বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সামরিক সক্ষমতা আর শুধু অস্ত্র আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রযুক্তি, উৎপাদন এবং দক্ষতার নিজস্ব ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক ড্রোন উৎপাদনের জন্য চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার চুক্তির উদ্যোগকে শুধু একটি প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ৬০৮ কোটি টাকার এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন একটি অধ্যায়ে নিয়ে যেতে পারে—যেখানে দেশ নিজেই ড্রোন তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের সক্ষমতা অর্জন করবে।
ড্রোন বা মানববিহীন আকাশযান এখন আর ভবিষ্যতের যুদ্ধের কল্পচিত্র নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা। নজরদারি, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষেত্রে ড্রোন একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক সামরিক শক্তিই ড্রোন প্রযুক্তিকে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ স্থল ও নৌ সীমান্ত, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব—সবকিছু মিলিয়ে ড্রোন সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া “মানববিহীন আকাশযান উৎপাদন কারখানা স্থাপন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর” প্রকল্পটি নিছক একটি অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়। এটি মূলত একটি জ্ঞান ও প্রযুক্তি অর্জনের পথ খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা। প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু ড্রোন কেনা নয়, বরং ড্রোন তৈরির প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি এবং পরিচালন দক্ষতা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হাতে আসবে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থ হলো—বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তোলা।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৮.০৮ কোটি টাকা, যার বড় অংশ—৫৭০.৬০ কোটি টাকা—ব্যয় হবে কারখানা আমদানি, স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য। বাকি অর্থ স্থানীয় খরচ, এলসি খোলা, ভ্যাট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ে ব্যবহৃত হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই অর্থ চার অর্থবছরে ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে এবং এর জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে আলাদা কোনো বাজেট বরাদ্দ নিতে হবে না। বিমান বাহিনীর বিদ্যমান বাজেট কাঠামোর মধ্যেই এই ব্যয় ব্যবস্থাপনা করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্ত অনুযায়ী, অতিরিক্ত কোনো বাজেট দাবি করা যাবে না এবং প্রতিটি অর্থব্যয় বিদ্যমান আর্থিক বিধি অনুসরণ করেই করতে হবে।
এই আর্থিক কাঠামো একদিকে যেমন সরকারের বাজেট শৃঙ্খলার বার্তা দেয়, অন্যদিকে তেমনই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে বাড়তি নজরদারির ইঙ্গিতও বহন করে। পাঁচটি কঠোর শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়াই বলে দেয় যে সরকার এটি নিয়ে সতর্ক এবং হিসাবনিকাশের বাইরে যেতে চায় না। অনুমোদিত অর্থ শুধু নির্ধারিত চুক্তির ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে—এমন শর্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি প্রয়াস হিসেবেই দেখা যায়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে, যারা চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রযুক্তি সহায়তা নেবে। এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরাসরি সামরিক ড্রোন উৎপাদনের একটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুধু উৎপাদন নয়, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং ভবিষ্যতে উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের সুযোগও এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের অংশ হতে পারে। ফলে এটি একবারের বিনিয়োগ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির প্রক্রিয়া।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কেন ড্রোন উৎপাদন, এবং কেন এখন? উত্তরটি খুঁজতে গেলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়। দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল দিন দিন কৌশলগতভাবে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। আকাশ নজরদারি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সীমান্ত পর্যবেক্ষণে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বারবার ড্রোন আমদানি করা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, বরং কৌশলগতভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন তৈরি, আপগ্রেড বা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া ড্রোন প্রযুক্তি শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কিংবা অবকাঠামোগত জরিপের মতো বেসামরিক ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে। যদিও বর্তমান প্রকল্পটি সামরিক প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ, তবুও প্রযুক্তি ও দক্ষতার একটি ভিত্তি তৈরি হলে ভবিষ্যতে এর বেসামরিক ব্যবহারও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক দেশেই সামরিক প্রযুক্তির বেসামরিক প্রয়োগ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে।
প্রকল্পটির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি হস্তান্তর। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো—তারা অনেক সময়ই শুধু পণ্য কিনে, কিন্তু প্রযুক্তি বা জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তারা একই সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়। এই প্রকল্পে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকায় আশা করা যায়, বাংলাদেশ শুধু যন্ত্রপাতি নয়, বরং দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানও অর্জন করবে। এটি ভবিষ্যতে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়নের পথ খুলে দিতে পারে।
অবশ্য এই ধরনের প্রকল্প নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নীরবতা ও সংযত মন্তব্য লক্ষ্য করা যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলতে আগ্রহী নয়। অর্থ উপদেষ্টা কিংবা আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মন্তব্যেও সেই সংযম স্পষ্ট। সামরিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে এই নীরবতা প্রকল্পটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তোলে। কারণ, এমন উদ্যোগ সাধারণত কৌশলগত হিসাব-নিকাশের সঙ্গেই যুক্ত থাকে।
এই প্রকল্প অনুমোদনের আগে যৌথ বাহিনী কমিটির নীতিগত অনুমোদন এবং একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে। চুক্তির মূল্যও আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে আনা হয়েছে, যা আর্থিক দিক থেকে সরকারের জন্য ইতিবাচক। প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় কয়েক দশ কোটি টাকা কম ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের দরকষাকষির সক্ষমতাও তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে, সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাংলাদেশকে শুধু একটি নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করছে না, বরং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার দিকে একটি ধাপ এগিয়ে দিচ্ছে। এটি এমন এক বিনিয়োগ, যার ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নাও হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর হতে পারে। দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন এবং কৌশলগত স্বাধীনতা—এই তিনটি দিক থেকেই প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ যখন ধীরে ধীরে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে এগোচ্ছে, তখন প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সক্ষমতার প্রশ্নও নতুন করে সামনে আসছে। ড্রোন কারখানার এই উদ্যোগ সেই বড় ছবিরই একটি অংশ। এটি দেখায় যে দেশ শুধু বর্তমান প্রয়োজন নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও সক্ষমতার কথাও ভাবছে। সময়ই বলবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়, তবে নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ