিকা ও নানা প্রত্নস্থল ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার লেখা ও বক্তৃতা বহু মানুষকে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী করেছে—এটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে তার তত্ত্ব বিজ্ঞান ও ইতিহাসের মূলধারায় বিভ্রান্তিও তৈরি করেছে। ৯০ বছর বয়সে তার মৃত্যুতে আবারও প্রশ্ন উঠছে—পিরামিড কি সত্যিই কেবল মানুষের কীর্তি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য?
আজ পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রমাণ বলে, পিরামিড মানুষেরই হাতে তৈরি। এটি প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার সংগঠনক্ষমতা, প্রযুক্তি ও বিশ্বাসের এক অনন্য নিদর্শন। তবু ড্যানিকেনের মতো চিন্তাবিদরা দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষ শুধু উত্তর নয়, রহস্যও ভালোবাসে। হয়তো সে কারণেই এলিয়েন ও পিরামিডের গল্প যুগের পর যুগ ধরে মানুষের কৌতূহল জাগিয়ে রাখবে—বিশ্বাস আর বিজ্ঞানের টানাপোড়েনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
আপনার মতামত জানানঃ