
তারা ফিরে এসেছিল নিঃশব্দে। কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল না কোনো স্বাভাবিক ঘরে ফেরার উচ্ছ্বাস। ছিল শুধু এক ধরনের নীরবতা, ভারী আর অদৃশ্য, যা তাদের ছোট ছোট কাঁধে চেপে বসেছিল। একটি গ্রামের ঘরে ফিরে আসা দুই ভাইকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন খুব অল্প সময়ে অনেক বড় হয়ে গেছে। বড় ভাইটি সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলছিল, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল থেমে থেমে। ছোট ভাইটি তার গা ঘেঁষে ছিল সবসময়, যেন আর কাউকে হারাতে চায় না। তাদের চোখে ছিল অদ্ভুত এক শূন্যতা। প্রায় এক মাস হয়ে গেছে তারা তাদের বাবা-মাকে দেখেনি।
এরা একা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত শিশু সীমান্ত পেরিয়ে নিজ দেশে ফিরে এসেছে, কিন্তু তাদের বাবা-মা থেকে গেছে অন্য দেশের কারাগার বা আটক কেন্দ্রে। কাগজে-কলমে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিয়মতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তন, যা নাকি শিশুদের সুরক্ষার জন্যই করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক সময় এক দীর্ঘ যাত্রার মতো, যেখানে আছে আটক, বিচ্ছিন্নতা, আর তাড়াহুড়ো করে হস্তান্তর—যার ফলে একটি পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
একদিন প্রায় ত্রিশ জন মানুষ সীমান্ত দিয়ে ফিরে এসেছিল, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল শিশু। কেউ ছিল কিশোর, কেউ ছোট্ট শিশু, কেউ আবার এমন শিশু যে পাচারের শিকার হয়েছিল। তাদের অনেকের পাশে তখন কোনো অভিভাবক ছিল না। সীমান্ত পার হওয়ার পর তাদের কাউকে তুলে দেওয়া হয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাতে, আবার কাউকে পাঠানো হয় আত্মীয়দের কাছে—যাদের অনেককে তারা আগে কখনো দেখেনি।
সংখ্যাগুলো ধীরে ধীরে বাড়ছে। আগের তুলনায় এখন আরও বেশি শিশু এইভাবে ফিরে আসছে। এক সময় এই শিশুদের বেশিরভাগই ছিল বড়, যারা কিছুটা হলেও পরিস্থিতি বুঝতে পারত। কিন্তু এখন ছোট ছোট শিশুরাও এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। তাদের মানসিক অবস্থাও অনেক বেশি ভঙ্গুর। সীমান্তে কাজ করা মানুষদের ভাষায়, অনেক শিশু সেখানে এসে কাঁদতে থাকে, মাকে খোঁজে, ভেঙে পড়ে। তাদের সেই কান্না শুধু মুহূর্তের নয়, তা যেন ভেতরে জমে থাকা আতঙ্কের বহিঃপ্রকাশ।
কিছু শিশুর জন্য ফিরে আসা দেশটিও অপরিচিত। এক ছোট মেয়ে প্রথমবারের মতো এই দেশে পা রাখে, যদিও এটিই তার পরিচয়ের দেশ। জন্ম আর বেড়ে ওঠা অন্য দেশে, আত্মীয়দের সঙ্গে পরিচয় ছিল শুধু দূর থেকে কথা বলার মাধ্যমে। এখন তাকে সেই আত্মীয়দের সঙ্গেই থাকতে হচ্ছে। তার বাবা-মা বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে জীবন গড়ার চেষ্টা করেছিল। একসময় তারা সন্তানদের নিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু পথে আটক হয়। প্রথমে সবাই একসঙ্গে ছিল, তারপর ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়। বাবা এক জায়গায়, মা আরেক জায়গায়, সন্তানদেরও পাঠানো হয় আলাদা আলাদা কেন্দ্রে। শেষে ছোট্ট মেয়েটিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সীমান্তের এপারে। তার বাবা-মা এখনও ফিরে আসেনি।
এই ধরনের ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়। বেশিরভাগ পরিবার সীমান্ত পাড়ি দেয় জীবিকার তাগিদে। নিজেদের দেশে কাজের অভাব, জীবনের অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যতের চিন্তা—সব মিলিয়ে তারা অন্যত্র যাওয়ার চেষ্টা করে। কেউ যায় কাজের খোঁজে, কেউ আত্মীয়দের কাছে, কেউ আবার ভয়ে—নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে। এই যাত্রা খুব কম ক্ষেত্রেই নিয়মতান্ত্রিক হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা দালালদের মাধ্যমে অচেনা পথ ধরে এগোয়—নদীর ধারে, অন্ধকার পথে, গোপন রাস্তা দিয়ে।
কিন্তু ধরা পড়ার পর সবকিছু বদলে যায়। বাবা-মা আর সন্তানদের জন্য শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন পথ। প্রাপ্তবয়স্কদের পাঠানো হয় আটক কেন্দ্রে, আর শিশুদের রাখা হয় আলাদা আশ্রয়কেন্দ্রে। অনেক সময় ছোট শিশুদের মায়ের সঙ্গে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সবসময় ঘটে না। এক বাবার অভিজ্ঞতা বলে দেয় এই বিভাজনের কষ্ট কতটা গভীর। তার স্ত্রীকে পাঠানো হয় এক জায়গায়, আর সন্তানদের রাখা হয় ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে। অনেক দিন পর তিনি দুই ছেলেকে ফিরে পান, কিন্তু তার ছোট মেয়েটি এখনও অন্যত্র আছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে একটি ধূসর এলাকা হিসেবে দেখেন। শিশুদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে যে নীতিগুলো রয়েছে, সেগুলো বাস্তবে সবসময় কার্যকর হয় না। আইন বলছে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু বাস্তবে সেই স্বার্থ কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি শিশুর জন্য কি বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা ফিরে আসা ভালো? নাকি একসঙ্গে থেকে আটক থাকা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই প্রক্রিয়ার মানসিক প্রভাব গভীর। বাবা-মা থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া একটি শিশুর মনে যে আঘাত তৈরি করে, তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অনেক শিশু চুপ হয়ে যায়, অনেকের ঘুমে সমস্যা হয়, অনেকেই ভয় পায়। তারা বারবার একই প্রশ্ন করে—তাদের বাবা-মা কবে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় কারও কাছে থাকে না।
শিশুদের ফেরানোর প্রক্রিয়াটি নিজেই জটিল। এতে জড়িত থাকে বিভিন্ন দপ্তর, যাচাই-বাছাই, অনুমোদন, আর আনুষ্ঠানিকতা। সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। হস্তান্তর হয় দ্রুত, নির্দিষ্ট নিয়মে। কিন্তু তারপর কী হয়, তার কোনো স্পষ্ট কাঠামো নেই।
ফিরে আসার পর শিশুদের জন্য কোনো একক পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেই। কেউ আত্মীয়দের কাছে যায়, কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকে। কেউ কিছুদিন সহায়তা পায়, আবার কেউ তেমন কিছুই পায় না। তাদের মানসিক অবস্থার দিকে নিয়মিত নজর রাখার ব্যবস্থাও নেই। তারা শেষ পর্যন্ত তাদের বাবা-মার সঙ্গে মিলিত হতে পারছে কি না, সেটিও অনেক সময় অজানা থেকে যায়।
যারা এই শিশুদের গ্রহণ করে, তাদের জন্যও এটি এক কঠিন বাস্তবতা। এক দাদি তার নাতিদের ফিরে পেয়েছেন, কিন্তু তার ছেলে আর ছেলের স্ত্রী এখনও দূরে। তিনি প্রতিদিন অপেক্ষা করেন। দিন গোনেন। তার কাছে ফিরে আসা শিশুদের হাসি অসম্পূর্ণ, কারণ পরিবার এখনও সম্পূর্ণ নয়।
এই পুরো বিষয়টি শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি মানুষের গল্প। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি শিশু, যার জীবনে হঠাৎ করে সবকিছু বদলে গেছে। তারা শুধু তাদের বাবা-মাকে হারায়নি, তারা হারিয়েছে নিরাপত্তা, স্বাভাবিকতা, আর শৈশবের নিশ্চিন্ততা।
প্রত্যাবর্তন হয়তো একটি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি, কিন্তু একটি শিশুর জন্য এটি নতুন এক অনিশ্চয়তার শুরু। তারা ফিরে আসে, কিন্তু তাদের পৃথিবী আর আগের মতো থাকে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—শিশুদের জন্য কি এর চেয়ে ভালো কোনো পথ নেই? কারণ সীমান্ত পেরিয়ে ফিরে আসা এই নীরব শিশুরা শুধু একটি যাত্রা শেষ করে না, তারা শুরু করে আরেকটি দীর্ঘ, অজানা পথ।
আপনার মতামত জানানঃ