Trial Run

ভ্যাকসিন উপহার নিয়ে হাঙ্গেরি-বাংলাদেশের এ কেমন খেলা!

ছবি : ঢাকাট্রিবিউন

গত রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সংসদে জানিয়েছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত দেশ হাঙ্গেরি বাংলাদেশের কাছে পাঁচ হাজার টিকা চেয়েছে৷ এই টিকা পাঠানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার৷ হাঙ্গেরি ছাড়াও দক্ষিণ অ্যামেরিকার দেশ বলিভিয়াও কিছু টিকা চেয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি৷ তবে এবার শোনা গেলো ভিন্ন কথা। বাংলাদেশই হাঙ্গেরিকে শুভেচ্ছা-স্বরুপ ৫ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন উপহার দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। তবে বাংলাদেশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেয় হাঙ্গেরি। ভ্যাকসিন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এই খেলা নিয়ে দেশে নতুন এক রহস্যের জন্ম দিয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যম ‘হাঙ্গেরি টুডে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাঙ্গেরিকে বাংলাদেশ শুভেচ্ছা-স্বরূপ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাঁচ হাজার ডোজ করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই ভ্যাকসিন নেবে না বলে জানিয়েছে মধ্য ইউরোপের দেশটি।

হাঙ্গেরির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাঁচ হাজার ডোজ করোনা ভ্যাকসিন শুভেচ্ছা-স্বরূপ হাঙ্গেরিকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, হাঙ্গেরি এই ভ্যাকসিন নিতে চায় না। তবে ভ্যাকসিন গ্রহণ না করার কারণ জানানো হয়নি।

দেশটির ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘ব্লিক’ গত বুধবার জানিয়েছিল, সংযুক্ত যমজ শিশু রাবেয়া ও রোকাইয়াকে সফল অপারেশনের মাধ্যমে আলাদা করা এবং অ্যাকশন ফর ডিফেন্সলেস পিপল ফাউন্ডেশনের হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসকদের ৫০০ রোগীর প্ল্যাস্টিক সার্জারির কৃতজ্ঞতা স্বরূপ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাঁচ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন হাঙ্গেরিকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ।

হাঙ্গেরির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সরকারপন্থি ‘ম্যাগেয়ার নেমজেৎ’ পত্রিকাকে বলেছে, ‘আমরা এই প্রস্তাবের জন্যে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এটা গ্রহণ করছি না।’ তবে কেন এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজ শুক্রবার দুপুরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি এ বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না।’

সরকারের এমন অবস্থানে সংশয় প্রকাশ করেন দেশের সচেতন মহল। বাংলাদেশ সরকার বলছে হাঙ্গেরি টিকা চেয়ে আবেদন করেছে, এদিকে হাঙ্গেরি বলছে বাংলাদেশ যেচেই হাঙ্গেরিকে টিকা উপহার দিতে চেয়েছে, যা হাঙ্গেরি কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এমন ধোঁয়াশায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি না পাওয়ায় আরো ধোঁয়াশা তৈরী হয় বলে জানান তারা। তারা জানান, সরকারকে এবিষয়ে পরিষ্কার বিবৃতি দিতে হবে। ভ্যাকসিন নিয়ে এই খেলা ঝুলিয়ে রেখে সরকার দেশে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরী করেছে। হাঙ্গেরি ভ্যাকসিন চায়নি, উল্টো বাংলাদেশই যেচে দিতে চেয়েছে। কিন্তু সরকার বলছে হাঙ্গেরি ভ্যাকসিন চেয়ে আবেদন করেছে।  সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে, ভ্যাকসিন নিয়ে কেনো হাঙ্গেরির সাথে এই ছল চাতুরী।

বাংলাদেশ হাঙ্গেরিকে যে ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলেছিল সেটা ভারত থেকে কেনা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাসের তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ৷ এরইমধ্যে ৫০ লাখ ডোজ দেশে পৌঁছেছে৷ এর বাইরে উপহার হিসেবে আরো ২০ লাখ ডোজ টিকা বাংলাদেশে পাঠিয়েছে ভারত৷ এর মাধ্যমে ২৭ জানুয়ারি টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছে বাংলাদেশ৷ পরেরদিন স্বাস্থ্যকর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের ছয়শ’জনকে টিকা প্রদান করা হয়৷

ইউরোপীয় ইউনিয়ন অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাসহ এ পর্যন্ত তিনটি টিকার অনুমোদন দিয়েছে। জোটের ২৭ দেশের জন্য ২ বিলিয়ন টিকা সরবরাহের চুক্তি করেছে ছয়টি ফার্মসিউটিক্যাল কোম্পানির সঙ্গে। কিন্তু সরবরাহের গতি ধীর হওয়ায় অনেক দেশই সমস্যার মধ্যে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে এক কোটি মানুষের দেশ হাঙ্গেরি রাশিয়া থেকে ২০ লাখ ডোজ স্পুৎনিক ভি টিকা কিনতে চুক্তি করেছে, চীনের সিনোফার্মার টিকারও অনুমোদন দিয়েছে। হাঙ্গেরির এমন টিকা সংকট থাকা সত্বেও কেনো বাংলাদেশের উপহার প্রত্যাখ্যান করেছে, এনিয়ে বেঁধেছে এক জটিল রহস্য।

এক সময়ের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হাঙ্গেরি ইউরোপের প্রথম দিকের দেশ, যারা ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশে হাঙ্গেরির দূতাবাসও খোলা হয়েছিল, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিভিন্ন দ্বার উন্মোচিত হচ্ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তার অগ্রগতি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে হাঙ্গেরিতেও এক সময় সমাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে হাঙ্গেরির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার নতুন উদ্যোগ নেন। ২০১৬ সালে তার হাঙ্গেরি সফরে পানি ব‌্যবস্থাপনা ও কৃষিতে সহযোগিতা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ‌্যমে যোগাযোগ বাড়াতে তিনটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় দুই দেশের মধ্যে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন গত ২১ জানুয়ারি সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে জানান, হাঙ্গেরি বাংলাদেশে একটি কনস্যুলার অফিস খোলার অনুমতি চেয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

এদিকে কাতার ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরায় সম্প্রতি বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও রাজনীতি নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে নিষিদ্ধ দেশ ইসরায়েলের এক প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশের নজরদারি করার যন্ত্র স্পাইওয়্যার কেনার অভিযোগ তোলা হয়। আর এই কেনাকাটার চুক্তি সম্পন্ন হয় হাঙ্গেরিতে। তবে বাংলাদেশ সেনাসদর জানিয়েছে ওই যন্ত্র কেনা হয়েছে হাঙ্গেরি থেকে। এরইমধ্যে খবর এলো হাঙ্গেরিকে বাংলাদেশ করোনার ভ্যাকসিন উপহার দিতে চেয়েছিল, কিন্তু হাঙ্গেরি তা প্রত্যাখ্যান করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের কাছ থেকে হাঙ্গেরির ভ্যাকসিন চেয়ে আবেদন করেছিল বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। এতে পরিস্থিতিতে এক জটিল ধোঁয়াশা তৈরী হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।  তবে এ ধোঁয়াশা বা রহস্য সমাধানে সরকারকেই বিবৃতি দিয়ে জানাতে হবে। জানাতে হবে কেনো এই চাতুরী। অথবা হাঙ্গেরি যদি চাতুর্যের আশ্রয় নেয় তারও কারণ স্পষ্ট করতে হবে বলে দাবি জানান দেশের সচেতন মহল।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৮১৭ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ