Trial Run

ক্রমাগত ইসলামবিদ্বেষ বাড়ছে ইসরায়েলে: মসজিদের পর এবার আযান বন্ধের নির্দেশ

Photo : CFR/Reuters

শুভ্র সরকার : প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশদের হাতে প্যালেস্টাইন তুলে দেয় লীগ অব নেশন্স। সেখানে ব্রিটিশ শাসন চলেছে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে যে ইহুদী নিধনযজ্ঞ (হলোকাস্ট) চলে, তার শিকার হন লাখ লাখ ইহুদী। তখন থেকে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর স্বীকৃতির জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে।

১৯৪৭ সালের ২৯ শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্যালেস্টাইন ভাগ করার পরিকল্পনায় একটি আরব এবং একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। এই পরিকল্পনায়  জেরুসালেম নগরীর জন্য একটি বিশেষ কৌশল গ্রহণের কথা বলা হয়।

ইসরায়েল পরিকল্পনাটি মেনে নিলেও প্রত্যাখ্যান করেছিল আরবরা। এই পরিকল্পনাকে আরবরা দেখছিল তাদের ভূমি কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে। কিন্তু প্যালেস্টাইনের ওপর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার মাত্র একদিন আগে ইহুদীরা ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেয়।

ইসরায়েলের মোট জনগোষ্ঠীর ২০%-ই আরব এবং তাদের অধিকাংশই মুসলমান। তবু ক্রমাগতভাবে দেশটি ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।

আযান বন্ধের নির্দেশ

গত বৃহস্পতিবার থেকে ঐতিহ্যবাহী পুরিম উৎসব উদযাপন করছে ইসরায়েলি ইহুদিরা। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ইহুদি ধর্মানুসারীদের এই উৎসব উদযাপনে যেন কোনও সমস্যা না হয়, সেজন্য দখল করা পশ্চিম তীরের ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদে আজান বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি সরকার।

মসজিদটির পরিচালক শেখ হেফজি আবু স্নেইনা জানিয়েছেন, শনিবার রাত পর্যন্ত আজান দেওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞা থাকবে। তার মতে, ইসরায়েলিদের এই আচরণ ধর্ম-পালন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

এটিকে ‘ধর্মীয় যুদ্ধের আহ্বান’ উল্লেখ করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ফিলিস্তিন। দেশটি পশ্চিম তীরের পরিচয়পত্রধারীদের আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়ায় নিষেধাজ্ঞা এবং ইব্রাহিমি মসজিদের সংস্কার কাজে বাধা দেওয়ারও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

ইব্রাহিমি মসজিদের মতো পবিত্র স্থাপনাগুলো সুরক্ষায় আইনি ও নীতিগত অধিকার ফিরে পেতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে সাহায্য চেয়েছেন ফিলিস্তিনিরা।

তাদের দাবি, প্রাচীন শহর হেব্রনকে ইহুদিপূর্ণ করা এবং সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কারের চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এ ধরণের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বলেছিলেন, আযানের শব্দ সীমিতকরণের এই উদ্যোগ মূলত বহু ইসরায়েলি নাগরিকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নেয়া হয়েছে।

মসজিদ বন্ধ ঘোষণা

২০১৭ সালে ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনের আল-খলিল শহরের ইব্রাহিম (আ.) মসজিদটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে ইউনেস্কো। সেই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি বন্ধ করে দিয়েছিলো ইসরাইলি বাহিনী। এ মসজিদের পাশে হযরত ইব্রাহিম (আ.), হযরত ইসহাক (আ.), হযরত ইয়াকুব (আ.) ও হযরত ইউসুফ (আ.)-এর কবর থাকায় মসজিদটি মুসলমানদের কাছে খুবই সম্মানিত একটি স্থাপনা।

এ প্রসঙ্গে বার্তা সংস্থা ওয়াফা’কে ইব্রাহিম (আ.)-এর কবর ও মসজিদের পরিচালক হাফেজ আবু সেনেইনেহ জানান, ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করছে ইসরাইল। তিনি বলেন, অবৈধ বাসিন্দাদের যাতায়াতের পথ তৈরি করে দিতেই মসজিদটি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।

তিনি আরো বলেন, মসজিদ বন্ধের ঘোষণা ধর্মীয় অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইসরাইল এর মাধ্যমে সব ধরনের রীতি-নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালের পবিত্র রমজান মাসে এক চরমপন্থী ইহুদি হযরত ইব্রাহিম (আ.) মসজিদে হামলা চালিয়ে ২৯ জন মুসলমানকে হত্যা করে। আহত হয় আরো ১৫০ জন মুসল্লি।

আল আকসা মসজিদের উপর নিষেধাজ্ঞা

ইসরায়েল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের প্রধান দ্বার লায়ন্স গেটের সামনে এক সময় মেটাল ডিটেক্টর বসানোর প্রতিবাদে বাইরে নামাজ পড়েছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি আরবরা। এরপর এ নিয়ে বড় বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলের পুলিশ নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা জানায়।

ইসরায়েলি পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘৫০ কিংবা তার বেশি বয়সের পুরুষরা শুধু ওল্ড সিটি ও টেম্পল মাউন্টে প্রবেশ করতে পারবে। সব বয়সী নারী সেখানে প্রবেশ করতে পারবে।’

মসজিদুল আকসায় মুসল্লিদের মারধর

গত বছর বিশ্বের মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান মসজিদুল আকসায় মুসল্লিদের মারধর করে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী। এর ফলে বেশ কয়েকজন মুসল্লি মারাত্মক আহত হয়েছিল। এ সময় কয়েকজনকে টেনে-হিঁচড়ে সঙ্গে করে নিয়েও যায় হামলাকারীরা। আজ জুমার নামাজের সময় এ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনার সময় মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (স.)’র স্পর্শধন্য এই মসজিদে নামাজ পড়তে আজ হাজার হাজার মুসল্লি সেখানে উপস্থিত হলেও অনেকেই ভেতরে ঢুকতে পারেননি। তাদেরকে প্রবেশদ্বার থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা বাধ্য হয়ে মসজিদের আশেপাশের সড়ক ও গলিতে নামাজ আদায় করেছেন।

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জায়গায় নতুন বসতি নির্মাণ করে যাচ্ছে ইসরাইল

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন

আন্তর্জাতিক আইনে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন অবৈধ হলেও ইসরায়েলের পরিকল্পনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম প্ল্যানিং কাউন্সিল পশ্চিম তীরে পুনরায় বসতি স্থাপনের ঘোষণা দেয়।

এ প্রসঙ্গে বসতি স্থাপনের ঘোষণা আরব-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি বাস্তবায়য়ে বিঘ্নতা তৈরি করবে জানায় ইসরায়েলের সেবা সংস্থা পিস নাও।

ইসরায়েলের বেসরকারি সেবা সংস্থা পিস নাও জানায়, ‘ইসরায়েলের পুনরায় বসতি স্থাপন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ইসরায়েল-আরব শান্তি চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করবে। এটি ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর পশ্চিম তীরে পুনরায় বসতি স্থাপনে মনোযোগী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।’

পশ্চিম তীরে পুনরায় বসতি স্থাপনের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র আবু রাদিনাহ জানান, ইসরায়েলের ঘোষণাটি আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘনের শামিল। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব পুরোপুরি অবৈধ।’

তিনি আরো জানান, ‘ট্রাম প্রশাসনের দখলদারিত্বের অনুমোদন, অন্তসার শূণ্য স্বাভাবিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার সুযোগে বসতি স্থাপন রাজনীতির মাধ্যমে নেতানিয়াহু সরকার ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডকে আত্মসাতের অপচেষ্টা করছে।’

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার মতপার্থক্য

জেরুসালেম: ইসরায়েল দাবি করে জেরুসালেমের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয়। এরপর থেকে তারা জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী বলে গণ্য করে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে চায়।

সীমান্ত এবং এলাকা নিয়ে বিরোধ: ফিলিস্তিনিরা চায় ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে যে সীমান্ত ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। ইসরায়েল এটা মানতে নারাজ।

ইহুদী বসতি: ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সেখানে তারা অনেক ইহুদী বসতি গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। কেবল পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমেই এখন বসতি গেড়েছে পাঁচ লাখের বেশি ইহুদী।

ফিলিস্তিনি শরণার্থী: ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। এরা ইসরায়েলের ভেতর তাদের বাড়ীঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে। পিএলও’র হিসেবে এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। কিন্তু ইসরায়েল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। তাদের আশংকা, এত বিপুল সংখ্যাক ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলে ফিরে আসে, তাদের রাষ্ট্রের ইহুদী চরিত্র আর ধরে রাখা যাবে না।

এসডব্লিউ/এসএন/১৮০৫

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 96
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    96
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ