Trial Run

দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন

ছবি : ঢাকাট্রিবিউন

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কমেনি, বরং সময়ের ব্যবধানে সেটা আরও বেড়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ কোনও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। কোভিডকালীন এই সময়েও অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকারের অবনতি হচ্ছে। মহামারির এই সময়ও দেশে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, সীমান্তে হত্যা, ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ ঘটে চলেছে। যেটি আসলেই উদ্বেগজনক। এসবের পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়েছে। বছরের প্রথম মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তৈরি করা মানবাধিকার প্রতিবেদনে এসব মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ঘটনা স্থানীয় মানবাধিকার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এমএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন জানুয়ারি-২০২১’-এ বলা হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বন্দুকযুদ্ধের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যের অপরাধের ঘটনা কমেছে। তবে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতা, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা, সীমান্তে হত্যা-নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, সর্বোপরি নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে ঘটেই চলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার রক্ষায় করোনার এ সংকটকালীন সময়ে সাংবাদিকেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের হয়রানি ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। এটি অগ্রহণযোগ্য এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত।

দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে জবাবদিহি অত্যাবশ্যক, তা না হলে এসব ঘটনা বাড়তেই থাকবে বলে মানবাধিকার প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের।

বিচার বহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে এখনও বলা যাবে না যে, এটা কমে এসেছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ব্যাপক অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এমন কোনও পেশার লোক নেই— যারা এই অ্যাক্টের অধীনে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন না। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে— পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। মানুষের অধিকার রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। মানবাধিকার সমুন্নত রেখেই দেশকে সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে।

তবুও গত মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন একজন। বিজিবির সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কক্সবাজারের টেকনাফে এক রোহিঙ্গা যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বরিশালে রেজাউল নামের এক যুবক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন। গত বছর ২৯ ডিসেম্বর মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে তাকে আটক করা হয়েছিল, ২ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়। তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

করোনা ছাড়াও দেশে মহামারি আকার ধারণ করেছে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন। চলতি বছরের প্রথম মাসেই ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে দুই শতাধিক। যা শুধু আলোচনায় এসেছে, সেগুলোই জানা গেছে। এর বাইরে তো রয়েছে অনেক। লোক-লজ্জা বা সম্মানের ভয়ে প্রকাশ করেনি ভুক্তভোগীরা। তবুও আলোচনায় আসা যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যাও ওজনে অনেক ভারী। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে কন্যাশিশু নির্যাতন এবং নারী ধর্ষণের ঘটনাসহ মোট ২২৯টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ও হত্যা ২টি, গণধর্ষণ ১১টি ও ধর্ষণের ঘটনা ৭২টি। ধর্ষণের শিকার ৭২ জনের মধ্যে ৪১ জন শিশু, কিশোরী ও প্রতিবন্ধী রয়েছে।

এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা ১৩টি, যৌন হয়রানি ১৫টি ও শারীরিক নির্যাতনের ২৫টি ঘটনা ঘটেছে। অ্যাসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন পাঁচজন নারী ও কিশোরী। গত মাসে ২১ জন নারী ও কিশোরী আত্মহত্যা করেছেন। এসব ঘটনা ছাড়াও গত মাসে ৭৮ জন নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। মৃত অবস্থায় ৫ জন নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার পর ৫ জন শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পারিবারিক বিরোধ, প্রতিশোধ, যৌতুক, তালাক, পরকীয়া ইত্যাদি কারণে হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছে।

মতপ্রকাশের অধিকারের ক্ষেত্রেও গত মাসের ঘটনাগুলো ছিল উদ্বেগজনক। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ছয়জন সাংবাদিক নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌরসভা নির্বাচন কেন্দ্র করে শেখ লেবু স্মৃতি সরকারি বিদ্যালয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ছবি তুলতে গিয়ে এনটিভির ফটোসাংবাদিক মাসুদ রানাকে মারধর ও ক্যামেরা ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা।

গত মাসে নির্বাচনী জোয়ারে সহিংসতায় ভরপুর ছিল দেশ। বিভিন্ন জেলা–উপজেলায় পৌর নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল নিতে প্রকাশ্যে গোলাগুলি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ-সহিংসতা, প্রাণহানিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে দেখা গেছে। নির্বাচনী সহিংসতায় দেশে ছয়জন নিহত ও শতাধিক রাজনৈতিক কর্মী আহত হয়েছেন। চট্টগ্রামে তিনজন, ঝিনাইদহে একজন, সিরাজগঞ্জে একজন ও বরিশালে একজন নিহত হন।

সীমান্তে হত্যা-নির্যাতনের চিত্র এখনো অব্যাহত রয়েছে।  সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। নতুন বছরের প্রথম মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং দুজন নির্যাতিত হয়েছেন।

সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংবাদ প্রায় প্রতিদিনই আসে। গত মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের পাঁচটি ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও  মানবাধিকার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে জাতি হিসেবে আমরা অনেক এগিয়ে যাবো। তারা মনে করেন, এখানে বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমতের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে৷ আর গণতন্ত্র হলো পছন্দের স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা৷ জনপ্রতিনিধি পছন্দ করে নেয়ার স্বাধীনতা তো প্রশ্নবিদ্ধ৷ তারা বলেন, যে দেশে সংসদ সদস্যরা সংসদে হেট স্পিচ দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না, সেই সংসদ দিয়ে গণতন্ত্র কতটুকু আসবে তাতো সহজেই বোঝা যায়৷

তারা বলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি দিনকে দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। কখনও কখনও এটি এক ধরনের আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে যে, রাষ্ট্র আদৌ মানবাধিকারের সুরক্ষা দিতে পারবে কিনা। আর মানুষের মুক্তবুদ্ধির চর্চার ক্ষেত্র রাষ্ট্র ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংকুচিত করা হচ্ছে। এটা বুঝতে যদি সরকার অক্ষম হয়, তাহলে অপশক্তি আমাদের গ্রাস করে ফেলবে।

এসডব্লিউ/পিএ/কেএইচ/২১৩৬ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ