২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু একটি তারিখ নয়, এটি একটি মোড়, যার প্রভাব আজও আলোচনায় ফিরে ফিরে আসে। সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; বরং এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সেনাবাহিনীর নীরব কিন্তু গভীর উদ্বেগ। দিনের আলোয় যা দেখা গিয়েছিল, তার চেয়েও বেশি কিছু ঘটেছিল পর্দার আড়ালে—যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল দ্রুত, কিন্তু তার অভিঘাত ছিল দীর্ঘস্থায়ী।
২০০৬ সালের শেষ দিক থেকেই পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, সেই প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘাত রাস্তায় গড়ায়। হরতাল, অবরোধ, সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নেন। কিন্তু এতে সংকট কমার বদলে আরও ঘনীভূত হয়। নির্বাচন ঘিরে অনাস্থা এতটাই গভীর ছিল যে, একটি গ্রহণযোগ্য ভোটের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
১১ই জানুয়ারির সকাল থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল চাপা উৎকণ্ঠা। গুঞ্জন চলছিল—কিছু একটা হতে যাচ্ছে, কিন্তু কী, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছিল না। দুপুরের দিকে বঙ্গভবনে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সেই গুঞ্জনকে আরও ঘনীভূত করে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে বসেন। পরে জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, কীভাবে তিনি রাষ্ট্রপতিকে দেশের ভেতরের সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের প্রসঙ্গটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইঙ্গিত ছিল, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন হলে এবং সেই প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী যুক্ত থাকলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জাতিসংঘ মিশন থেকে প্রত্যাহারের জন্য চাপ আসতে পারে। এই সম্ভাবনা শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও পেশাগত দিক থেকেও সেনাবাহিনীর জন্য বড় ধাক্কা হতো। এই বাস্তবতা রাষ্ট্রপতির সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
একই সময়ে ঢাকার আরেক প্রান্তে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিদেশি কূটনীতিকরা। কানাডীয় হাইকমিশনারের বাসভবনে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশসমূহ ও ভারতের প্রতিনিধিরা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বৈঠকের কথাবার্তায় সরাসরি কিছু না বলা হলেও ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট—বর্তমান ধারায় দেশ চলতে পারে না, এবং রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে ‘ভিন্ন কিছু’ ঘটতে পারে। এই অস্পষ্ট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা রাজনীতিকদের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
অন্যদিকে বিএনপি তখনো নির্বাচনী প্রস্তুতিতেই মনোযোগী ছিল। দলের নেত্রী খালেদা জিয়া ১০ই জানুয়ারি গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লায় প্রচারণায় ছিলেন। দলের অনেক নেতা পরদিন পর্যন্ত বুঝতেই পারেননি, পরিস্থিতি কতটা দ্রুত বদলে যেতে চলেছে। বিকেলের দিকে খবর আসে—সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে গেছেন, জরুরি আইন জারির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সন্ধ্যার পর নাটকীয়ভাবে সবকিছু এগোতে থাকে। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নেন এবং একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। উপদেষ্টারা পদত্যাগ করেন। কার্যত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিদ্যমান শাসন কাঠামো ভেঙে পড়ে। সেই রাতেই শুরু হয় নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া।
প্রথমে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম আলোচনায় এলেও তিনি দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর সামনে আসেন অর্থনীতিবিদ ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ। সেনাবাহিনীর সমর্থনে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিতে সম্মত হন। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যেখানে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনসহ আরও কয়েকজন।
এই সরকার গঠনের পদ্ধতি ছিল অস্বাভাবিক, এমনকি গোপনীয়তায় ঘেরা। পরবর্তীতে মইনুল হোসেন নিজেই বলেছেন, কীভাবে তাকে জানানো হয়েছিল—এই বিষয়টি যেন কেউ না জানে, কীভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি। অনেকের মনেই তখন প্রশ্ন জাগে—এটা কি সামরিক শাসনেরই আরেক রূপ?
শুরুর দিকে এই সরকারকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, এটি আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের চরিত্র বদলাতে থাকে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের, এমনকি শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকেও। রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলায় দুই নেত্রীকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগও ওঠে।
সংবাদমাধ্যমের ওপর কড়া নজরদারি, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, দীর্ঘ জরুরি অবস্থা—সব মিলিয়ে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, যে স্থিতিশীলতার কথা বলে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, তা কি আদৌ গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যাচ্ছে?
তবে এই সরকারের আমলেই শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি হয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচন কমিশনের সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমেই দুই বছরের মাথায় দেশে ফিরে আসে নির্বাচিত সরকার এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় এক এগারোর অধ্যায়।
২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি তাই একপেশে কোনো গল্প নয়। এটি যেমন রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল, তেমনি আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ও সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। কারও কাছে এটি ছিল অনিবার্য হস্তক্ষেপ, কারও কাছে গণতন্ত্রের ওপর কঠিন আঘাত। সত্য সম্ভবত এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও। তবে এটুকু নিশ্চিত—সেই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক ছাপ রেখে গেছে, যা মুছে যায়নি, বরং সময়ে সময়ে নতুন প্রশ্ন নিয়ে আবার সামনে ফিরে আসে।
আপনার মতামত জানানঃ