Trial Run

যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনে দুর্নীতির অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জের লাখাইয়ে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের পরপরই তা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। পুরাতন কম্পিউটার কোনো রকমে সচল করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে। যদিও দেওয়া হয়নি কোনো ভাউচার কিংবা ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি কার্ড। ল্যাব স্থাপনের পরপরই বিদ্যালয়গুলোর ১৯টি কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যায়।

শুধু তাই নয়, যে প্রতিষ্ঠান থেকে কম্পিউটার ক্রয়ের ভাউচার দেখানো হয়েছে তারও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদার উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকরামুল মজিদ চৌধুরী শাকিলের বিরুদ্ধে। এরপর সেই একই প্রকল্পের আওতায় লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন ও দন্ত চিকিৎসার যন্ত্রপাতি সরবরাহের দায়িত্বও দেওয়া হয় ওই ঠিকাদারকে।

তেঘরিয়া এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আমিরুল ইসলাম আলম জানান, তার বিদ্যালয়ে গত বছরের অক্টোবরে জাইকা প্রকল্পের অর্থায়নে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়। ২৪টি কম্পিউটার দেয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ১৯টিই নষ্ট হয়ে যায়। বার বার তাগাদা দেয়ার পর গত ৪ মার্চ ১৪টি মেরামত করে দেন ঠিকাদার। কিন্তু ৬ মার্চ সকালেই সেগুলো আবার নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, তাকে কম্পিউটারগুলোর কোনো ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি কার্ড দেয়া হয়নি। এমনকি কোনো রিসিটও দেয়নি। কম্পিউটারগুলোর যে অবস্থা তাতে ল্যাব বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকেও জানানো হয়েছে।

যুবলীগ নেতা ঠিকাদার ইকরামুল মজিদ চৌধুরী শাকিলের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিদ্যুতের সমস্যার কারণে এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। কোম্পানির লোকজন এসে ঠিক করে দিবেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে বারবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. মুশফিউল আলম আজাদ জানান, বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য উপজেলা প্রকৌশলী শাহ আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেটি খতিয়ে দেখবেন। এরপর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, গত বছরের ৩০ এপ্রিল জাইকা’র অর্থায়নে পরিচালিত উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের কর্মসূচিতে লাখাই উপজেলার রাঢ়িশাল করাব উচ্চ বিদ্যালয় ও তেঘরিয়া এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কম্পিউটার, টেবিল ও চেয়ার দিয়ে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল সামগ্রী প্রদান ও ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে করাব ইউনিয়নে বড় গোপাটের খাল থেকে আজদার মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত আরসিসি উন্মুক্ত ড্রেন নির্মাণ দরপত্র আহ্বান করে এলজিইডি। ৩টি কাজেরই ঠিকাদার নিযুক্ত হন লাখাই উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকরামুল মজিদ চৌধুরী শাকিল।

দরপত্র অনুসারে গত অক্টোবরে উপজেলার রাঢ়িশাল করাব উচ্চ বিদ্যালয় ও তেঘরিয়া এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করেন। দরপত্র অনুযায়ী দুটি বিদ্যালয়ে ‘ডেল কোম্পানির অপটিপ্লেক্স-৩০২০, কোরআই-৩ মডেলের’ ৪৮টি কম্পিউটার সরবরাহ করেন ঠিকাদার। সরবরাহের কয়েকদিন পরই তেঘরিয়া এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪টি ও রাঢ়িশাল করাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫টি কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যায়।

ঠিকদারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকৃত সবকটি কম্পিউটার বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ডেল কোম্পানির। কিন্তু সবগুলো মডেলের কম্পিউটার কমপক্ষে ৪ বছর আগে আমদানি বন্ধ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের আমদানীকারকরা। এমনটা জানা গেছে স্টার টেক ও গ্লোবাল ব্র্যান্ড নামের দুইটি আমদানীকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে আলাপ করে।

ডেল’র ওয়েবসাইটে গিয়ে সরবরাহকৃত কম্পিউটারগুলোর মধ্যে 2FQJ102, 2VPJ102 ও 3Z8K102 সার্ভিস ট্যাগ যাচাই করে করে দেখা যায়, এগুলো ২০১৪ সালে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। আর বিক্রয় করা হয় ২০১৬ সালে। সার্ভিস ওয়ারেন্টির মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত।

এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাখিলকৃত কম্পিউটার ক্রয়ের রশিদ থেকে জানা যায়, শাকিল চৌধুরী ‘রিয়েল ওয়ান’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কম্পিউটারগুলো ক্রয় করেন। রশিদে প্রতিষ্ঠানের যে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে গিয়ে বাস্তবে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরে তাদের মোবাইল ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে শিহাব আহমেদ নামে এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেন। তিনি জানান, তারা মূলত কম্পিউটার সার্ভিসিংয়ের কাজ করেন। তবে কম্পিউটার সাপ্লাইয়ের অর্ডার পেলে তিনি ঢাকার বিভিন্ন দোকান থেকে সংগ্রহ করে দেন। তিনি বলেন, আমি নিজে বিক্রয়কৃত কম্পিউটারের ১ বছরের ওয়ারেন্টি দেই। নষ্ট হলে নিজেই ঠিক করে দেই।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে রয়েছেন অসংখ্য বিতর্কিত নেতাকর্মী। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতারা এ ধরনের টেন্ডারের কাজ নিয়ে থাকে, যাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা অভিযোগ করতেও ভয় পান। তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সরকারের ব্যাপক অর্জনের মধ্যেও সমালোচনা হচ্ছে। বিতর্কিত এসব নেতার পৃষ্ঠপোষকতা করছেন একশ্রেণির সংসদ সদস্য। এ কারণে তাদের দাপট অনেক বেশি। স্থানীয় থানা ও প্রশাসন যুবলীগ-ছাত্রলীগের এ ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না। কোনো কোনো কর্মকর্তা ব্যবস্থা নিতে গেলে ঐ কর্মকর্তাকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত কর্মকর্তা বলে বদলিসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। সরকারের সমালোচনা ঠেকাতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এবিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের যথাযথ ভূমিকা পালনের দাবি জানান তারা।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/১৩৪০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ