নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানোর যুক্তিতে বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সাময়িকভাবে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত—দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকাশ্যে এটিকে ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ বলা হলেও, সময় নির্বাচন এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্তটি নিছক রুটিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে গিয়েও নানা প্রশ্ন উত্থাপন করছে।
বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে এমন পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল বাড়িয়েছে। সাধারণত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতার আশঙ্কা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি—এই তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখেই বিদেশি মিশনগুলো নিজেদের নিরাপত্তা পর্যালোচনা করে। ভারতের সিদ্ধান্তও সেই চিরাচরিত ছকের মধ্যেই পড়ছে বলে সরকারি সূত্রগুলো দাবি করছে।
ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ভারতীয় কর্মকর্তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আপাতত ভারতে ফিরে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এটি কোনো স্থায়ী প্রত্যাহার নয় এবং কূটনৈতিক কার্যক্রমে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। মিশন খোলা থাকবে, ভিসা ও কনস্যুলার সেবা চলমান থাকবে, এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও আগের মতোই বজায় থাকবে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারত একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। একদিকে নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক বার্তা না দেওয়া—এই দ্বৈত লক্ষ্যই স্পষ্ট। কিন্তু কূটনীতিতে বার্তার গুরুত্ব অনেক সময় ঘোষণার ভাষার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। পরিবার সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই একটি অঘোষিত সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়, যা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের কূটনৈতিক মহলেই নজরে এসেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, বহুমাত্রিক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলে উভয় দেশই দাবি করে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে এমন একটি সিদ্ধান্তকে অনেকেই সম্পর্কের ওপর আস্থার সূচক হিসেবেও বিশ্লেষণ করছেন—যেখানে আস্থা থাকলেও সতর্কতা কমেনি।
বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই অতীত অভিজ্ঞতায় একটি সংবেদনশীল সময়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়, কর্মসূচি ও পাল্টা কর্মসূচিতে জনজীবন ব্যাহত হয়, আর কখনো কখনো সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো সাধারণত এই সময় নিজেদের ঝুঁকি মূল্যায়ন নতুন করে করে থাকে। অনেক দেশই অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে, বড় সমাবেশ থেকে দূরে থাকতে বা পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে রাখতে পরামর্শ দেয়। ভারতের সিদ্ধান্ত সেই আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ—এমন যুক্তিও তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, ভারত বাংলাদেশে শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও উপস্থিত। ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপ তাই স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি মনোযোগ কাড়ে। কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নেওয়া এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা জনমনে প্রশ্ন জাগায়—বাংলাদেশে কি সত্যিই এমন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা সাধারণের চোখে এখনো স্পষ্ট নয়?
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বিদেশি মিশনগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে, কিন্তু তাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়নি। এই ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। তবু বিষয়টি যে নজরদারির মধ্যে থাকবে, তা নিশ্চিত।
এই সিদ্ধান্তের আরেকটি দিক হলো আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে নানা চাপ ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীন-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। বাংলাদেশ এই সমীকরণের মাঝখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে এখানে যে কোনো অস্থিরতা আঞ্চলিক হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভারতের সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও মিলিয়ে দেখছেন। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতিতে ‘নিরাপত্তা আগে’—এই বার্তাটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় সামান্য ঝুঁকির আশঙ্কাও এড়াতে চাইছে নয়াদিল্লি। সেই নীতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে থাকা কূটনীতিকদের পরিবারের ক্ষেত্রে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন ব্যাখ্যাও উঠে আসছে।
একই সঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে, ভারত স্পষ্ট করে বলছে—এতে কূটনৈতিক কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। এই ঘোষণার মাধ্যমে তারা সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বার্তাই দিতে চাইছে। অর্থাৎ, পরিবার ফিরিয়ে নেওয়া মানেই সম্পর্ক শীতল হওয়া নয়—এই বার্তাটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—এই সিদ্ধান্ত সাময়িক সতর্কতা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি ভবিষ্যতের কোনো বড় কূটনৈতিক প্রবণতার ইঙ্গিত? আপাতত যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ভারত ঝুঁকি নিতে চায় না, কিন্তু সম্পর্কের সেতুও ভাঙতে আগ্রহী নয়। বাংলাদেশের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই নিরাপত্তা ও কূটনীতির এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অনেক সময় নীরব সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বেশি কথা বলে। ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের এই নীরব প্রত্যাবর্তনও তেমনই একটি সিদ্ধান্ত—যা প্রকাশ্যে ছোট, কিন্তু তাৎপর্যে বড়। সময়ই বলবে, এটি কেবল একটি সাময়িক সতর্কতার অধ্যায়, নাকি আঞ্চলিক রাজনীতির বৃহত্তর গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ।
আপনার মতামত জানানঃ