Trial Run

আবেদন না করেই চাকরি, নিয়মের থোরাই কেয়ার করেছে চসিক

ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) বিভিন্ন পদে চাকরিতে প্রবেশের কোনো নিয়মেরই ধার ধারেনি কর্তৃপক্ষ। নিয়োগের জন্য পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, নেওয়া হয়নি লিখিত পরীক্ষাও। নামমাত্র মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হলেও তাতে অংশ নিতে চিঠিও ইস্যু করা হয়নি। এমনকি অনেকে আবেদন না করেও চাকরি পেয়েছেন। এমনি অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন ২৭ জন কর্মচারী। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কর্মচারী নিয়োগে এসব গুরুতর অনিয়ম উঠে এসেছে।

কর্মচারী নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে গত বছরের ২৪ নভেম্বর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। ২৪ ডিসেম্বর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে কমিটি করা হয়। ৩১ জানুয়ারি চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

জাতীয় এক দৈনিক থেকে জানা যায়, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ উপবিভাগে পাঁচজন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি ও নয়জন বৈদ্যুতিক সহকারীর মৃত্যুজনিত এবং দু’জন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি ও পাঁচজন বৈদ্যুতিক হেলপারের অনুপস্থিতির কারণে ২১টি পদ খালি হয়। এসব পদে নতুনভাবে নিয়োগ বা অন্য বিভাগ থেকে পদায়নের জন্য সিটি করপোরেশনের পানি ও বিদ্যুৎবিষয়ক স্থায়ী কমিটির ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবরের সভায় সিদ্ধান্ত হয়। একই সভায় মৃত কর্মচারীদের পোষ্যদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত পঞ্চম নির্বাচিত পরিষদের ২৭তম সাধারণ সভায় অনুমোদিত হয়।

সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) ঝুলন কুমার দাশ আটজন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি ও ১৮ জন বৈদ্যুতিক হেলপার (সহকারী) নিয়োগের বিষয়ে উদ্যোগ নেন। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর লোকবল নিয়োগের বিষয়টি তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন অনুমোদন দেন। গত বছরের ২৬ জুলাই মৌখিক পরীক্ষার দিন ধার্য করা হয়। তবে এর জন্য চিঠিও দেওয়া হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এসব কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকারের জন্য কার্ডও ইস্যু করা হয়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত আবেদনের ভিত্তিতে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে অধিকতর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। শূন্যপদে লোক নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে সভা আহ্বানে সচিবালয় বিভাগের কার্যকরী উদ্যোগ পরিকল্পিত হয়নি। বিদ্যুৎ উপবিভাগ থেকে ২৩টি আবেদন পাওয়া যায়। তবে গত বছরের ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত মৌখিক পরীক্ষায় ২৮ জন অংশ নেন। ২৮ জুলাই ২৭ জনকে দৈনিক ৩৫৭ টাকা মজুরিতে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে পাঁচটি সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের যে কোনো শূন্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং যে কোনো ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতি বোর্ডের মাধ্যমে প্রদানের সুপারিশ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তি ছাড়া বৈদ্যুতিক হেলপার নিয়োগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশ। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উপবিভাগ জনবল নিয়োগের জন্য চাহিদা দিয়েছিল। লোক নিয়োগ দেয় সচিবালয় বিভাগ। নিয়োগে আমাদের কোন ভূমিকা ছিল না। এ ব্যাপারে কর্মচারী নিয়োগকালীন সিটি করপোরেশনের সচিব আবু শাহেদ চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। বদলি হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে বিদায় নিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক সিটি করপোরেশনের সচিবের দায়িত্বে থাকা মফিদুল আলমের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মফিদুল আলম ওই জাতীয় দৈনিককে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত হয়েছে। প্রতিবেদনটি এখন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দেবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটা নিয়ম আছে। দেশের সমস্ত নিয়োগের বিপরীতেই সে নিয়ম অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি দফতরের বাইরেও ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসব নিয়ম পালন করে নিয়োগ করে থাকে। যখন এসবের নিয়ম তোয়াক্কা না করে নিজেদেরে মনমতো নিয়োগ দিয়ে থাকেন, তখন নিয়ম লঙ্ঘনের অপরাধই নয়, নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে কী ফায়দা লুটাতে চান এটাও বিবেচ্য বিষয়। কেননা, নিজেদের লোকদের নিয়োগ দেওয়ার এক রেওয়াজ ছড়িয়ে আছে। নিজেদের লোকদের নিয়োগের মাধ্যমেই যে মোটা অঙ্কের টাকা হস্তগত করা হয়, শুধু তা নয়। নিয়োগকৃতদের মাধ্যমে আরও বড় বড় দান মারার উদ্দেশ্যেও নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। এতে যোগ্যরা বঞ্চিত হবার পাশাপাশি অযোগ্যদের হাতে পড়ে প্রতিষ্ঠানেরও নাজুক অবস্থা তৈরী হয় বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা এর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান।

এসডব্লিউ/ডিএস/কেএইচ/১৫০৭ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ