Trial Run

মোটরসাইকেল নয়, গণপরিবহনকে বিকশিত করার দাবি

ছবি: কালের কন্ঠ

সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে, সড়কে চলাচলকারী পথচারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোটরসাইকেল নিবন্ধন ফি কমানো ও সিসি ১৬৫ থেকে বৃদ্ধি করে ৩৫০ সিসিতে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে গণপরিবহনকে বিকশিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ দাবি জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ছোট্ট এই দেশে রাস্তার পরিমাণ বিবেচনায় না নিয়ে প্রতিবছর প্রায় তিন থেকে চার লাখ মোটরসাইকেল রাস্তায় নামছে, বিপরীতে গণপরিবহন তথা বাসের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে কমছে। গণপরিবহনের এই ভুলনীতি বন্ধ না হলে অচিরেই দেশের যেকোনো পথে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়বে। দেশে মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব, যাত্রী হয়রানী, ভাড়া নৈরাজ্য, যাত্রীসেবার মান, কর্মসংস্থানের অভাবসহ নানা কারণে মানুষ মোটরসাইকেলকে নিরাপদ বাহন ও কর্মসংস্থানের বিকল্প উপায় হিসেবে মনে করছে।

বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত ৪৪ লাখ যানবাহনের বিপরীতে ৩১ লাখ মোটরসাইকেল রয়েছে। নিবন্ধনবিহীন আরও তিন থেকে চার লাখ মোটরসাইকেল রাস্তায় চলছে। অথচ মোটরসাইকেল চালকদের মাত্র ১৮ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান মতে, দেশে ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ৬৭৩৬টি যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ১৬৭১টি। যা মোট আক্রান্ত যানবাহনের ২৪.৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ৭৩৫৬টি যানবাহনের মধ্যে ১৫৬৩টি মোটরসাইকেল সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। যা মোট আক্রান্ত যানবাহনের ২১.৪ শতাংশ।

এতে দেখা গেছে, গত এক বছরে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার বেড়েছে ৩.৪ শতাংশ। দেশের একমাত্র এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকা-মাওয়া-পাচ্চর জাতীয় মহাসড়ক ছাড়া অন্য কোনো মহাসড়কে ১০০ কিলোমিটার গতিতে নিশ্চিন্তে মোটরসাইকেল চালানোর সুযোগ নেই। রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান মহানগরীতে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন না থাকায় ট্রাফিক আইন ভাঙার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, শুধু নিবন্ধনের ফি নয়, দামও কমিয়ে দিয়ে মানুষকে মোটরসাইকেল ব্যবহারে উৎসাহী করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে গণপরিবহন বাড়ানো হচ্ছে না। সারা বিশ্বে গণপরিবহণ উন্নতি করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র উল্টো। তাই বেশি বেশি মোটরসাইকেলে ক্রয় করছে মানুষ। এছাড়াও বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোটরসাইকেল সংস্কৃতি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের যারা রাজনীতির সাথে জড়িত তারা বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালচ্ছে। তবে মোটরসাইকেল নিরুৎসাহিত করে গণপরিবহনকে উন্নত করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

পঙ্গু হাসপাতালের তথ্য মতে, প্রতিবছর গড়ে সাড়ে সাত থেকে আট হাজার পঙ্গু রোগী মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট কমাতে চীনের পাঁচটি মহানগরীসহ পৃথিবীর বহু দেশের প্রধান প্রধান মহানগরীতে মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করেছে।

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সড়কে শৃঙ্খলা আনতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দেওয়া ১৮ নির্দেশনার মধ্যে মোটরসাইকেল চালনায় সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে হেলমেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তার আগে থেকেই তিন আরোহী নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এখন আর মোটরসাইকেল চলাচলে কঠোর নজরদারি নেই।

সূত্র জানায়, রাজধানীর প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে মোটরসাইকেলচালকদের কারণে পথচারী ও যাত্রীরা ত্যক্তবিরক্ত। বেশির ভাগ মোটরসাইকেল চালকই অন্য যানবাহনকে অতিক্রম যাওয়ার চেষ্টা করে সবসময়। সে ক্ষেত্রে তারা নিয়ম না মেনে উল্টোপথে, ফুটপাত দিয়েও বাহনটি চালিয়ে যায়। বাজাতে থাকে হর্ন। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার ছাড়াও চুক্তিতে মোটরসাইকেল চলছে রাজধানীতে। সে কারণে মোড়ে মোড়ে যেন মোটরসাইকেলের বাজার বসে। গুলশান, কুড়িল, বাড্ডা, ধানমণ্ডি-২৭, মৌচাক, মালিবাগ, শাহবাগ, সায়েদাবাদ, তেজগাঁও সাতরাস্তা, মগবাজার, বিমানবন্দর রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে ডেকে ডেকে যাত্রী তোলে মোটরসাইকেল চালকরা।

ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মুনিবুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেসব জায়গায় দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেলে চলছে ওইসব এলাকায় কিছু লেন থাকলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে যেসব জায়গায় রাস্তা বড় আছে, সেই সব জায়গায় লেন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সংস্থার সাথে সম্বনয় করে লেন করা হবে। এছাড়া সবাই সচেতন ও আইনের বাস্তবায়ন করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্মের মাধ্যমে মোটরসাইকেল ভাড়ায় ব্যবহারের কারণে দেশের কর্মহীন বিপুল সংখ্যক যুবগোষ্ঠী ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে আয়ের পথ বেঁচে নিলেও কার্যত একটি আদর্শ রাষ্ট্রে গণপরিবহনকে বিকশিত করার কোনো বিকল্প নেই। তাই এই মুহূর্তে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, মোটরচালিত রিক্সাসহ ছোট ছোট যানবাহনের লাগাম টেনে ধরতে হবে। আইন বা জরিমানা করে সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি রোধ সম্ভব নয়। বরং আইন ও নিয়ম-কানুন যাতে মানুষ মেনে চলে সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/২০৫০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ