ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ের ভেতরেও এখন এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক ঘুরে বেড়ায়। দিনের আলোয় সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও রাত নামলেই যেন আরেকটি বাস্তবতা সামনে আসে—একটি ভয়, একটি চাপা উদ্বেগ, যা মানুষের চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ভয় কেবল ছিনতাই বা ছোটখাটো অপরাধের নয়; এটি সংগঠিত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং ক্ষমতার অন্ধ লড়াইয়ের ভয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা সেই অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
অপরাধ জগতের এই পুনরুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি জটিল নেটওয়ার্কের ফল। একসময় যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল, তারা আবার নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। তাদের অনেকেই এখন দেশের বাইরে অবস্থান করলেও মোবাইল ফোন ও অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে দেশেই তাদের প্রভাব বিস্তার করছে। বিদেশে বসেই তারা নির্দেশ দিচ্ছে, পরিকল্পনা করছে, এমনকি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে দিচ্ছে। ফলে বাস্তবে তারা দূরে থাকলেও তাদের উপস্থিতি যেন সর্বত্র অনুভূত হচ্ছে।
এই সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে চাঁদাবাজি। ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—সবখানেই চলছে এই অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া। ব্যবসায়ীদের কাছে ফোন আসে, কখনো সরাসরি গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। বলা হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা দিতে হবে, না হলে পরিণতি ভয়াবহ হবে। অনেক ক্ষেত্রে ভয় এতটাই তীব্র যে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতেও সাহস পান না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ তো দূরের কথা, নিজের কাছের মানুষদের কাছেও বিষয়টি গোপন রাখেন।
শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, এই চাঁদাবাজি এখন একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বাজার, ফুটপাত, পরিবহন স্ট্যান্ড, এমনকি সরকারি টেন্ডার পর্যন্ত। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতবদল হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অর্থ দিয়ে বিদেশে বসে থাকা সন্ত্রাসীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তাদের জীবনযাপন আরও বিলাসবহুল হচ্ছে, আর দেশের ভেতরে তাদের প্রভাব আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায় যখন দেখা যায়, এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের তরুণরা। নানা প্রলোভন, অর্থের লোভ কিংবা ক্ষমতার মোহে পড়ে অনেক কিশোর-তরুণ এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে সহজ টার্গেট হিসেবে—চাঁদা তোলা, হামলা চালানো, এমনকি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার জন্য। ফলে অপরাধ শুধু বাড়ছেই না, বরং তা আরও গভীরে শেকড় গেড়ে বসছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক হত্যাকাণ্ড এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ছে, আর তার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষও। কখনো ব্যবসায়ী, কখনো রাজনৈতিক কর্মী, কখনোবা সম্পূর্ণ নিরপরাধ কেউ এই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই অপরাধ প্রবণতার পেছনে একটি বড় কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ দেশে না থেকেও বিদেশ থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে আইনের ফাঁকফোকর, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব—সব মিলিয়ে তারা বারবার আইনের হাত এড়িয়ে যাচ্ছে।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে—এমনটা বলা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, অনেক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই নেটওয়ার্ক এতটাই বিস্তৃত এবং গভীর যে শুধু অভিযান দিয়ে তা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল, যেখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাও থাকতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও কঠোরতা এবং ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও দ্রুত করতে হবে, যাতে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে না পারে। তৃতীয়ত, তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মূল্যবোধের ওপর জোর দিতে হবে। কারণ একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হয়, যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক পথে পরিচালিত হয়।
এছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহারও এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত করা, অপরাধ তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো—এসব ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি বড় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদের অংশগ্রহণও জরুরি। কেউ যদি ভয় না পেয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে, তাহলে সন্ত্রাসীদের শক্তি অনেকটাই কমে যাবে।
সবশেষে বলা যায়, সন্ত্রাস শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক সংকট। এটি মোকাবিলা করতে হলে শুধু পুলিশ বা সরকারের ওপর নির্ভর করলে হবে না; পুরো সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভয়কে জয় করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই হতে পারে এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের সামনে তা শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না।
আপনার মতামত জানানঃ