মধ্যযুগের ভারত মানেই যেন একটানা ক্ষমতার টানাপোড়েন, রাজসিংহাসনের দখল নিয়ে অবিরাম যুদ্ধ, আর ইতিহাসের পাতায় বারবার নাম বদল। সেই অস্থির সময়েই হঠাৎ করে উঠে আসেন এক মানুষ—হেমচন্দ্র, যিনি ইতিহাসে বেশি পরিচিত হিমু নামে। সাধারণ এক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠেন এমন একজন সেনানায়ক, যাকে কেউ কেউ ডাকেন ‘মধ্যযুগের নেপোলিয়ন’, আবার কেউ তুলনা করেন সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, এতগুলো যুদ্ধে জেতা মানুষটি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকলেন একটি ছোট ভুলের কারণে, যা তাকে এনে দেয় পরাজয়, আর ভারতীয় ইতিহাসকে নিয়ে যায় এক ভিন্ন পথে।
হিমুর জন্ম হরিয়ানার রিওয়ারি অঞ্চলের এক সাধারণ পরিবারে। পারিবারিক মুদি দোকান, কখনো লবণ বিক্রি—এই ছিল তার শুরুর জীবন। পরবর্তীকালে মুঘল দরবারের ইতিহাসকাররা অনেক সময় এই বিষয়টি অবহেলার সুরে উল্লেখ করেছেন, যেন তার উত্থানটা ছিল অসম্ভব কিছুর মতো। কিন্তু বাস্তবে এই সাধারণ পটভূমিই তাকে আলাদা করে তোলে। তিনি রাজপুত বা কোনো অভিজাত বংশের সন্তান ছিলেন না, কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা, হিসাববোধ আর বাস্তববুদ্ধি দিয়ে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেন ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি।
শের শাহ সূরির শাসনামলে এবং পরে তার উত্তরসূরিদের আমলে হিমু নিজেকে প্রমাণ করেন একজন দক্ষ সংগঠক ও প্রশাসক হিসেবে। ডাক বিভাগ থেকে শুরু করে গোয়েন্দা দপ্তর—সবখানেই তার ছাপ ছিল স্পষ্ট। শুধু হিসাবনিকাশ নয়, যুদ্ধক্ষেত্রেও যে তিনি অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, তা খুব দ্রুতই বোঝা যায়। একের পর এক যুদ্ধে জয় তাকে এনে দেয় সেনাবাহিনীর আস্থা, আর শাসকের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন অপরিহার্য। একসময় তাকে দেওয়া হয় ‘ভাকিল-ই-আলা’ বা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা।
এই উত্থানের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় আসে দিল্লি দখলের সময়। মুঘল শক্তি তখন দুর্বল, ক্ষমতার কেন্দ্র টালমাটাল। হিমু সেই সুযোগ কাজে লাগান নিখুঁত পরিকল্পনায়। বিশাল বাহিনী, যুদ্ধহাতি আর কামান নিয়ে তিনি দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। পথে মুঘল গভর্নররা আতঙ্কে শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। দিল্লিতে প্রবেশ করে তিনি নিজেকে ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধিতে ভূষিত করেন, নিজের নামে মুদ্রা চালু করেন এবং কার্যত ঘোষণা দেন—এটা শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, এটা শাসনের দাবিও।
এই সময়টুকু খুব দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু প্রতীকী গুরুত্ব ছিল বিপুল। বহু ইতিহাসবিদের মতে, দিল্লিতে এই সংক্ষিপ্ত শাসন দেখিয়ে দেয় যে মধ্যযুগের ভারতে মুসলিম শাসনের পাশাপাশি অন্য শক্তির উত্থানও সম্ভব ছিল। হিমু কেবল একজন সেনানায়ক নন, তিনি নিজেকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন—এটাই তাকে আলাদা করে।
কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। মুঘল শিবিরে তখন তরুণ আকবর, বয়স মাত্র চৌদ্দ। বাস্তবে যুদ্ধের ভার তার হাতে না থাকলেও, তার অভিভাবক ও সেনাপতি বৈরাম খাঁ জানতেন—এটা হারলে শুধু দিল্লি নয়, সমগ্র হিন্দুস্তান হাতছাড়া হতে পারে। পানিপথের ময়দান আবার ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, যেমন হয়েছিল বাবরের সময়।
হিমুর বাহিনী ছিল বিশাল এবং ভয়ংকর। অসংখ্য অভিজ্ঞ অশ্বারোহী, শত শত যুদ্ধহাতি—যাদের পিঠে চড়া সৈন্যরা তীর ও বর্শা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত শত্রুর ওপর। যুদ্ধের শুরুতে পাল্লা ছিল হিমুর দিকেই ভারী। মুঘল সেনারা চাপে পড়ে যায়, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায়, সেই সময় আকবর নিজেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন, ভাবছিলেন কীভাবে এই বিপদ কাটানো যায়।
ঠিক তখনই ঘটে সেই মুহূর্ত, যাকে ইতিহাসবিদরা বলেন ‘দুর্ঘটনা’, আবার কেউ বলেন ‘অবিবেচনা’। হিমু যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন কোনো বর্ম ছাড়াই, হাতির পিঠে দাঁড়িয়ে। তিনি চিৎকার করে সৈন্যদের উজ্জীবিত করছিলেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সাহসের দিক থেকে এটা ছিল অতুলনীয়, কিন্তু নিরাপত্তার দিক থেকে ভয়ংকর ঝুঁকি। হঠাৎই একটি তীর এসে বিঁধে যায় তার চোখে, ভেদ করে মাথার খুলি। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়।
আহত অবস্থায়ও হিমু নাকি তীরটি নিজে টেনে বের করেন, ক্ষত ঢেকে আবার লড়াই চালিয়ে যেতে চান। কিন্তু সেনাপতি যখন অচেতন হয়ে পড়েন, তখন সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বহীনতার কারণে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। মুঘলরা এই সুযোগ কাজে লাগায়।
এরপরের ঘটনা আরও করুণ। আহত ও অচেতন হিমুকে ধরা হয়, শিকল পরিয়ে আনা হয় তরুণ আকবরের সামনে। ইতিহাসে এ নিয়ে মতভেদ আছে—আকবর নিজে কতটা ভূমিকা নিয়েছিলেন, আর বৈরাম খাঁ কতটা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত যা ঘটে, তা হলো হিমুর শিরোচ্ছেদ। একসময় যে মানুষটি দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন, তার পরিণতি হয় যুদ্ধবন্দির মতো।
এই পরাজয় শুধু একজন মানুষের পতন নয়, বরং ইতিহাসের এক মোড়। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যদি সেই তীর না লাগত, যদি হিমু আর কয়েক ঘণ্টা নেতৃত্ব দিতে পারতেন, তবে হয়তো মুঘল ইতিহাসটাই অন্যরকম হতো। দিল্লিতে হয়তো একটি ভিন্ন রাজবংশের সূচনা হতো, ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যেতে পারত।
হিমুর মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি। কেউ তাকে দেখেন হিন্দু শাসনের প্রতীক হিসেবে, কেউ আবার বলেন তিনি ছিলেন নিছক ক্ষমতালোভী এক সেনানায়ক। তবে এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই—তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সৈন্যকেই নিজের বাহিনীতে জায়গা দিয়েছিলেন, দক্ষতাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন পরিচয়ের চেয়ে বেশি। তার উত্থান দেখিয়ে দেয়, মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজে সামাজিক গতিশীলতা একেবারে অসম্ভব ছিল না।
একটি মুদি দোকান থেকে দিল্লির সিংহাসন—এই যাত্রা শুধু রোমাঞ্চকর নয়, গভীর অর্থবহও। হিমু আমাদের মনে করিয়ে দেন, ইতিহাস কেবল রাজবংশের গল্প নয়; কখনো কখনো তা এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ সাহসের কথাও বলে। আর সেই সাহস যদি এক মুহূর্তের ভুলে থেমে যায়, তবে সেটাই হয়ে ওঠে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘যদি’।
আপনার মতামত জানানঃ