ঢাকার কেরাণীগঞ্জ ও শরিয়তপুরের জাজিরায় সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো আলাদা প্রেক্ষাপট থেকে জন্ম নিলেও এগুলো মিলিয়ে যে সামগ্রিক চিত্রটি তৈরি হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে বাড়তি সংবেদনশীলতা কাজ করে, তখন এ ধরনের বিস্ফোরণ শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। বরং এগুলো সমাজের ভেতরে জমে থাকা সহিংসতার প্রবণতা, দুর্বল নজরদারি এবং দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন সমস্যাগুলোরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
কেরাণীগঞ্জের দক্ষিণ হাসনাবাদ এলাকায় একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা প্রথমে স্থানীয়দের কাছে দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সেখানে কেউ হতাহত না হওয়ায় বিষয়টি আরও সীমিত পর্যায়ে থাকতেও পারত। কিন্তু ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্ফোরণের মাত্রা ছিল বেশ শক্তিশালী। ভবনের দুটি কক্ষের দেয়াল ও ছাদের অংশ ভেঙে পড়ে, পাশের সিএনজি গ্যারেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভারী দেয়ালের টুকরো বিশ থেকে পঁচিশ ফুট দূরে গিয়ে পড়ে। এত শক্তিশালী বিস্ফোরণ স্বাভাবিক কোনো গ্যাস লিক বা ছোটখাটো দুর্ঘটনার সঙ্গে মেলে না—এই প্রশ্নটিই তদন্তকারীদের সন্দেহের জায়গা তৈরি করে।
ঘটনার পর পুলিশ যে আলামত উদ্ধার করেছে, তা এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে। বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, নাইট্রিক এসিড, বিভিন্ন ধরনের পাউডার এবং একাধিক তাজা ককটেল—এসব উপাদান একসঙ্গে থাকা মানেই পরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরক তৈরির প্রস্তুতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিনের অতীত। তার বিরুদ্ধে আগেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একাধিক মামলা রয়েছে, উগ্রপন্থার অভিযোগ রয়েছে। ফলে কেরাণীগঞ্জের ঘটনাটি আর নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও এটিকে সম্ভাব্য জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্ট ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে।
এই ঘটনায় আরেকটি দিক স্থানীয়দের মধ্যে বাড়তি শঙ্কা তৈরি করেছে। বিস্ফোরণের কয়েক দিন পরও ঘটনাস্থলে আরেকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন, যাতে একজন আহতও হন। যদিও এ তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি নিশ্চিতকরণ নেই, তবু এটি দেখায় যে এলাকাটি কতটা অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে যদি এমন কার্যক্রম চলতে পারে, তাহলে অন্য কোথাও কী হচ্ছে—সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।
অন্যদিকে শরিয়তপুরের জাজিরার বিস্ফোরণ একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। এখানে কোনো আদর্শিক উগ্রবাদ বা জঙ্গি নেটওয়ার্কের চেয়ে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারই মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করছেন পুলিশ ও এলাকাবাসী। বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, যা নিজেই এই সহিংস সংস্কৃতির ভয়াবহতার প্রমাণ। জাজিরার বিলাসপুর এলাকায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই বহু পুরোনো। সময়ের সঙ্গে অস্ত্রের ধরন বদলেছে—ঢাল-সড়কি থেকে ককটেল ও হাতবোমা—কিন্তু সহিংসতার ধারাবাহিকতা থামেনি।
স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে আসে আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য: ককটেল বানানো এখানে অনেকটাই স্বাভাবিক একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকলে কয়েক মিনিটেই বোমা তৈরি করা যায়, এমন দক্ষতা বহু মানুষের রয়েছে। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন এই কাজ করেছেন বলেও স্বীকার করেছেন। এর মানে হলো, সহিংসতা শুধু রাজনৈতিক বা আদর্শিক নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। যখন বোমা বানানো একটি ‘পেশা’ হয়ে ওঠে, তখন তা দমন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে জাজিরার ঘটনায় নির্বাচনকেন্দ্রিক নাশকতার যোগসূত্র আছে কি না—এ প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে। জেলা পুলিশের দাবি, এটি পুরোপুরি স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের যুক্তি, এই এলাকায় বোমা বানানোর প্রবণতা নতুন নয় এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়কে লক্ষ্য করে বাড়ে না। কিন্তু অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এমন বিস্ফোরক সহজলভ্য হলে সেগুলো যে বৃহত্তর অস্থিরতায় ব্যবহৃত হবে না—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, স্থানীয় সহিংসতার উপকরণ বড় রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবহৃত হওয়ার নজির বাংলাদেশে নতুন নয়।
এই দুই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—দুটোই ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্ট অনেক মামলার আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, কেউ কেউ কারাগার থেকে পালিয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে বারবার। কেরাণীগঞ্জের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের পরিমাণ দেখে অনেকেই মনে করছেন, এটি ছোটখাটো কোনো পরিকল্পনা ছিল না; বরং বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতির ইঙ্গিতও এতে থাকতে পারে।
একই সঙ্গে জাজিরার মতো এলাকায় দীর্ঘদিনের সহিংস সংস্কৃতি অব্যাহত থাকাও রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ, যাতে তরুণরা বোমা বানানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধমূলক পথে না যায়। স্থানীয় আধিপত্যের রাজনীতি, গ্রুপিং এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে এই ধরনের বিস্ফোরণ থামানো কঠিন হবে।
জনমনে উদ্বেগ বাড়ার আরেকটি কারণ হলো তথ্যের অস্পষ্টতা। তদন্ত চলছে—এই যুক্তিতে অনেক তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না, যা স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে গুজব ও আশঙ্কাও ছড়িয়ে পড়ছে। নির্বাচনের আগে বড় ধরনের সহিংসতা হবে কি না, দেশে আবার জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পেলে মানুষের শঙ্কা কমে না। বরং প্রতিটি নতুন বিস্ফোরণ সেই শঙ্কাকে আরও গভীর করে।
সব মিলিয়ে কেরাণীগঞ্জ ও জাজিরার বিস্ফোরণ দুটি আলাদা ঘটনা হলেও এগুলো বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতার দুটি ভিন্ন দিক তুলে ধরে। একদিকে আদর্শিক উগ্রবাদ ও সংগঠিত নাশকতার সম্ভাবনা, অন্যদিকে স্থানীয় সহিংসতা ও অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। দুটোর কোনোটিই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের—তার উত্তর নির্ভর করছে রাষ্ট্র কত দ্রুত ও কতটা সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর। কার্যকর তদন্ত, দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা তৎপরতা এবং একই সঙ্গে সামাজিক আস্থার পুনর্গঠন—এই তিনটি একসঙ্গে না হলে বিস্ফোরণের শব্দ শুধু ভবন নয়, মানুষের মনে জমে থাকা ভয়ও বারবার কাঁপিয়ে
আপনার মতামত জানানঃ